মালদ্বীপে বাংলাদেশিদের সংবর্ধনায় প্রধানমন্ত্রী

প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০২:২১ এএম

মানুষের কল্যাণ করা তার সরকারের দায়িত্ব উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মালদ্বীপে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বর্তমানে যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হচ্ছেন, তার সমাধানে তার সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

গতকাল শুক্রবার মালদ্বীপে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেওয়া সংবর্ধনায় এ কথা বলেন তিনি। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মালদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ইস্কান্ধার স্কুল অডিটরিয়ামে, মালে চাঁদনী মাগুতে সমবেত হন। প্রধানমন্ত্রী মালদ্বীপে তার আবাসস্থল থেকে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমি একটি সফল দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করেছি। অনথিভুক্ত বাংলাদেশি শ্রমিকদের বৈধ করার বিষয়টি সংলাপে প্রাধান্য পেয়েছে।’ এখানে অকস্মাৎ এসে পড়ায় যারা এখনো বৈধতা পাননি, সে বিষয়ে মালদ্বীপ সরকারের সঙ্গে তার সরকারের এমওইউ স্বাক্ষরের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশি প্রবাসীরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ সরাসরি মালদ্বীপের মুদ্রায় যাতে দেশে পাঠাতে পারেন, সে ব্যবস্থাও তিনি নেবেন; যাতে তাদের লোকসানের মুখে পড়তে না হয়।

প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে এখানকার প্রবাসীরা যাতে দেশে টাকা পাঠাতে পারেন, সে ব্যবস্থা তার সরকার করে দেবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখানকার বিভিন্ন দ্বীপের অভিবাসীরা যাতে নির্বিঘেœ দেশে টাকা পাঠাতে পারেন, সে জন্য প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংককে আমি বলব, এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে এবং এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাটা করে দেবে; যাতে ডলার কিনে আবার বাংলাদেশে পাঠানোতে যে লোকসানটা হয়, সেটা বন্ধ হয়।’

দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোদের জন্য তার সরকার ২ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যে টাকা আপনারা পাঠান তার থেকেও বেশি টাকা কিন্তু সরাসরি আপনার পরিবার পেয়ে থাকে।’

মালদ্বীপের সঙ্গে কানেকটিভির উন্নয়নে তার সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পরই তার সরকার বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করে দেয় এবং বেসরকারি খাতে বিমান পরিচালনারও সুযোগ সৃষ্টি করে। যে কারণে আজকে একটি বেসরকারি খাতের বিমান মালদ্বীপে আসা শুরু করেছে। সরকারি বিমানে আমরা মালদ্বীপে যাতায়াতের একটা ব্যবস্থা করব, সে লক্ষ্য আমাদের রয়েছে।

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে সংযোগ জোরদারে সম্মত হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বিমান ভারতের চেন্নাই হয়ে মালদ্বীপের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ চালু করার বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীরা আপনাদের (মালদ্বীপে প্রবাসী বাংলাদেশি) সঙ্গে তাদের সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন।’ তার সরকার সমস্যার সমাধানে সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রবাসীদের কল্যাণ করার বিষয়টিকে আমরা সব সময়ই একটা দায়িত্ব মনে করি। তবে আপনারা একটা কাজ করবেন, যারা বিদেশে আসতে চান, তারা যেন দালাল ধরে না আসেন। তারা যেন বৈধভাবে আসার চেষ্টা করেন। কেননা অনেকে বাড়িঘর বিক্রি করে অনেক কষ্টে প্রবাসে পাড়ি জমালেও কাক্সিক্ষত বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হন।’

প্রবাসে অবৈধপথে পাড়ি জমাতে গিয়ে অনেকের মৃত্যু হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এভাবে সোনার হরিণের পেছনে ছোটার কোনো দরকার নেই। তা ছাড়া তার সরকার দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।

তার সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমগ্র বাংলাদেশে তার সরকার ডিজিটাল সেন্টার করে দিয়েছে, যার মাধ্যমে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে রেজিস্ট্রেশন করেই তারা বিদেশে আসতে পারেন। কাজেই বাড়ি-ঘর বিক্রি করে দালালের হাতে টাকা দেওয়ার কোনো দরকার নেই; বরং প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধাও তারা নিতে পারবেন এবং ক্ষেত্র বিশেষে কোনো জামানত ছাড়াও এই ঋণ দেওয়া হয়।

শেখ হাসিনা বলেন, মালদ্বীপে যে ধরনের কাজের সুযোগ রয়েছে, সেটা বিবেচনায় নিয়ে তার সরকার মালদ্বীপে অভিবাসী প্রত্যাশীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করে দেবে। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমাদের আলোচনা হয়েছে মালদ্বীপে কী ধরনের কাজের ব্যবস্থা রয়েছে, তার একটা ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে দিলে আরও ভালো কাজের সুযোগ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি মালদ্বীপের যারা বাংলাদেশে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা করছে, তাদের বৃত্তি দেওয়ারও উদ্যোগ নেবে তার সরকার।

মালদ্বীপে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সবাইকে করোনার টিকা দেওয়ায় মালদ্বীপ সরকারকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘তারা এখানে কোনো তফাত করেননি, সবাইকে টিকা দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনাও করেছেন।’

বাংলাদেশের পণ্যের একটি ভালো বাজার মালদ্বীপে রয়েছে এবং এখানে পণ্য রপ্তানি সম্প্রসারণের বিষয়েও দেশটির প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তার আলাপ হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ইতিপূর্বে মালদ্বীপে ডিস্যালাইনিটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নৌবাহিনীর জাহাজে করে মালদ্বীপে সুপেয় পানি এবং পানি লবণাক্ততামুক্ত করার মেশিন পাঠানোয় বাংলাদেশের উদ্যোগের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তা ছাড়া করোনাকালীন জরুরি ওষুধপত্রও আমরা পাঠিয়েছি। আবার করোনাকালে বিমানবাহিনীর বিমান পাঠিয়ে ১০ হাজার প্রবাসীকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিল তার সরকার। বলেন তিনি।

তার সরকারের দুটি কার্গো বিমান কেনার পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা প্রবাসীদের আশ্বস্ত করেন, তাহলে আর তাদের মালপত্র দেশে পাঠাতে কোনো সমস্যা হবে না।

পঁচাত্তরের বিয়োগান্ত অধ্যায় এবং এরপর ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে জাতির পিতাকে হত্যার বিচারের পথ রহিত করায় তৎকালীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের পদক্ষেপ এবং ১৫ আগস্টের কালরাতে বিদেশে থাকায় বেঁচে যাওয়া তাদের দুই বোনকে (শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা) দেশে ফিরতে না দেওয়ায় ৬ বছর বিদেশে রিফিউজি জীবন যাপনে বাধ্য হওয়ার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, অনেক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে সরকার গঠনের পর ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স রহিত করে জাতির পিতা হত্যার এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলেও যারা ষড়যন্ত্রকারী তাদের ষড়যন্ত্র এখনো থেমে নেই। তিনি বলেন, ‘সেটা তো আপনারা নিজেরাই জানেন। বারবার আমাকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে। কতবার আমাকে বন্দি করা হয়েছে। এমনকি আমাকে ক্যান্টনমেন্টে ডিজিএফআইয়ের সেলেও নিয়ে গেছে ইন্টারোগেশন করার জন্য।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে, জাতির পিতার মেয়ে। আমি এসবে কখনো পাত্তা দিইনি, ভয় পাইনি। আমার সব সময় একটা দৃঢ়বিশ্বাস ছিল যখন বেঁচে আছি আল্লাহর একটা ইশারা। এ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে আমি পারব। এটাই আমার প্রতিজ্ঞা।’ 

শেখ হাসিনা বলেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধী এবং খুনিরা সব সময় তৎপর আছে, তৎপর থাকবে। তাদের ষড়যন্ত্রও চলতে থাকবে। কিন্তু এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেই আমাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে। ইনশাল্লাহ, জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলব।’

প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘আমাদের দেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে, আর এ দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে পারবে না। কাজেই সবাই আত্মবিশ্বাস নিয়ে চলবেন। কেননা আপনাদের বংশধরেরা যাতে ভালোভাবে বাঁচতে পারে, চলতে পারে, সে ব্যবস্থা আমরা করে দিয়ে গেলাম।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত