স্বামীর সঙ্গে ৮ মাসের শিশুসন্তান নিয়ে রাজধানী থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন এক নারী। গত বুধবার সকালে তারা কক্সবাজার পৌঁছে শহরের হলিডে মোড় এলাকায় ৫ তলা একটি আবাসিক হোটেলে ওঠেন। বিকেলে স্বামী-সন্তান নিয়ে ঘুরতে বের হন পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের স্থান সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে। সন্ধ্যার দিকে হোটেলে ফেরার পথে একদল অপহরণকারী স্বামী-শিশুসন্তানকে হত্যার হুমকি দিয়ে জিম্মি করে নারী পর্যটককে তুলে নিয়ে রাতে কয়েক দফা ধর্ষণ করে।
জানা যায়, ওই নারীকে তুলে নিয়ে প্রথমে সৈকতের সানি বিচ এলাকায় একটি ঝুপড়ি ঘরে তিনজন পালাক্রমে ধর্ষণ করে। পরে সেখান থেকে নেওয়া হয় ‘জিয়া গেস্ট ইন’ নামে একটি হোটেলে। সেখানে আরেক দফা ধর্ষণের শিকার হন ওই নারী পর্যটক। এরপর ওই নারীকে কক্ষে আটকে রেখে পালিয়ে যায় অপহরণকারীরা। পরে জানালা দিয়ে সাহায্য চাইলে স্থানীয়রা তাকে কক্ষ থেকে বের করেন। রাত ১১টার দিকে ওই নারীকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠায় র্যাবের একটি দল।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সিসিটিভির ফুটেজ দেখে দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার র্যাব-১৫ এর সিপিসি কমান্ডার মেজর মেহেদী হাসান। তারা হলো, কক্সবাজার শহরের বাহারছড়া এলাকার আরিফুল ইসলাম আশিক ও তার সহযোগী আব্দুর রহমান জয়। এ ছাড়াও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ‘জিয়া গেস্ট ইন’ হোটেলের ম্যানেজার রিয়াজ উদ্দিন ছোটনকে আটক করা হয়েছে।
এদিকে চারজনের নাম উল্লেখ করে সাতজনের বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় মামলা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ওই নারীর স্বামী এ মামলা করেন। আসামিদের মধ্যে রয়েছেআরিফুল ইসলাম আশিক, বাবু, ইসরাফিল ও রিয়াজ উদ্দিন। মামলাটি ট্যুরিস্ট পুলিশকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম ।
ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে তিনজনই কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি এস এম সাদ্দাম হোসেনের অনুসারী বলে খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা জানান, আসামিরা সাদ্দামের ছত্রচ্ছায়ায় মাদক কারবার, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে আসছে।
এদিকে আশিক শনাক্ত হওয়ার পর সাদ্দামের সঙ্গে তার এবং অন্যদের বেশ কিছু ছবি ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে অভিযুক্তদের সাদ্দামের কর্মী হিসেবেও উল্লেখ করেছেন কেউ কেউ।
সাদ্দাম হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেকে আমার কাছে এসে ছবি তুলেছেন। এরাও তাদের মতো। ছবি থাকলে কি ছাত্রলীগ হয়?’
সাদ্দাম দাবি করেন, অভিযুক্তরা কেউ ছাত্রলীগের কোনো পদে নেই।
পর্যটক ধর্ষণের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতি। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাসেম সিকদার বলছেন, ‘ধর্ষণের ঘটনা কক্সবাজার পর্যটন শিল্পের জন্য অশনিসংকেত।’ স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সন্ধ্যা হলেই লাবণী পয়েন্ট থেকে শুরু করে শৈবাল ও কবিতা চত্বর ডায়াবেটিক পয়েন্টে কোনো নিরাপত্তা থাকে না। ফলে প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো অপরাধ হচ্ছে। এসব এলাকায় জেলা কিংবা ট্যুরিস্ট পুলিশের তৎপরতা কার্যত নিষ্ক্রিয়। তবে তবে টুরিস্ট পুলিশ বলেছে, দীর্ঘদিন ধরে ঝাউবাগানের শৈবাল ও কবিতা চত্বরে পুলিশ বক্স রয়েছে। সেখানে নিয়মিত পুলিশ টহল রয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে ও জড়িতদের শাস্তির দাবিতে মশাল মিছিল করেছে ছাত্র ইউনিয়ন কক্সবাজার শহর শাখা।
ধর্ষণের শিকার ওই নারী পর্যটক জানান, ‘লাবণী পয়েন্ট থেকে সন্ধ্যায় হোটেলে ফেরার পথে একটি ছেলের সঙ্গে তার স্বামীর ধাক্কা লাগে। এই নিয়ে স্বামীর সঙ্গে উপর্যুপরি তর্কে জড়ায় ছেলেটি। এক পর্যায়ে স্থানীয় আরও দুই যুবক ঘটনাস্থলে এসে হাজির হয়। তাৎক্ষণিক তার স্বামী ও সন্তানকে ইজিবাইকে উঠিয়ে তাকে পৃথক করে ফেলে।
ওই নারী আরও বলেন, ‘আমাকে ওই এলাকায় একটি ঝুপড়ি ঘরে নিয়ে তিনজনে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এক পর্যায়ে আমার শিশুসন্তান ও স্বামীকে হত্যার ভয় দেখিয়ে হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে ওই যুবকের কথামতো স্ত্রী পরিচয় দিতে বাধ্য হই। রুমে নিয়ে আবারও এক যুবক ধর্ষণ করে। পরে রুমের দরজা আটকিয়ে পালিয়ে যায় তারা। এরপর হোটেল থেকে বেরিয়ে প্রথমে ৯৯৯ ফোন করি।’
কক্সবাজার র্যাব-১৫ এর সিপিসি কমান্ডার মেজর মেহেদী হাসান বলেন, ‘ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে কক্সবাজারে ভ্রমণে আসা এক পর্যটক নারী ধর্ষণের অভিযোগের খবর পেয়ে র্যাবের একটি দল নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে ভিকটিমকে উদ্ধার করি। পরে তদন্ত করে এবং সিসিটিভির ফুটেজ দেখে অপহরণকারীদের দুজনকে শনাক্ত করি। এ ছাড়াও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জিয়া গেস্ট ইন হোটেলের ম্যানেজার রিয়াজ উদ্দিন ছোটনকে আটক করা হয়। শনাক্তকারী অভিযুক্তদের ধরতে র্যাবের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি (তদন্ত) বিপুল চন্দ্র দে জানান, ধর্ষণের শিকার ওই নারী কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তিনি আরও জানান, অভিযুক্ত আরিফুল ইসলাম আশিক ও আব্দুর রহমান জয় চিহ্নিত ছিনতাইকারী। তাদের ধরতে পুলিশ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে শহরের কলাতলী এলাকায় ‘জিয়া গেস্ট ইন’ হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কে থাকা ম্যানেজার আমির হোসেন ও তামজিদ আল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওইদিন রাতে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে আরিফুল ইসলাম আশিক ও সাথী নামে দুজন নারী-পুরুষ রুম ভাড়া নেয়। পরে এক ঘণ্টার মধ্যে রুম ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। এতে তাদের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে কক্সবাজার জেলার ঈদগাঁও থানার মাইজপাড়া গ্রামে।’
জিয়া গেস্ট ইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ওই রাতে এক নারী ও এক ছেলে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে হোটেলের নিয়মানুযায়ী রুম ভাড়া নেয়। এর অন্তত ৪০ মিনিট পর রুম ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। এরপর রাত ১১টার দিকে ওই নারীকে নিয়ে র্যাব হোটেল আসে। এ সময় র্যাবের দল হোটেলের সিসিটিভির ফুটেজ থেকে শুরু করে যাবতীয় প্রমাণ নিয়ে যায়। হোটেল থেকে কোনো নারীকে র্যাব উদ্ধার করেনি। সুতরাং ওই ঘটনায় হোটেল কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকার কথা নয়।’
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল কাসেম সিকদার বলেন, ‘ঘটনাটি শুনে আমি দ্রুত জিয়া গেস্ট ইন হোটেল পরিদর্শন করি। যতটুকু জানি ওই দিন স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে এক নারী ও পুরুষ রুম ভাড়া নিয়ে পরে ছেড়ে দেয়। পরে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে র্যাব হোটেল ম্যানেজার রিয়াজ উদ্দিন ছোটনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘পর্যটক ধর্ষণের ঘটনা কক্সবাজার পর্যটন শিল্পের জন্য অশনিসংকেত।’
গতকাল বিকেলে শহরের সানি বিচ এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, এলাকাটিতে সুনসান নীরবতা। সেখানে নুরুল হক নামে এক যুবকের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হলে তিনি জানান, প্রতি রাতে পাশের ঝাউবাগানে গাঁজাসেবী ও জুয়াড়িদের আসর বসে। এখানে নানা রকম মাদকসেবীর আড্ডায় পরিণত হয়। বুধবার রাতেও কারা যেন উচ্চস্বরে কথা বলছিল। সে ভয়ে বাসা থেকে বের হয়নি। এখানেই ধর্ষণের ঘটনা প্রথম।
আবুল মন্জু নামে একজন অভিযোগ করে বলেন, সন্ধ্যা হলেই কক্সবাজারের পর্যটন এলাকা লাবণী থেকে শুরু করে কবিতা চত্বর ও ডায়াবেটিক পয়েন্টে কোনো ধরনের নিরাপত্তা থাকে না। এ কারণে অপরাধীদের দখলে থাকে এসব ঝাউবীথি। ফলে এসব এলাকায় প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়। তার ভাষ্যমতে, এসব এলাকায় জেলা পুলিশ থেকে শুরু করে ট্যুরিস্ট পুলিশের কোনো তৎপরতা নেই। এখানে পুলিশ নিষ্ক্রিয়।
জানতে চাইলে ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মুহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘পর্যটক নারী ধর্ষণের বিষয়টি জানার পরপরই ট্যুরিস্ট পুলিশ তদন্ত শুরু করে। দীর্ঘদিন ধরে ঝাউবাগানের শৈবাল ও কবিতা চত্বরে পুলিশবক্স রয়েছে। সেখানে নিয়মিত পুলিশ টহল রয়েছে। এতে অপরাধীদের বিচরণের প্রশ্ন আসে না।’
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জেলা পুলিশ নিষ্ক্রিয়তার বিষয়টি সঠিক নয়। হোটেল-মোটেল জোনে যে নারীটি ধর্ষণের অভিযোগে ৯৯৯ ফোন দেওয়ার কথা বলছেন, তা আমরা জানি না। কারণ ৯৯৯ থেকে জেলা পুলিশের কাছে কোনো ধরনের ফোন আসেনি। তারপরও খবর পেয়ে কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং ভিকটিমের সঙ্গে কথা বলেছেন।’
র্যাব-১৫ কক্সবাজারের অধিনায়ক লে. কর্নেল খায়রুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘কক্সবাজারে বেড়াতে আসা এক পর্যটক নারী ধর্ষণের শিকার হওয়ার বিষয়টি জানার পরপরই র্যাবের একটি দল নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছি এবং জিয়া গেস্ট ইন হোটেল থেকে ওই নারীকে উদ্ধার করি। উদ্ধার হওয়ার পর নারী র্যাবকে জানায়, তার ৮ মাসের সন্তান ও স্বামীকে জিম্মি করে অপহরণকারীরা। তাদের মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে জিয়া গেস্ট ইন হোটেলে নিয়ে ধর্ষণ করে পালিয়ে যায়। পরে ওই নারীকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। পরে তদন্ত করে আসামিদের মধ্যে দুজনকে শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কক্সবাজার শহরের বাহারছড়া এলাকার স্থানীয় অনেকেই বলেছেন, ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত আরিফুল ইসলাম আশিক একজন চিহ্নিত ছিনতাইকারী। তার রয়েছে ৩২ জনের একটি বিশাল সিন্ডিকেট। তারা একেকজন একেকভাবে বিভক্ত হয়ে শহরের অলিগলিতে ছিনতাইসহ নানা অপরাধ কর্মকান্ড করে। কিছুদিন আগে অভিযুক্ত আরিফুল ইসলাম আশিক জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে। মুক্তি পাওয়ার পর পুনরায় অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে এবং সর্বশেষ নারী পর্যটক ধর্ষণকান্ডে জড়িয়ে পড়েছে। তাই, তাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি স্থানীয়দের।
নারী পর্যটক ধর্ষণে জড়িতদের শাস্তির দাবিতে মশাল মিছিল : কক্সবাজারে পর্যটক নারী ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মশাল মিছিল করেছে ছাত্র ইউনিয়ন কক্সবাজার শহর শাখা। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মিছিলটি শহরের লালদীঘির পাড়স্থ কার্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে বের হয়ে প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে সমাবেশে বক্তারা বলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ধর্ষকদের বিচারের আওতায় আনা না হলে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন কক্সবাজার জেলা সংসদ আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবে।
ছাত্র ইউনিয়ন কক্সবাজার জেলা সংসদের সভাপতি জয় বড়ুয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক মুক্তাদিল জয়, শহর সংসদের সাধারণ সম্পাদক নিলয় দাশ, জেলা সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক বাবলু দে।
