রোমান স্মৃতিস্তম্ভগুলো যেভাবে টিকে আছে

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২১, ১১:৩৭ পিএম

প্রায় ২ হাজার বছর পরেও ভূমিকম্প, বন্যা ও সামরিক সংঘর্ষ সত্ত্বেও দাঁড়িয়ে আছে রোমান নানা স্মৃতিস্তম্ভ। নিজেদের নকশা, সঙ্গে বিশেষ ধরনের নির্মাণ সামগ্রীর প্রয়োগে এ স্থাপত্যগুলো পৌঁছে গেছে অনন্য মাত্রায়। রোমান স্থাপত্যের খুঁটিনাটি নিয়ে লিখেছেন মুমিতুল মিম্মা 

রোমান স্মৃতিস্তম্ভ

কলোসিয়াম। ইতালির রোমের কেন্দ্রে একটি ডিম্বাকৃতি মুক্তমঞ্চ। দু হাজার বছর বয়স। তা সত্ত্বেও বিশ্বের বৃহত্তম মুক্তমঞ্চ হওয়ার গৌরব এর কাছ থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারেনি। পাথুরে দেয়াল ঘেরা জায়গা। ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের স্থান হয় এ স্থানে। একসময়ের রক্তক্ষয়ী গ্ল্যাডিয়েটর যুদ্ধ থেকে শুরু করে বিলাসবহুল শোভাযাত্রা ও রথের দৌড় অনুষ্ঠান দেখার জন্য এ আঙিনায় ভিড় করত উৎসাহী জনতা। কলোসিয়ামের আরেক নাম ফ্ল্যাভিয়ান মুক্তমঞ্চ। উচ্চতায় ৪ তলা সমান। ডিম্বাকৃতির দুপাশে ১৮৮ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।

কলোসিয়াম নির্মিত হওয়ার প্রায় ৪০ বছর পরে প্যান্থিয়ানে একটি ৪৩ মিটার বিস্তৃত গম্বুজ রয়েছে। শীর্ষভাগ ছাতার মতো ছড়ানো। গম্বুজের কেন্দ্রে একটি জানালা। নিচ থেকে দেখলে মনে হয় মানুষের চোখের তারা। সে তারা থেকে আলো ঠিকরে বেরুচ্ছে। সে জানালার নাম অকুলাস। গম্বুজের ভেতরে প্রাকৃতিক আলো সরবরাহ করাই তার কাজ। প্যান্থিয়ান নাম এসেছে গ্রিক থেকে। গ্রিক দেবতাদের জন্য একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আবহ এনে দেয় এ গম্বুজ। কিছু ইতিহাসবিদের মতে স্মৃতিস্তম্ভটি তৈরি হয়েছিল রোমান সম্রাটদের শ্রদ্ধা জানাতে। সময়ের আবর্তনে অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। ধুলো পড়া ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে টিকে আছে আইকনিক প্যান্থিয়ানের অর্ধগোলক। এখনো বিশ্বের বৃহত্তম কংক্রিটের গম্বুজ হিসেবে টিকে আছে অকুলাস সমৃদ্ধ এই গম্বুজ।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তা হলো এ পর্যন্ত দুটো স্থাপত্যের আলাপ এসেছে, তাদের প্রতিটিই বিশ্বের ‘বৃহত্তম’। যখনই বড় বড় স্থাপত্য বা কাঠামো নির্মাণের কথা এসেছে, রোমানরা স্পষ্ট করে জানত তারা আসলে কী করছে। নির্মিত হওয়ার প্রায় ২ হাজার বছর পরে এ দুটি বিশাল এবং বিস্ময়কর কাঠামো ভূমিকম্প, বন্যা ও যুদ্ধ সহ্য করে এসেছে। রোমান সাম্রাজ্যের বৈপ্লবিক স্মৃতির সাক্ষ্য হয়ে আছে। বিশ্বজুড়ে রোমান সংস্কৃতির স্থায়ী প্রভাবের প্রতিমূর্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন আসে প্রাচীন রোম এত দিন আগে কীভাবে এ ধরনের স্মরণীয় ও টেকসই স্থাপত্যবিদ্যা অর্জন করেছিল?

প্রকৌশলে নতুন মিশেল

প্রকৌশলী ও (নির্মাণ) উপকরণ বিজ্ঞানীরা এখনো রোমান কাঠামো নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন। তাদের ভাষায়, রোমানদের নিজস্ব উপকরণের কংক্রিটের সঙ্গে রোমান উদ্ভাবনী ক্ষমতার জোরে একটি টেকসই নির্মাণ শৈলী তৈরি হয়েছে। যদিও রোমানরা কংক্রিট উদ্ভাবন করেনি, কংক্রিটের বার তৈরি করেছিল।

কংক্রিটের বার রোমান স্থাপত্য শিল্পে বিশেষ প্রভাব রেখে গেছে। কারণ রোমান স্থপতিদের কল্পনা অনুসারে যেকোনো আকারে রূপ দেওয়া যেত এই কংক্রিট বারকে। কংক্রিট বার যেন রোমান স্থপতিদের একঘেয়ে পাথুরে স্থাপত্য নির্মাণ থেকে মুক্তি দিয়েছিল। রোমান স্থাপত্যের স্বাক্ষর রয়েছে এমন খিলান, ভল্ট ও গম্বুজগুলো দেখতে অভিনব তাই-ই নয়, টেকসই স্থাপত্যের জন্য স্থপতিদের ক্রমাগত নির্মাণ সামগ্রীর খোঁজ করে যেতে হয়েছে। নিউ ইয়র্ক রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের যান্ত্রিক প্রকৌশলী রেনাতো পেরুচ্চিও বলেন, আধুনিক পর্যটকরা এসব স্থাপত্য ঘুরে দেখতে গেলে খুব সহজে প্রকৌশল পদ্ধতি সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠবেন। কারণ ‘রোমানদের অত্যাধুনিক বিশ্লেষণ ক্ষমতা তাদের এই ভিন্নধর্মী নকশার দিকে পরিচালিত করত। এরপর অত্যন্ত যতœ সহকারে নির্মাণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তা ফুটিয়ে তোলা হতো।’

কাঠামো বা স্থাপত্য নির্মাণে কংক্রিট খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কারণ কাঠামোর সব উপকরণ আটকে রাখবে কংক্রিট। ‘কংক্রিট’ তাই স্থপতি ও প্রকৌশলীর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। প্রচলিত কংক্রিট থেকে বেরিয়ে এসে রোমানরা তৈরি করেছিল নিজস্ব কংক্রিট। প্রাচীন রোমান কংক্রিট নিয়ে গবেষকদের মতে, কংক্রিটের উপাদানগুলোতে এমন কিছু ছিল যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয় হওয়ার হাত থেকে রোমান স্থাপত্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

এখনকার বেশিরভাগ কংক্রিট পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট দিয়ে তৈরি। সিলিকা বালি, চুনাপাথর, মাটি, চক ও অন্যান্য খনিজের মিশ্রণে প্রায় ২ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। এই মিশ্রণটি ঠাণ্ডা করার পর মিহি পাউডার বানিয়ে ফেলা হতো। পাউডারের সঙ্গে বালি ও পাথরের মিশ্রণে শক্তিশালী কংক্রিট হয়।

অন্যদিকে, রোমান কংক্রিট হলো সাধারণ পোর্টল্যান্ড সিমেন্টের সঙ্গে চুনাপাথরের গুঁড়ো থেকে তৈরি কুইকলাইমের একটি সহজ মিশ্রণ। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে মেশানো হতো আগ্নেয়গিরির শিলা সমষ্টি। রোমের আশপাশে প্রচুর আগ্নেয় শিলা থাকায় সহজলভ্য এই উপকরণটিকে তারা খুব সহজেই ভবন নির্মাণ প্রকৌশলে অন্তর্ভুক্ত করে ফেলে। এসব আগ্নেয়গিরির উপকরণ অত্যন্ত সক্রিয় এবং কয়েক শতাব্দী ধরে রাসায়নিকভাবে সক্রিয় থাকে।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা

কয়েক দশক ধরে রোমান কংক্রিট নিয়ে গবেষণা করছেন ইউটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক মারি জ্যাকসন। তিনি বলেন, ‘পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট রাসায়নিকভাবে সক্রিয় নয়। রোমানরা চেয়েছিল যে, তাদের কংক্রিট সক্রিয়তা দেখাক। তারা এমন একটি মিশ্রণ বেছে নিয়েছিল যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হবে। তবে ক্ষয়ে যাবে না।’  

আধুনিক কংক্রিটের বিপরীতে চলমান সক্রিয়তা রোমান কংক্রিটকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শক্তিশালী হতে সাহায্য করে। দীর্ঘমেয়াদি রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো ছোট ছোট ফাটলগুলোকে শক্তিশালী করে। আগ্নেয়গিরির খনিজ পদার্থের সক্রিয়তাই রোমান কংক্রিটকে হাজার বছর ধরে টিকে থাকতে সাহায্য করছে। আধুনিক কংক্রিট নির্মাণ রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে ১০০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তবে কিছু রোমান কাঠামো হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে।

গবেষকরা বহু বছর ধরে সন্দেহ করছিলেন যে, আগ্নেয়গিরির খনিজ পদার্থের সংযোজনই রোমান কংক্রিটকে টেকসই করেছে তবুও ২০১৪ সালের আগ পর্যন্ত জ্যাকসন ও অন্যরা এ সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট রসায়ন প্রকাশ করেননি। তাদের গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে আগ্নেয়শিলার একটি বিশেষ খনিজ মিশ্রণটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি শক্তিশালী হয়। ফলে কাঠামোতে ফাটল তৈরি হয় না। খনিজের নাম স্ট্র্যাটলিঙ্গাইট।

প্রায় ৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে অ্যাপিয়ান ওয়ে নামের একটি রোমান রাস্তার ধারে নির্মিত হয়েছিল একটি সমাধি। ক্যাসিলিয়া মেতেলা নামের একজন রোমান অভিজাত নারীর সে সমাধি ২১ মিটার লম্বা। সেখান থেকে এক দল গবেষক কংক্রিটের একটি নমুনা নিয়েছিলেন। দেখা গেল, সমাধির কংক্রিটে আগ্নেয়গিরির পাথর ব্যবহার করা হয়েছিল যাতে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়ামের সমৃদ্ধ খনিজ। তার নাম লিউসাইট। ২ হাজার বছর ধরে বৃষ্টি ও ভূগর্ভস্থ জল সমাধির দেয়ালে প্রবেশ করে। লিউসাইট সে জলে পটাশিয়াম ছেড়ে দেয়। এতে তৈরি হয়েছিল পটাশিয়াম জেল। যা দেয়ালে ফাটল ধরা রোধ করে। গবেষক জ্যাকসন ও তার সহকর্মীরা দেখতে পান যে, কংক্রিটের দ্রবীভূত পটাশিয়াম রাসায়নিক আঠা হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও কাঠামোর প্রতিটি অংশের শক্তি বজায় রাখে। 

পেরুচ্চি বলেন, ‘একজন স্থপতি যদি আজ প্যান্থিয়ান নির্মাণের চেষ্টা করেন তাহলে বড় ধরনের ভুল করা হবে। কারণ শক্তিশালী বাইন্ডার বা আঠা ছাড়া আধুনিক কংক্রিটের কাঠামোতে সাধারণত ব্যবহৃত ইস্পাতের বার ও গম্বুজ আধুনিক সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কোড লঙ্ঘন করবে। প্যান্থিয়ানের গম্বুজ উচ্চমাত্রার চাপ সহ্য করে ১৯ শতাব্দী ধরে টিকে আছে। এত চাপ সহ্য করেও কীভাবে বছরের পর বছর ধরে টিকে থাকা সম্ভব এ প্রশ্নের জবাবে আপনার মতে হতে পারে হয় মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ভিন্নভাবে কাজ করেছিল অথবা আমরা বিশেষ কিছু স্থাপত্য জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি।’

প্রতিস্থাপন

কংক্রিটের রসায়ন ছাড়াও প্যান্থিয়ানের পেছনে রোমান স্থপতিরা তাদের আরও কিছু জ্ঞানের প্রয়োগ করেছিল। গম্বুজের দেয়ালটা যথাসম্ভব হালকা করারও ছিল এ স্থাপত্যের অন্যতম লক্ষ্য। গম্বুজে কংক্রিটের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে নিচের দিক থেকে ওপরের দিক অপেক্ষাকৃত হালকা।

আধুনিক বিশ্বে কংক্রিট সমস্ত দরকারি ও সুন্দর স্থাপত্য তৈরিতে খুব প্রয়োজনীয় হওয়া সত্ত্বেও এর কিছু খারাপ দিক রয়েছে। কারণ কংক্রিট তৈরিতে দরকার পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট। যা বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ৮% বাড়িয়ে দেয়। রোমান কংক্রিটে কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমিয়ে আনতে পারে। কারণ দীর্ঘকাঠামো ঘন ঘন অবকাঠামো প্রতিস্থাপনের সুযোগ কমিয়ে দেয়।

বর্তমানে আমরা যদি ১০০ বছরের পরিবর্তে ৫০০ বছরের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করি তাহলে প্রতিটি প্রকল্পে রোমান কংক্রিট পুনঃস্থাপন সম্ভব। দীর্ঘস্থায়ী জিনিসগুলো সাধারণত ভিন্নভাবে বিবেচনা করা হয়। জ্যাকসন ও তার সহযোগীরা বর্তমানে একটি মার্কিন প্রকল্পে কাজ করছেন যাতে সঠিকভাবে রোমান কংক্রিট বানানো সম্ভব হয়। এটি নির্মাণকাজে ব্যয় কমাবে। একই সঙ্গে কমাবে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণও।

তবে রোমান কংক্রিটের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে শুকানোর সময়। কংক্রিট শুকাতে ২৮ দিন সময় লাগে। পূর্ণ শক্তিতে পৌঁছাতে ছয় মাসের মতো লাগে। সাধারণ কংক্রিট কম শক্তিসম্পন্ন বলে বিশাল ভবন নির্মাণকাজে তেমন কোনো অগ্রগতির দেখা মিলবে না। একই সঙ্গে উঁচু কাঠামোতে তেমন সুফল পাওয়া যাবে না।

রোমান কংক্রিট নির্মাণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত রসায়নকে ত্বরান্বিত করার উপায় রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এমন একটি কৌশল নিয়ে কাজ করছেন। যার মধ্য দিয়ে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমবে। তবে রোমান কংক্রিট উদ্ধার প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল সময়। বিজ্ঞানীরা বলেন, কংক্রিট মিশ্রণে কার্বন ডাই-অক্সাইড স্প্রে দিয়ে রোমান কংক্রিট খুব সহজেই শুকিয়ে ফেলা সম্ভব। তাদের ভাষায়, ‘রোমানদের সবকিছু অনুকরণ করার দরকার নেই। আমাদের দরকার টেকসই কংক্রিট। রোমান সমস্ত জ্ঞান পুনরুদ্ধার করা সম্ভব না। ভবিষ্যতের জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত