সাধারণ নারী কোটায় মেধা তালিকায় প্রথম হয়েও নিজেদের জমি না থাকায় পুলিশে চাকরি পাচ্ছিলেন না খুলনার মিম আক্তার। তবে সব অনিশ্চয়তা কাটিয়ে অবশেষে পুলিশ কনস্টেবল পদে প্রশিক্ষণের জন্য ডাকা হয়েছে তাকে। গত শুক্রবার সন্ধ্যার পর খুলনা টেক্সটাইল মিল পুলিশ ফাঁড়ি থেকে উপপরিদর্শক (এসআই) মিকাইল প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের নোটিসপত্রটি মিমের হাতে তুলে দেন।
এর আগে গত ১১ ডিসেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে খুলনা পুলিশ সুপার কার্যালয় থেকে মিমকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, পুলিশ ভেরিফিকেশনে স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় মেধা তালিকায় প্রথম হলেও তাকে চাকরি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এমন খবর শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল মিম ও তার পরিবারের সদস্যরা। এ ঘটনা নিয়ে ওইদিনই বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন মিম আক্তার। তাকে নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করে পুলিশ বিভাগ। পাশে দাঁড়ান খুলনার জেলা প্রশাসকও।
প্রশিক্ষণের জন্য মিমকে দেওয়া নোটিসে দেখা যায়, তাকে আগামী ২৯ ডিসেম্বর সকাল ৮টায় খুলনার পুরাতন পুলিশ লাইনসের রিজার্ভ অফিস এবং পরদিন ৩০ ডিসেম্বর রংপুর পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।
মিম আক্তার খুলনার সোনাডাঙ্গা থানার ৩ নম্বর আবাসিক এলাকার ১ নম্বর রোডে ডাক্তার বাবর আলীর বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে ভাড়া থাকেন। ১৯৮৮ সাল থেকে ওই সড়কটির আশপাশে বিভিন্ন জায়গায় ভাড়াটিয়া হিসেবে পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছেন মিমের বাবা মো. রবিউল ইসলাম। খুলনার বয়রা ক্রস রোডে ছোট্ট একটি দোকান ভাড়ায় নিয়ে লেপতোশকের ব্যবসা করেন তিনি। দোকানটির নাম ‘বেডিং হাউজ’।
অনিশ্চয়তা কাটিয়ে মেয়ের পুলিশে চাকরির পথ খোলায় খুশি মিমের বাবা রবিউল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে খুলনাতে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করছি। মিমের জন্মও খুলনাতে। জন্ম সনদে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নাম। এখানে আমাদের কোনো জমি নেই। স্থায়ী জমি না থাকায় মিমের চাকরিটা হচ্ছিল না। তবে সাংবাদিক ভাইদের সহযোগিতায় সবার মুখে মুখে আলোচনা হওয়ার পর চাকরিটা পেয়েছে মিম।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুক্রবার সন্ধ্যার পর টেক্সটাইল মিল পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মিকাইল আমাকে ও মিমকে ডেকে একটি নোটিস দিয়েছেন। নোটিসে মিমকে পুলিশ ট্রেনিংয়ের জন্য ডাকা হয়েছে। জেলা প্রশাসক স্যার ঘর দেবেন বলে জানিয়েছেন। আমি খুব গরিব মানুষ। যারা সহযোগিতা করেছেন সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’
প্রশিক্ষণের জন্য নোটিস পেয়ে বাবার মতো আনন্দে আপ্লুত মিম আক্তারও। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চাকরি ফিরে পেয়ে আমার ভালো লাগছে। আমি বুঝেছি গরিবের কষ্টটা কেমন। পুলিশের দায়িত্ব পালনকালে যদি কখনো অসহায় মানুষ সামনে আসে, তবে তার প্রতি আমার সহমর্মিতা অবশ্যই থাকবে। তাদের পাশে দাঁড়াব। যারা আমার বিপদের দিনে পাশে দাঁড়িয়েছেন তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
প্রশিক্ষণের জন্য মিমকে ডাকা প্রসঙ্গে খুলনা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানভীর আহম্মেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল পদে সাধারণ নারী কোটায় মেধা তালিকায় প্রথম হন মিম আক্তার। তবে পুলিশ ভেরিফিকেশনে স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। আমরা ঘটনাটি পুলিশ হেড কোয়ার্টারকে জানাই। পুলিশ হেড কোয়ার্টারের নির্দেশনায় মিমের আবেদন আমরা গ্রহণ করেছি। ট্রেনিংয়ের জন্য মিমকে ডাকা হয়েছে। ট্রেনিং শেষে মিম চূড়ান্ত নিয়োগপত্র পাবেন।’
স্থায়ী ঠিকানার যে সমস্যা ছিল সেটার সমাধান কীভাবে হলো এমন প্রশ্নের উত্তরে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে জানতে হবে। আমরা শুধু নির্দেশনা পালন করেছি।’
উল্লেখ্য, মিমের বাবা রবিউল ইসলামের পৈতৃক বাড়ি বাগেরহাটের চিতলমারী থানার বড়বাড়িয়া গ্রামে। তার বাবা আব্দুল লতিফ শেখ জীবিত। ভিটেবাড়ির জমিটুকু মিমের দাদা আব্দুল লতিফের নামে রয়েছে। অভাব-অনটনে পড়ে জীবিকার সন্ধানে পরিবার নিয়ে ৩২ বছর আগে খুলনা শহরে এসে আশ্রয় নেন মিমের বাবা আব্দুল লতিফ।
