‘মাইন্ড কন্ট্রোল ড্রাগ’ অপরাধীদের হাতে

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২১, ০১:১৬ এএম

রাজধানীর সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের সামনে দাঁড়িয়ে শামছুল আলম। তিন নারী তাবিজ-কবজের মাধ্যমে তার সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে আলাপ জুড়েন। এক পর্যায়ে এক টুকরো সাদা কাগজে আগুন দিয়ে শামছুল আলমের মুখের সামনে ধরেন। মুহূর্তে বিভ্রান্ত হন তিনি। কথামতো কাছে থাকা দুই হাজার টাকা তুলে দেন ওই নারীদের হাতে। কিছু সময় পরে সংবিৎ ফিরে তিনি আর নারীদের দেখা পাননি। পরে স্থানীয় দোকানি ও সাংবাদিকদের কাছে বিষয়টি জানান শামছুল আলম।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরের এ ঘটনা সম্পর্কে সেগুনবাগিচার ডাব বিক্রেতা শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোট-স্যুট পরা লোকের সঙ্গে তিন নারীকে কথা বলতে দেখলাম। তাদের হাতে সাদা কাগজ ছিল। পরে ওই লোক এসে বলছেন, নারীরা নাকি তার টাকা-পয়সা সব লুটে নিয়ে গেছে।’

একই ধরনের অভিযোগ করেন রাজধানীর তেজগাঁওয়ের মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট হাসান। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘দোকানে এসে এক ব্যক্তি ২৫ হাজার টাকা বিকাশ করার জন্য তাড়াহুড়ো করছিলেন। তিনি ২৫ হাজার দিলে আমি গুনে ক্যাশে রেখে দেই। পাঠাতে যাব, সেই মুহূর্তে তিনি ‘উপায়’ আছে কি না জানতে চান। না সূচক জবাব দিলে তিনি রকেটে পাঠাতে বলেন। এরপর আমার হাত থেকে মোবাইল নিয়ে রকেট নম্বর টাইপ করে দেন। আমি টাকা পাঠিয়ে দেই।’ তিনি বলেন, ‘৩-৪ মিনিট পর ক্যাশ খুলে দেখি টাকা নেই। পরে দোকানের সিসিটিভির ফুটেজে দেখলাম, আমি নিজেই তার হাতে টাকাটা দিয়েছি। উপায় নেই বলার সময়ই তিনি টাকা নিয়ে নেন। এরপর আমাকে বশ করে রকেট নম্বরেও টাকা নেন।’ এ ঘটনায় গত ২ নভেম্বর হাসান তেজগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

এ ছাড়া সম্প্রতি উত্তরায় বেসরকারি চাকরিজীবী এক নারীর মুখের সামনে সাদা কাগজ ধরে দুর্বৃত্তরা সবকিছু নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ করেন তার স্বামী। তিন ভুক্তভোগীর ভাষ্য, কিছু সময়ের জন্য তারা চিন্তা করার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। সামনে থাকা লোকজন যা বলেছেন, তাই তারা করতে বাধ্য হয়েছেন।

রাসায়নিক বা ড্রাগের সহায়তায় মনের সাময়িক নিয়ন্ত্রণ অন্য কেউ নিতে পারেন কি না এসব বিষয়ে ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের একাধিক বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তারা জানান, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কিছু ড্রাগের সহায়তায় অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করে অপরাধের নজির রয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক ধরনের রাসায়নিক কিংবা মাদক রয়েছে, যেগুলোর সহায়তায় অন্যের মন নিয়ন্ত্রণ করা যায়। যেমন ম্যাজিক মাশরুম, বিওপি, এলএসডি কিংবা স্কোপোল্যামাইন। বিশেষ করে টার্গেট লোকজনকে স্কোপোল্যামাইন রাসায়নিকের কিছু মাত্রা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে প্রবেশ করানো সম্ভব হলে কিছুক্ষণের জন্য তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। এটি ‘ডেভিলস ব্রেথ’ বা ‘শয়তানের শ্বাস’ নামে পরিচিত। বাইরের দেশে অপরাধের জন্য এটি ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। তবে দেশে এ রাসায়নিক ব্যবহার হচ্ছে কি না তা জানা নেই বলে জানান তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেশকিছু ড্রাগ রয়েছে, যেগুলোর সহায়তায় মানুষের মন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এগুলোর সহায়তায় কোনো অপরাধ কর্মকাণ্ড হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের এখনই সতর্ক হওয়া ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের একাধিক শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে জানান, চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যবহৃত কিছু ওষুধ অসাধু ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলো অপরাধ কর্মকাণ্ডের উপযোগী করে হয়তো কোনো চক্রের হাতে দিয়ে থাকতে পারে। মূলত কোনো ড্রাগের ভালো-মন্দ নির্ভর করে তার মাত্রার ওপর। এর মধ্যে স্কোপোল্যামাইনের অপব্যবহার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেড়ে গেছে।

তারা আরও জানান, দেশে পরিচিত ধুতরা ফুলে স্কোপোল্যামাইনের উপাদান বিদ্যমান। এ ফুলকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় পাউডার বানিয়ে অন্যের সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমকে অকার্যকর করা সম্ভব। ধুতরা ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম ডাটুরা স্ট্র্যামোনিয়াম। যেটিকে ডেভিলস উইট বা শয়তানের বৃক্ষও বলা হয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ জেলার উপপরিচালক খুরশিদ আলম দেশ রূপান্তরকে জানান, তাদের তালিকাভুক্ত ক, খ ও গ ক্যাটাগরিতে ৬ শতাধিক মাদকদ্রব্যের নাম থাকলেও স্কোপোল্যামাইন বলে কিছু নেই। তবে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভবথ এমন মাদকের সহায়তায় নানা অপরাধের তথ্য তারাও বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারছেন। স্কোপোল্যামাইন নামে কোনো মাদক না থাকা ও সরাসরি ভুক্তভোগী না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হয়নি বলে জানান তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছু মাদক ব্যবহারে শর্টটাইম মেমোরি লস হয়। নিজের ওপর ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তখন সহজেই অন্য কেউ তাকে পরিচালিত করতে পারেন। মাদকের এ প্রভাবকেই অপরাধীরা ব্যবহার করে থাকতে পারেন।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছু ড্রাগ নাকের কাছে নিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে প্রবেশ করানো গেলে ওই ব্যক্তিকে সম্মোহিত করে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এটি বৈজ্ঞানিকভাবে যেমন সত্য, তেমনি এ ধরনের অনেক মাদক ইউরোপ-আমেরিকায় ব্যবহার হচ্ছে। শঙ্কার বিষয়, এসব মাদক এখন কুরিয়ারের মাধ্যমে আমাদের দেশেও প্রবেশ করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ম্যাজিক মাশরুম ও বিওপি নামের মাদক আমাদের দেশ ছাড়াও প্রতিবেশী ভারতে জব্দ হয়েছে। এসব মাদকের সহায়তায় খুব সহজেই অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বিদেশ থেকে লেখাপড়া করে আসা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের হাত ধরেই মূলত এ ধরনের ভয়ঙ্কর মাদক দেশে ঢুকছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগে ‘ম্যাজিক মাশরুম’ নামের একটি মাদক জব্দ করে। এটি গ্রহণে ‘হ্যালুসিনেশনের’ মাধ্যমে সাময়িক সময়ের জন্য ওই ব্যক্তিকে কল্পরাজ্যে নিয়ে যায় বলে তখন তারা জানিয়েছিলেন।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) মো. কামরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের মাদক ব্যবহার করে কোনো অপরাধের তথ্য আমাদের নজরে আসেনি। কোনো ভুক্তভোগীর তথ্যও জানতে পারিনি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত