১৭ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ঘোষণায় ৩ তরুণ

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২১, ০১:০০ এএম

৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর কাছে পাকিস্তানের ৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণ করেন পাকিস্তানের জেনারেল এএকে নিয়াজি। বিজয়ের এক দিন পর ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের চূড়ান্ত ঘোষণা দেন তিন বাংলাদেশি মুক্তিযোদ্ধা। তারা হলেন মেজর হায়দার, ফতেহ আলী চৌধুরী ও আতিকুর রহমান। প্রথমে শাহবাগে রেডিওতে, পরে টিভিতে। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় বিজয়ের সেই ঘোষণার কথা জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক।

ঢাকায় ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল আলম বীরপ্রতীকের লেখা ‘ব্রেভ অফ হার্ট’ গ্রন্থে রয়েছে ঘটনার বর্ণনা।

হাবিবুল আলম বীরপ্রতীকের ভাষ্য, মেজর খালেদ মোশাররফ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ২নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। নোয়াখালী, ফেনী, চাঁদপুর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, শরীয়তপুর, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা নিয়ে গঠিত ছিল ২ নম্বর সেক্টর। এই সেক্টরের অন্যতম গেরিলা বাহিনী ছিল ক্র্যাক প্লাটুন। ২ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর হায়দার। মেজর হায়দার, ফতেহ আলী চৌধুরী ও আতিকুর রহমান মিলে বাংলা এবং ইংরেজিতে বিজয়ের ঘোষণা দেন রেডিও ও টিভিতে। সেদিন এ বিজয়ের ঘোষণার দিন রেডিও ও টেলিভিশনে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক।

হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে ১৬ ডিসেম্বর। সেদিন আমরা নারিন্দায় ছিলাম। জানতে পারি ভারতীয় বাহিনী ১৭ ডিসেম্বর রেডিও বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং সেখান থেকে বাংলাদেশের বিজয়ের ঘোষণা দেবে। এটা আমরা চাইনি। কারণ যুদ্ধ করেছি আমরা। আমরা চেয়েছিলাম বিজয়ের ঘোষণা আমরা দেব।’

তিনি বলেন, ‘এটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা ছিল। কোনো এক দিন নিশ্চয়ই এর ইতিহাস লেখা হবে। সেদিন শামসুল হুদা খুব সহায়তা করেছেন। হায়দার ভাইকে দিয়ে আমরা সেদিন ঘোষণাটা দিতে পেরেছিলাম।’

ভারতীয় বাহিনীর দিক থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘোষণায় একটা প্রতিক্রিয়া তো সেদিন হয়েছিল। কারণ তারা চেয়েছিল ঘোষণা দিতে আর আমরা ঘোষণা দিয়ে দিলাম। প্রতিক্রিয়া হবে সেটা তো সাধারণ ব্যাপার। তারা করতে পারেনি এটাই বড় কথা।’

বন্ধ রেডিও চালু হয় সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে : ঢাকার শাহবাগের রেডিও স্টেশনটি বন্ধ ছিল। নারিন্দা থেকে হাবিবুল আলম ও তার সহযোদ্ধারা ঢাকার শাহবাগের রেডিও স্টেশনে গিয়ে পৌঁছে রেডিও স্টেশনের কার্যালয় বন্ধ দেখতে পান। সেখানে উপস্থিত এক পিয়ন হাবিবুল আলমকে বলেন, রেডিও চালু করার সব বিষয়ে জানেন তৎকালীন আঞ্চলিক পরিচালক শামসুল হুদা চৌধুরী। তিনি থাকেন ইস্কাটনে। ততক্ষণে সেখানে এসে উপস্থিত হন হাবিবুল আলমের আরেক সহযোদ্ধা ফতেহ আলী চৌধুরী। তারা গাড়ি নিয়ে যান ইস্কাটনে শামসুল হুদা চৌধুরীর বাসায়।

হাবিবুল আলম ও ফতেহ আলীর কাছে থাকা পিস্তল দিয়ে ভয় দেখিয়ে শামসুল হুদা চৌধুরীকে বাধ্য করান রেডিও স্টেশন চালু করতে। শামসুল হুদা তাদের বলেছিলেন, ‘আপনাদের পথে যদি মিত্রবাহিনীর সঙ্গে দেখা হয়, তাহলে বলবেন, মিরপুর সম্প্রসারণ কেন্দ্রে ক্রিস্টাল রয়েছে। সেগুলো আনতে হবে। আনতে লোক গেছে। সেটা না হলে রেডিও চালু করা সম্ভব নয়।’

এরপর শাহবাগের রেডিও স্টেশনে ফিরে আসেন হাবিবুল আলম ও ফতেহ আলী। ততক্ষণ সেখানে এসে পৌঁছান মেজর হায়দার, শাহাদাত চৌধুরী, কাদের মাহমুদ। শাহাদাত চৌধুরী ও কাদের মাহমুদ মেজর হায়দারের বক্তব্য লিখে দেন। কড়া নজরদারি বসানো হয় রেডিও স্টেশনে। অনুমতি ছাড়া কাউকে ৮টার আগে রেডিও স্টেশনে প্রবেশ করতে নিষেধ করা হয়। এর মধ্যে মিত্রবাহিনীর কয়েকজন রেডিও স্টেশনে আসেন। শামসুল হুদা তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা হাসিমুখে বিদায় নেন। গোটা রেডিও স্টেশনে কাজ চলছে। বিশেষ একটা ঘোষণা আসবে। ৯ মাস যুদ্ধের সমাপ্তির ঘোষণা। বাংলাদেশের বিজয়ের ঘোষণা।

প্রথমে বাংলায় বিজয়ের ঘোষণা দেন ফতেহ আলী। সকাল সকাল ৮টা ১০ মিনিটে। ফতেহ আলী বলা শুরু করেন, ‘দেশ স্বাধীন হয়েছে এবং বাঙালিরা এখন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিক।’ তার পরপরই ঘোষণা দেন মেজর হায়দার। ইংরেজিতে। এরপর চালু হয় বন্ধ রেডিও স্টেশন। শুরু হয় নিয়মিত অনুষ্ঠান।

চুক্তি করে টেলিভিশনেও ঘোষণা দেওয়া হয় : রাজধানীর রামপুরা ডিআইটি ভবনে টেলিভিশনের কার্যালয় ছিল। বিকেলে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন হাবিবুল আলম। এর আগেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন ফতেহ আলী। সেখানে উপস্থিত ছিলেন শাহাদাত চৌধুরী ও মেজর হায়দার।

টেলিভিশনের তখনকার পরিচালক ছিলেন এজাজ আহমেদ। টিভিতে বিজয়ের ঘোষণা দেওয়া হবে মুক্তিযোদ্ধাদের এমন প্রস্তাব শুনে পরিচালক এজাজ আহমেদ সেদিন বলেছিলেন, এভাবে তো হুট করে কিছু করা যায় না। কিছু নিয়মকানুন আছে। একটা চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করতে হবে। এরপর খালেদা ফাহমীর সঙ্গে বসে শাহাদাত চৌধুরী অনুষ্ঠান চূড়ান্ত করেন। নিয়মকানুন মেনে চুক্তিপত্র করা হয়। বিজয়ের ঘোষণা দেওয়ার আগে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।

সেদিন টিভি স্টেশনে উপস্থিত ছিলেন খালেদা ফাহমী, সাকিনা আকতার, শিল্পী কেরামত মওলা, এমএ ওয়াহিদ এবং আবদুল্লাহ আল-মামুন।

এবারও ফতেহ আলী চৌধুরী বাংলায় ঘোষণা দেন। এরপর মেজর হায়দার কিছু নির্দেশনা দেন। তারপর তরুণ মুক্তিযোদ্ধা আতিকুর রহমান ইংরেজিতে বিজয়ের ঘোষণা দেন।

হাবিবুল আলম বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম বিজয়ের ঘোষণা আমরা দিই। এরকম একটি ঘোষণার সঙ্গে থাকতে পেরে আমি গর্বিত।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত