ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নৃত্যকলা বিভাগের ছাত্রী এলমা চৌধুরী মেঘলাকে (২৬) মৃত্যুর আগে মারধরের কথা স্বীকার করেছেন স্বামী ইফতেখার আবেদীন। তার আগের বিয়ের খবর জেনে যাওয়ায় মেঘলার ওপর নির্যাতন শুরু হয়। আর এ নির্যাতনের বিষয়টি গোপন রাখতে গিয়ে মেঘলাকে একঘরে করে রাখা হয়। ঢাবির সহপাঠী থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন সবার সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে মেঘলাকে টানা নির্যাতন করেন তার স্বামী ও শ^শুর-শাশুড়ি। মেঘলাকে হত্যার অভিযোগে করা মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট বনানী থানার একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা ও তার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে গতকাল বৃহস্পতিবার এসব তথ্য জানা গেছে।
তারা আরও জানান, ইফতেখার নিজের অতীত গোপন করে মেঘলাকে বিয়ে করেন। সেটি মেঘলার কাছে প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই তাদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। মেঘলা বিষয়টি সহজভাবে না নেওয়ায় তার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু হয়।
বনানী থানার তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, মেঘলার শরীরে আঘাতের চিহ্নের বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রশ্নের উত্তরে তিন দিনের রিমান্ডের প্রথম দিনে ইফতেখার দাবি করেন, মেঘলার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। এ থেকে তিনি আঘাত পান।
তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ইফতেখার মিথ্যা কথা বলেছেন। পারিপার্শ্বিক আলামতে নির্যাতনের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলেও মেঘলাকে সরাসরি হত্যার কথা এখন পর্যন্ত স্বীকার করেননি ইফতেখার। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি মরদেহের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও অন্যান্য পরীক্ষার প্রতিবেদনের মাধ্যমে মেঘলার মৃত্যুর রহস্য খোলাসা হবে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, মেঘলার ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করত শ্বশুরবাড়ির লোকজন। এ কারণে তিনি তার বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সহপাঠীর সঙ্গে ফোনে কথাও বলতে পারতেন না। এমনকি আত্মীয়স্বজনদের কারও সঙ্গে কথা বললে সেটিও পরীক্ষা করত তারা। এরই ধারাবাহিকতায় তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজন। এসব বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ করায় মেঘলাকে শারীরিকভাবে আঘাত করেন ইফতেখার। এ বিষয়টি স্বীকার করলেও মেঘলাকে সরাসরি হত্যার কথা স্বীকার করেননি।
মেঘলার চাচা গোলাম মোহাম্মদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইফতেখার আবেদীন একজন প্রতারক। আগের বিয়ে, স্ত্রী-সন্তানের কথা গোপন করে সে আমার ভাতিজির সঙ্গে প্রতারণা করে বিয়ে করে। মেঘলা বিষয়টি জানার পর থেকেই তার ওপর নির্যাতন শুরু হয়। ছয় দিন আগে মেঘলাকে না জানিয়ে হুট করে সে দেশে ফিরে এসে তাকে মারধর করেছে। তাদের নির্মম পিটুনির ফলে মেঘলা বনানীর ওই বাসা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাকে রুমে আটকে মারধর করে হত্যা করা হয়েছে। তারপর তারা আত্মহত্যার নাটক সাজানোর চেষ্টা করে।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বনানী থানার ওসি নূরে আযম মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলার অভিযোগের সূত্র ধরেই তদন্ত চলছে। লাশ উদ্ধারের আগের রাতে ইফতেখার ও মেঘলার মধ্যে মোবাইল ফোন নিয়ে ধস্তাধস্তির কথা বলা হলেও বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত সরাসরি হত্যার কথা স্বীকার করেননি ইফতেখার।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ মামলার অন্য দুই আসামি মেঘলার শ্বশুর-শাশুড়ি পলাতক। তাদের সম্ভাব্য অবস্থানে অভিযান চালিয়েও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট বনানী থানার আরেক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাবেক সেনা কর্মকর্তার ছেলে ইফতেখার আবেদীন প্রথমে ফ্রান্সে ছিলেন। সেখানকার এক নারীকে বিয়ে করেন। সেই ঘরে এক সন্তান রয়েছে। তবে সেই স্ত্রীর সঙ্গে ঝামেলা হওয়ায় স্ত্রী-সন্তান ফেলে ইফতেখার কানাডা চলে যান। তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে মেঘলার সঙ্গে পরিচয় হয়। এই সূত্র ধরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। আগের বিয়ের কথা গোপন করে তড়িঘড়ি করে মেঘলাকে বিয়ে করেন। এ বিষয়টি মেঘলা জানার পর থেকেই ইফতেখার ও তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন মেঘলার ওপর চড়াও হন, মেঘলাকে প্রায় বন্দি করে ফেলেন।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মেঘলার লাশ উদ্ধারের পর সেদিন রাতেই বনানী থানায় হত্যা মামলা করেন তার বাবা সাইফুল ইসলাম চৌধুরী। মেঘলার মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদনের তথ্যানুয়ায়ী, তার শরীরের ৯ জায়গায় আঘাতের জখম পাওয়া গেছে। ঢাবির নৃত্যকলা বিভাগের ২০১৫-১৬ সেশনের ছাত্রী মেঘলা সুফিয়া কামাল হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন।
