ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের প্রায় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে গাইবান্ধার তুলসীঘাট শামসুল হক ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ একরামুল হক খানের বিরুদ্ধে। অধ্যক্ষের এই দুর্নীতির সত্যতা মিলেছে মাধ্যমিক ও শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তদন্তেও। এছাড়া অবৈধ নিয়োগ, অনৈতিক প্রক্রিয়ায় বেতন আদায়সহ একরামুল হক খানের বিরুদ্ধে আরও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এর আগে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানেও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ মেলে। তবে এতসব কিছুর পরও বহাল তবিয়তে রয়েছেন অধ্যক্ষ একরামুল। কারণ তিন মাস ধরে মাউশির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এ বিষয়ে শুধু চিঠি চালাচালিই করে যাচ্ছেন।
যদিও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জনবল কাঠামো-২০২১ অনুযায়ী, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ মেলার পর সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারে মাউশি। প্রাথমিক ব্যবস্থা হিসেবে এমপিও স্থগিতের বিধান রয়েছে। কিন্তু অধ্যক্ষ একরামুল হক খানের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তিন মাসের চেষ্টায়ও তা জানতে পারেননি অভিযোগকারীরা। এমন পরিস্থিতিতে কলেজটির ব্যবস্থাপনার কমিটির সদস্য ও শিক্ষক-কর্মকর্তারা মনে করছেন, ঘুষ দিয়ে শাস্তি আটকে রেখেছেন একরামুল হক খান। কারণ কিছুদিনের মধ্যে তার অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। চাকরি জীবনের শেষে এসে শাস্তি পেলে অবসর-উত্তর সুযোগ-সুবিধা আটকে যেতে পারে।
অধ্যক্ষ একরামুল হক খানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশির বেসরকারি কলেজ শাখার উপপরিচালক এনামুল হক হাওলাদার গত মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রসিডিউর মেনে কাজ করছি। ফাইলটি ওপরে পাঠানো হয়েছে। নেমে এলে বলতে পারব কবে কী হবে।’ যদিও এর আগে গত ১৩ ডিসেম্বর তিনি এই প্রতিবেদককে একই কথা বলেছিলেন।
মাউশির প্রতিবেদন ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়া অভিযোগ থেকে জানা যায়, একরামুল হক খান ১৯৮৯ সালে তুলসীঘাট শামসুল হক ডিগ্রি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯৪ সালে তিনি রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের তুলসীঘাট শাখায় একটি ব্যক্তিগত সঞ্চয়ী হিসাব চালু করেন। যার নম্বর ৩৩৫৪। ২০১১ সালে জনতা ব্যাংকের তুলসীঘাট শাখায় চালু করেন আরেকটি ব্যক্তিগত সঞ্চয়ী হিসাব। যার নম্বর ৬৬৬। জনতা ব্যাংকের একই শাখায় (নম্বর ২১৮/৬) রয়েছে তুলসীঘাট ডিগ্রি কলেজের যৌথ হিসাব। যেখানে কলেজ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও অধ্যক্ষের স্বাক্ষরে লেনদেন হওয়ার কথা। পদাধিকার বলে কলেজটির সভাপতি হন গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক (ডিসি)।
অধ্যক্ষ একরামুল হক খানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তে মাউশি গঠিত কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা বিভিন্ন ফি কলেজের যৌথ হিসাবে জমা করার কথা থাকলেও তা না করে ব্যক্তিগত দুটি হিসাবে জমা ও উত্তোলন করতেন অধ্যক্ষ একরামুল। এই অনিয়মে আপত্তি জানান কলেজের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আব্দুল হালিম। তাই তাকে বিভিন্নভাবে চাপে রেখে অফিস সহকারী শ্যামল চন্দ্র সরকার ও ইশরাকুল আলমকে অনিয়মের কাজে ব্যবহার করতেন অধ্যক্ষ। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বোর্ড ফি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসহ বিভিন্ন খাতে বাড়তি টাকা নিতেন একরামুল হক খান। পরে বোর্ড ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত হারে টাকা পরিশোধের পর উদ্বৃত্ত যে অর্থ থাকত তা আত্মসাৎ করতেন।
তুলসীঘাট ডিগ্রি কলেজের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আব্দুল হালিম জানান, কলেজটিতে অনার্স, ডিগ্রি, উচ্চ মাধ্যমিক ও কারিগরি (বিএম) এই চার শাখা মিলে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। এসব শিক্ষার্থীর ভর্তি ফি, মাসিক বেতন এবং বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার ফরম পূরণ বাবদ প্রতি বছর ১৫-১৬ লাখ টাকা আদায় হয়। বোর্ড ফি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ফি ও কলেজ উন্নয়ন বাবদ ব্যয় হওয়ার পরও কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা করে তহবিলে থাকার কথা।
একরামুল হক খানের ব্যক্তিগত দুটি ও কলেজের যৌথ হিসাবের এক বছরের একটি হিসাব বিবরণী দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে। এরমধ্যে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের তুলসীঘাট শাখার ব্যক্তিগত হিসেবে ২০১৭ সালের মাত্র আট মাসে তিনি লেনদেন করেছেন ১৩ লাখ ৫৪ হাজার ১১ টাকা। এসব টাকা জমার রসিদে স্বাক্ষরদাতা হিসেবে নাম রয়েছে অফিস সহকারী শ্যামল চন্দ্র সরকার ও ইশরাকুল আলমের। এছাড়া জুলাই ২০১৬ থেকে জুলাই ২০১৭ পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের ব্যক্তিগত হিসাবে লেনদেন করেছেন ২২ লাখ ৫১ হাজার ২৭০ টাকা। অন্যদিকে কলেজটির যৌথ হিসাবের জুলাই ২০১৬ থেকে জুলাই ২০১৭ পর্যন্ত হিসাব বিবরণী ঘেঁটে দেখা যায়, সেখানে ডিসেম্বর ২০১৬ থেকে কোনো টাকা জমা বা উত্তোলন হয়নি। এর আগে যেসব জমা দেখানো হয়েছে তার পরিমাণ খুবই কম।
অবৈধ লেনদেনের এই বিষয়টি জানাজানি হলে কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির অনেক সদস্য আপত্তি জানান। এরপর ২০১৮ সালে ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় নিজ হিসাবে অর্থ লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করেন অধ্যক্ষ একরামুল। নিজের সব অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়ে কলেজের যৌথ অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তিনি কলেজের যৌথ অ্যাকাউন্টে মাত্র ১ লাখ ৯৫ হাজার ৫০৯ টাকা জমা দিয়ে পরবর্তী সভায় অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে কলেজটির ব্যবস্থাপনা কমিটির অভিভাবক সদস্য আবু বকর সরকারের দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে তদন্তে নামে মাউশির রংপুর অঞ্চলিক কার্যালয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই তদন্ত কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগই প্রমাণিত। তদন্তকালে তিনি আমাদের সহযোগিতা করেননি। বিষয়টি গুরুতর অপরাধ।’
অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী আবু বকর সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টাকা আত্মসাতের কৌশল হিসেবে অধ্যক্ষ নিজস্ব হিসাব ব্যবহার করতেন। একরামুল হক খান কলেজে যোগ দেওয়ার পর থেকে পকেট কমিটির (ব্যবস্থাপনা) মাধ্যমে কলেজ চালান। শুধু এক বছরের ব্যাংক স্টেটমেন্ট থেকে আমরা যে হিসাব পেয়েছি তাতে গত ২৮ বছরে কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ করে কলেজটিকে পঙ্গু বানিয়ে দিয়েছেন অধ্যক্ষ।’
মাউশির বিভ্রান্তিকর তথ্য : একরামুল হক খানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানতে গত মাসে যোগাযোগ করা হলে মাউশির বেসরকারি কলেজ শাখার সহকারী পরিচালক আব্দুল কাদের বলেন, অধ্যক্ষ এবং ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির (গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক) বক্তব্য জানতে চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পরে ফের গত ১৩ ডিসেম্বর যোগাযোগ করা হলে মাউশির এই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অধ্যক্ষ ও সভাপতি তাদের বক্তব্য পাঠিয়েছেন। এখন পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সেদিন একই তথ্য জানান মাউশির কলেজ শাখার উপপরিচালক এনামুল হক হাওলাদার। কিন্তু গত মঙ্গলবার এ বিষয়ে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক আব্দুল মতিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মাউশিতে থেকে কোনো চিঠি পাননি। ফলে এ সংক্রান্ত কোনো বক্তব্যও তিনি মাউশিতে পাঠাননি। এমনকি পদাধিকার বলে কলেজটির সভাপতি হলেও অধ্যক্ষ একরামুল হক খানের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে কিছুই জানা নেই বলে উল্লেখ করেন জেলা প্রশাসক আব্দুল মতিন।
অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আরও যত অভিযোগ
দুদকে জমা পড়া অভিযোগে বলা হয়, অধ্যক্ষ একরামুল হক খান খাতা-কলমে সহকারী লাইব্রেরিয়ান পদে একজনকে নিয়োগ দেখিয়ে এমপিওভুক্ত করেন। অথচ ওই নামে বাস্তবে কলেজে কেউ কর্মরত ছিল না। ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি এই নামে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেন। পরে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসনের একটি তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে বিষয়টি ধরা পড়লে ওই ভুয়া নিয়োগ বাতিল হয়ে যায়। এছাড়া নিয়ম অনুযায়ী ভুয়া ওই নিয়োগের বিপরীতে উত্তোলন করা টাকা সরকারের কোষাগারে ফেরত দেওয়ার চিঠি দেওয়া হলেও একরামুল হক খান সেটি করেননি। উল্টো একই ইনডেক্স (এমপিওভুক্তির নম্বর) ব্যবহার করে একজন কম্পিউটার প্রদর্শককে এমপিওভুক্ত করেছেন।
দুদকে জমা পড়া অভিযোগে আরও বলা হয়, কলেজের বিএম (কারিগরি) শাখার দুই শিক্ষক এমএসএস আয়শা আক্তার বানু ও রেজাউল করিমের শিক্ষাগত যোগ্যতা তৃতীয় শ্রেণি হওয়ায় কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর তাদের নিয়োগ অনুমোদন করেনি। কিন্তু অভিযোগ আছে ভুয়া সার্টিফিকেট ব্যবহার করে অধ্যক্ষ তাদের এমপিওভুক্ত করেছেন। একই কৌশল খাটিয়ে এরশাদুল নামে একজন প্রদর্শক নিয়োগ করেছেন তিনি। এছাড়া বিএম শাখায় ল্যাব সহকারী মকদুবুর রহমান ও মাহবুবুর রহমান নামে দুজনকে নিয়োগ দিয়েছেন অধ্যক্ষ। কিন্তু তারা কলেজে কর্মরত নেই। তাদের একজন বর্তমানে ঢাকায় পোশাককর্মী হিসেবে এবং আরেকজন গাইবান্ধা জর্জকোর্টে মুহুরী হিসেবে কর্মরত। অথচ অধ্যক্ষ তাদের নামে বরাদ্দের বেতন তুলে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ আছে, নিজে এমপিওভুক্ত শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও একরামুল হক খান কলেজের স্নাতক শাখার নিবন্ধিত শিক্ষক হিসেবে কলেজ তহবিল থেকে মাসে ১০ হাজার টাকা করে বেতন নেন। যা আইনত অবৈধ। এছাড়া তিনি সম্প্রতি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি (ডিসি) আব্দুল মতিনের স্বাক্ষর জাল করে কলেজের স্নাতক শাখার শিক্ষক নুরুন্নাহার ইয়াসমিনের পদোন্নতির জন্য মাউশির রংপুর অঞ্চলে আবেদন পাঠিয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তবে এত সব অভিযোগের সবকিছুই অস্বীকার করে উল্টো তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীরাই দুর্নীতিবাজ বলে দাবি করছেন অধ্যক্ষ একরামুল হক খান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘আমি ৩২ বছর কলেজটির প্রিন্সিপাল। শূন্য থেকে কলেজটিকে আমি অনার্স পর্যন্ত নিয়ে গেছি। দুর্নীতি করলে কোটিপতি হয়ে যেতাম। যারা অভিযোগ করেছে তারাই দুর্নীতিবাজ। কলেজটিকে বিশৃঙ্খলায় নিয়ে যেতে তারা এই অপচেষ্টা চালাচ্ছে।’
