দেশে করোনা টিকার তৃতীয় ডোজ বা বুস্টার ডোজ দেওয়া শুরু হয়েছে। গতকাল রবিবার রাজধানীর বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস) মিলনায়তনে উদ্বোধনের দিন মন্ত্রী ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণির কয়েকজন সম্মুখসারির করোনাযোদ্ধা টিকা নেন। ২৮ ডিসেম্বরের মধ্যে টিকার নিবন্ধন ও তালিকা তৈরির কাজ শেষ করবে সুরক্ষা অ্যাপ। এরপর সারা দেশে বুস্টার ডোজ শুরু হবে। মিশ্র টিকায় বুস্টার ডোজ দেওয়া হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বুস্টার ডোজ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা সরকারের বুস্টার ডোজের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বুস্টার ডোজের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, বয়স্ক ও সম্মুখসারির যোদ্ধাদের বুস্টার ডোজ দেওয়া হবে। দেশে এখন পর্যন্ত করোনায় ২৮ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ৮৫ ভাগই ষাটোর্ধ্ব। ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিদের সুরক্ষিত রাখতে হবে। এজন্যই তাদের বুস্টার ডোজ দেওয়া হচ্ছে। বুস্টার ডোজের পাশাপাশি করোনার টিকার অন্যান্য কর্মসূচি এবং শিক্ষার্থীসহ অন্যদের টিকাদান অব্যাহত থাকবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের ৭০ ভাগ মানুষকে করোনার টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। এর অর্থ হলো ১২ কোটি মানুষকে টিকা দিতে হবে। এর জন্য ২৪ কোটি টিকা লাগবে। আগামী এপ্রিলের মধ্যে ৭০ ভাগ মানুষকে দুই ডোজ টিকা দিতে গেলে ১৩ কোটি টিকা লাগবে। এখন মাঠপর্যায়ে ৪ কোটি ৬৩ লাখ টিকা আছে। আরও ৬ কোটি ৫৫ লাখ টিকা চলতি মাসের মধ্যে আসবে। ২০২২ সালের প্রথম প্রান্তিকের মধ্যে আরও ৯ কোটি ডোজ টিকা পাওয়া যাবে। আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে ১৬ কোটি ৮৫ লাখ টিকা হাতে থাকবে। টিকার কোনো ঘাটতি হবে না। আগামী জানুয়ারি মাসে ফাইজারের আরও ২ কোটি ডোজ টিকা পাওয়া যাবে। এ ফাইজারের টিকাই বুস্টার ডোজ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
গত ২৪ নভেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকায় করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন শনাক্ত হওয়ার খবর আসে। এরই মধ্যে শতাধিক দেশে করোনাভাইরাসের এই নতুন ধরন ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশেও দুজনের মধ্যে ওমিক্রন পাওয়া গেছে। রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এ দুজন বর্তমানে সুস্থ ও শিগগির তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে বলে গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে।
গত ১৩ ডিসেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টিকার বুস্টার ডোজ বা তৃতীয় ডোজ দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলেন। সেদিন বৈঠক শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকও বুস্টার ডোজ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান। একইভাবে কভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটিও বুস্টার ডোজ দেওয়ার পরামর্শ দেয়। পরে গতকাল থেকে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে বুস্টার ডোজ দেওয়া শুরু হয়।
নতুন নিবন্ধন লাগবে না, খুদেবার্তা যাবে : বুস্টার ডোজের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের ষাটোর্ধ্ব বছর বয়সী জনগোষ্ঠী এবং করোনাযুদ্ধের সম্মুখসারির কর্মীদের করোনা টিকার বুস্টার ডোজ দেওয়া হবে। টিকার দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার ছয় মাস পরে তারা বুস্টার ডোজ বা তৃতীয় ডোজ নিতে পারবেন। সেজন্য নতুন করে নিবন্ধনের প্রয়োজন হবে না। যারা তৃতীয় ডোজ পাওয়ার যোগ্য, তাদের কাছে টিকার নিতে খুদেবার্তা চলে যাবে।
এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, আগে যে নিয়মে টিকা দেওয়া হয়েছে, বুস্টার ডোজও সেভাবেই দেওয়া হবে। প্রথমে বয়স্ক ও সম্মুখসারির যোদ্ধারা পাবেন, পর্যায়ক্রমে সবাইকে দেওয়া হবে। যারা প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছেন, তারা ইতিমধ্যেই সুরক্ষা অ্যাপে নিবন্ধিত। যাদের ছয় মাস হয়েছে, তাদের তৃতীয় ডোজ দেব। যারা বুস্টার ডোজ পাওয়ার যোগ্য, তারা কখন কোথায় টিকা পাবেন তা মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে।
মিশ্র টিকায় বুস্টার ডোজ : এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুসরণ করে দেশে বুস্টার ডোজ হিসেবে আপাতত ফাইজারের টিকাই দেওয়া হবে। সবাই এ টিকা পাবেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদন করলে পরে মডার্নার টিকাও দেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্রোরা বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী প্রথম দুই ডোজ একই টিকা নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তৃতীয় ডোজ হিসেবে যেকোনো টিকা নেওয়া যায়। দেশে ফাইজারের টিকা পর্যাপ্ত আছে। ৬৪ জেলায় ফাইজারের টিকা চলে গেছে। আমরা এখন ফাইজারের টিকা দিচ্ছি, কারণ যাদের টিকা নেওয়ার ছয় মাস হয়েছে, তারা সবাই অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নিয়েছিল। বুস্টার ডোজ হিসেবে ফাইজারের টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে টেকনিক্যালি কোনো বাধা নেই। এ কারণে ফাইজারের টিকা তৃতীয় ডোজ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে।
টিকা নিলেন ৬ মন্ত্রী : প্রথম দিন সরকারের ছয় মন্ত্রী বুস্টার ডোজ টিকা নিয়েছেন। তারা হলেনÑ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। জাতীয় অধ্যাপক ডা. শায়লা খাতুন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম টিকা নেন। এছাড়া পুলিশ সদস্য সুলতান, সাংবাদিক ডলার মাহমুদ, আল মারকাজুল ইসলামীর কর্মকর্তা আমির হামজা, নার্সিং সুপারভাইজার খাদিজা বেগম, বিমানবাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার আশিফুলসহ কয়েকজনকে বুস্টার ডোজ দেওয়া হয়।
প্রথম টিকার সেই নার্সকে দিয়েই শুরু : গত ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের নার্স রুনু ভেরোনিকা কস্তাকে টিকার প্রথম ডোজ দিয়েই দেশে প্রথম টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। ১১ মাস পর গতকাল তাকে দিয়েই দেশে শুরু হলো বুস্টার ডোজ কার্যক্রম। টিকা নেওয়ার পর নার্স রুনু বলেন, করোনা টিকার প্রথম ডোজ আমি নিয়েছিলাম। আবার বুস্টার বা তৃতীয় ডোজের টিকাও প্রথম নেওয়ার সুযোগ পেলাম। খুব ভালো লাগছে। স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে সবাইকে অনুরোধ করব বুস্টার ডোজ নিয়ে নিন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।
সারা দেশে ২৮ ডিসেম্বরের পর : অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, গতকাল পরীক্ষামূলকভাবে বুস্টার ডোজ দেওয়া শুরু হলো। পুরোদমে এ কার্যক্রম শুরু করতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। বুস্টার ডোজের জন্য সরকারের সুরক্ষা ওয়েবসাইটে আরও কিছু কাজ করতে হবে। সেটা এখনো শেষ হয়নি। আইসিটি বিভাগ জানিয়েছে, সুরক্ষা ওয়েবসাইট আপগ্রেড করতে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগবে। এর মধ্যে বুস্টার ডোজের প্রস্তুতি শেষ হয়ে যাবে। এরপর সারা দেশে শুরু হবে।
