অভিবাসন ও দক্ষ শ্রমিক তৈরি

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২১, ১১:০৫ পিএম

প্রতিবছর ১৮ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস’ পালন করা হয়। এবারের অভিবাসী দিবসের প্রাক্কালে দেশের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত সুখবরটি ছিল তিন বছর পর বন্ধু দেশ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খুলে যাওয়া। দিবসটি উপলক্ষে শুক্রবার প্রবাসীকল্যাণ ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমেদ জানিয়েছেন রবিবার মালয়েশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হবে। সব ঠিক থাকলে চলতি মাসেই মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো শুরু হতে পারে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী। এ ছাড়া গ্রিসে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে আগামী ফেব্রুয়ারিতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হতে পারে বলেও জানিয়েছেন তিনি। বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, একইভাবে আলবেনিয়া, মাল্টা ও বসনিয়ার সঙ্গে কর্মী পাঠনোর বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে। বর্তমানে নতুন শ্রমবাজার হিসেবে কম্বোডিয়া, উজবেকিস্তান, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, রোমানিয়াসহ আফ্রিকা মহাদেশের কয়েকটি দেশ এবং জাপান, চীন, ক্রোয়েশিয়া, সেনেগাল, বুরুন্ডি, সিশেলিস প্রভৃতি দেশে কর্মী পাঠানো শুরু হয়েছে। করোনা মহামারীর কারণে প্রায় দুই বছর ধরে বৈশি^ক শ্রমবাজারের স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার এই সময়ে বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসনের পথ খুলতে থাকা অবশ্যই বড় সুখবর।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আহমেদ মুনীরুছ সালেহীন জানিয়েছেন, সংক্রমণ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার সঙ্গে সঙ্গে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই আড়াই লক্ষাধিক কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে গত নভেম্বর মাসে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬৩ কর্মী বিদেশে গেছেন। প্রবাসের শ্রমবাজার চাঙ্গা হওয়া এবং বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আসার খবরে আমরা আনন্দিত হই। কিন্তু এক্ষেত্রে আরও কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। লক্ষ্য করা জরুরি যে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক উল্লেখযোগ্য অংশ প্রবাসের শ্রমবাজারগুলোতে শ্রম বিক্রি করছেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ ১৭৪টির বেশি দেশে শ্রম দিচ্ছেন এবং দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। এই শ্রমিকদের বেশিরভাগই কাজ করছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে। কিন্তু শ্রম অভিবাসনের ক্ষেত্রে দক্ষ শ্রমিক প্রেরণের পরিসংখ্যান আমলে নিলে পরিস্থিতি খুবই দুঃখজনক বলতে হবে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে রেকর্ডসংখ্যক ১০ লাখ ৮ হাজার ৫২৫ জন কর্মী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রম অভিবাসী হয়েছিলযার মধ্যে ৪ লাখ ৩৪ হাজার দক্ষ শ্রমিক। ২০১৮ সালে শ্রম অভিবাসীর সংখ্যা কমে ৭ লাখ ৩৪ হাজার ১৮১ জনে নেমে এলে দক্ষ শ্রমিকের সংখ্যাটাও কমে ৩ লাখ ১৮ হাজারে নেমে আসে। ২০১৯ সালে শ্রমশক্তি রপ্তানি হয় ৭ লাখ ১৫৯ জন যেখানে দক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা নেমে আসে ৩ লাখ ৪ হাজারে। আধা দক্ষ এবং স্বল্প দক্ষ শ্রমিকের বিবেচনাতেও এই পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয় মোটেই। অভিবাসীদের পাঠানো আয় বা রেমিট্যান্স এবং নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রেও দক্ষ শ্রমিকের গুরুত্ব অনেক বেশি। নানা পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দক্ষতায় পিছিয়ে থাকা এবং যোগাযোগের ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণেই পৃথিবীর বহু দেশেই বাংলাদেশের শ্রমিকরা প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার শ্রমিকদের তুলনায় প্রবাসের কর্মস্থলে কম আয় করেন।

ফলে নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশ এবং আরও নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানের পাশাপাশি অভিবাসনপ্রত্যাশী ব্যক্তিদের দক্ষ শ্রমিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পরিকল্পিত প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে কারিগরি ও প্রাযুক্তিক দক্ষতার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি গন্তব্য দেশের ভাষা-সংস্কৃতি, আবহাওয়া ও খাদ্যাভ্যাসসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোতেও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বর্তমান পৃথিবীর প্রযুক্তি খাত দ্রুত পরিবর্তনশীল। শুধু প্রযুক্তির বিকাশকে মাথায় নিলেই দেখা যাবে আগামী ১০ বছর যুদ্ধটা হবে প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের। তাই এ সময়ে প্রযুক্তির জ্ঞান আমাদের শ্রম অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মাঝে ঢুকিয়ে না দিতে পারলে আমাদের শ্রমবাজার হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। হয়তো ১০০ শতাংশ দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শ্রমিক আমরা পাঠাতে পারব না, তবে সত্যিকার অর্থে যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করা সম্ভব হলে কিংবা দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শ্রমিক তৈরি করা সম্ভব হলে দেশেও তাদের জন্য কাজের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাবে।

উপরোক্ত বাস্তবতা আমলে নিয়ে দক্ষ শ্রমিক তৈরি প্রচেষ্টার পাশাপাশি অভিবাসন ব্যয় কমানো, অভিবাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর তদারকি বৃদ্ধি এবং শ্রম রপ্তানিতে মধ্যস্বত্বভোগী দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধের জন্যও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রবাসী এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর নেতৃত্বে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগসাজশে একটি চক্র ১০টি এজেন্সিকে নিয়ে সিন্ডিকেট বানিয়ে শ্রমিকদের কাছ থেকে দুই বছরে ২০০ কোটি রিঙ্গিত হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠার পরই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন থেকে কেবল মালয়েশিয়া নয় কোনো দেশের শ্রমবাজারই যাতে এমন সিন্ডিকেটের কবজায় চলে না যায় সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত