পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) নানামুখী উদ্যোগে ১০ বছর পর চাঙ্গাভাব দেখা দেয় দেশের পুঁজিবাজারে। কারসাজিতে জড়িত বিভিন্ন সিন্ডিকেট-নির্ভর বাজারে দ্রুতই বড় ধরনের উত্থান দেখা দেয়। সূচক ও বাজার মূলধনে একের পর এক রেকর্ড তৈরি হয় এ সময়। কিন্তু পুঁজিবাজারে এই চাঙ্গাভাব থাকে মাত্র ১০ মাস। বিভিন্ন ইস্যুতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে মতবিরোধ, বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ায়সহ নানা ইস্যুতে গত অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকেই অস্থিরতা দেখা দেয় বাজারে। যার প্রভাবে গত আড়াই মাসে ডিএসইর প্রধান সূচকটি কমেছে ৯ শতাংশের বেশি। আর এ সময়ে স্টক এক্সচেঞ্জটির বাজার মূলধন কমে গেছে ৪৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
চলতি বছরের শুরু থেকে পুঁজিবাজারে যে উল্লম্ফন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তাতে এখন ভাটার টান লেগেছে। গত আড়াই মাসেরও বেশি সময় ধরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে করে এখন নিয়মিত দরপতন দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের ১০ অক্টোবর সূচকের যে সর্বোচ্চ অবস্থান তৈরি হয়েছিল, তা থেকে এখন ৯ শতাংশের বেশি কমে গেছে। প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার দৈনিক লেনদেন নেমে এসেছে ৮০০ কোটি টাকারও নিচে। বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও এসইসির মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তি না হলে সামনের দিনে সূচকের আরও বড় পতন অপেক্ষা করছে পুঁজিবাজারে।
২০২০ সালের এপ্রিলে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বে কমিশন পুনর্গঠনের পর তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিত ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণে বাধ্যবাধকতা আরোপ, দুর্বল কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠন, মার্জিন ঋণের হার বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন উদ্যোগে পুঁজিবাজারে চাঙ্গাভাব দেখা দেয়। সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন কোম্পানি বেক্সিমকো লিমিটেড, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসসহ ৪৫ কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার কেনার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় এবং বেক্সিমকোসহ অন্তত ২০ কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকরা শেয়ার কেনা শুরু করেন। এটিই পুঁজিবাজারকে ঊর্ধ্বগতির ধারায় ফিরিয়ে আনে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ছিল ৫৪০২ পয়েন্টে। এরপর টানা ঊর্ধ্বগতি শুরু হলে চলতি বছরের ১০ অক্টোবর সূচকটি ৭৩৬৭ পয়েন্টে উন্নীত হয়, যা সূচকটির সর্বকালের সেরা রেকর্ড। মাত্র ১০ মাসেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক বাড়ে ৩৬ শতাংশের বেশি। সূচকের এই রেকর্ডের দিনে ডিএসইর বাজার মূলধন বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৮৪ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকায়, যা বছরের শুরুতে ছিল ৪ লাখ ৪৮ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। উল্লিখিত সময়ে বাজার মূলধন বাড়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তবে গত আড়াই মাসের অস্থিরতায় উৎপাদনমুখী বিভিন্ন খাতের শেয়ারের দর কমায় গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর বাজার মূলধন নেমে এসেছে ৫ লাখ ৩৯ হাজার ২৫৮ কোটি টাকায়। এ হিসাবে গত আড়াই মাসে ডিএসই বাজার মূলধন হারিয়েছে ৪৫ হাজার ১১১ কোটি টাকা বা প্রায় ৮ শতাংশ।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যেসব সিন্ডিকেটের ওপর ভর করে পুঁজিবাজারে টানা উত্থান দেখা দিয়েছিল, বর্তমানে তারা প্রায় সবাই নিষ্ক্রিয় বা অংশগ্রহণ কমিয়ে দিয়েছেন। কারণ হিসেবে তারা জানিয়েছেন, এসব সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা প্রায় সবাই বিভিন্ন শেয়ারে বিনিয়োগ করে আটকে গেছেন। সর্বশেষ ওয়ান ব্যাংকের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে আটকে গেছে কারসাজিকারকদের নেতৃত্বে থাকা সিন্ডিকেটটি। বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বিশেষ করে ব্যাংকও অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে। ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারীরা সুযোগ বুঝে শেয়ার বিক্রি করে আগেই সাইডলাইনে ফিরে গেছেন। বড় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে স্টক এক্সচেঞ্জের দৈনিক লেনদেনেও।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি বছরের শুরুতে বাজারের চাঙ্গাভাবে ডিএসইর গড় লেনদেন প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়। চলতি বছরের মে’র শেষ সময় থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে অধিকাংশ দিনই ডিএসইর লেনদেন দুই হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে দেখা গেছে। তবে এ চিত্র গত দুই মাসে পাল্টে গিয়ে পুরনো ধারায় ফিরে আসছে। গত দুই মাস ধরে লেনদেন ধারাবাহিকভাবে কমে হাজার কোটি টাকারও নিচে নেমে এসেছে। ডিএসইতে গত সপ্তাহে গড় লেনদেন হয়েছে ৭৬২ কোটি টাকা, যেখানে আগের সপ্তাহের গড় লেনদেন ছিল ৯৩৩ কোটি টাকা।
এদিকে আগের সপ্তাহের ধারাবাহিকতায় গত সপ্তাহেও ডিএসইতে সূচকের বড় পতন দেখা গেছে। লেনদেন হওয়া ৭৭ শতাংশ সিকিউরিটিজের দরহ্রাসে স্টক এক্সচেঞ্জটির প্রধান সূচকটি ১৬৫ পয়েন্ট কমে ৬৭০২ পয়েন্টে নেমেছে। আগের সপ্তাহেও সূচকটি ১১৬ পয়েন্ট হারিয়েছিল।
