১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে লেখা হয়েছিল বিদ্রোহী কবিতা। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতা আন্দোলনের যে ভাবনা-প্লাবন সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে প্রবলভাবে ইন্ধন জোগায় কাজী নজরুল ইসলামের এ কবিতা। বাংলা কাঁপানো এ কবিতা রচনার ১০০ বছর পূর্ণ হলো। লিখেছেন বিপুল জামান
বিদ্রোহীর প্রেক্ষাপট
১৯১৭ সালের শেষদিকে সেনাবাহিনীতে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক হিসেবে যোগ দেন কাজী নজরুল ইসলাম। তার পোস্টিং হয় করাচি সেনানিবাসে। প্রথাগত বিদ্যাশিক্ষায় স্থিরতা দেখা না গেলেও জ্ঞানার্জনে নজরুলের আগ্রহ ছিল সীমাহীন। তাই এমন বৈরী পরিবেশেও তিনি রেজিমেন্টের পাঞ্জাবি মৌলবির কাছ থেকে ফার্সি ভাষা রপ্ত করেন। এই সেনানিবাসেই তার কাব্যচর্চার সূচনা ঘটে। সৈনিক অবস্থায় তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেখেছেন যুদ্ধের ভয়াবহতা। গভীরভাবে উপলব্ধি করেন ঔপনিবেশিক শোষণ ষড়যন্ত্র। ১৯২০ সালে বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়া হলে নজরুল কলকাতায় ফিরে আসেন। বাস করতে শুরু করেন ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে। বেছে নেন সাহিত্যচর্চা, সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক আন্দোলনের ত্রিমুখী জীবন।
নজরুল তখন বাস করতেন কলকাতার ৩২ কলেজ স্ট্রিটে সাহিত্য সমিতির অফিসে। মুজফ্্ফর আহমেদ ছিলেন সমিতির সহকারী সম্পাদক। পত্রিকার কাজ পরিচালনার সময় চিঠিপত্রের মাধ্যমে কবি নজরুল ইসলামের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে গভীর বন্ধুত্ব। কাজী নজরুলের সঙ্গে ঠিক করেন একটি ভিন্নধর্মী বাংলা দৈনিক বের করার। এ বিষয়ে তারা কথা বলেন ফজলুল হকের সঙ্গে। হক সাহেব তার নিজের টাকায় পত্রিকা বের করার প্রস্তাব করেন। ১৯২০ সালের ১২ জুলাই মুজাফ্ফর আহমদ ও কাজী নজরুল ইসলামের যুগ্ম সম্পাদনায় ‘নবযুগ’ নামের সান্ধ্য পত্রিকা বের হয়। কাজের সুবিধার্থে তারা একসঙ্গেই বসবাস করতেন।
১৯২১ সালের এপ্রিল-জুন মাসের দিকে নজরুল পরিচিত হন বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে প্রকাশক আলী আকবর খানের সঙ্গে। স্নেহবশে আলী আকবর খান কবির বিয়ে ঠিক করেন ভগ্নি নার্গিস খানমের সঙ্গে। বিয়ের আকদ সম্পন্ন হওয়ার পরে কাবিনে ঘরজামাই থাকার শর্ত নিয়ে বিরোধ বাধে। নজরুল ঘরজামাই থাকতে অস্বীকার করেন এবং বাসর সম্পন্ন হওয়ার আগেই নার্গিসকে রেখে কুমিল্লা শহরে বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে চলে যান। এ সময় নজরুল অসুস্থও হয়ে পড়েন। বিরজা দেবী যথাসাধ্য তার সেবা করেন। সুস্থ হয়ে নজরুল ফিরে আসেন কলকাতায়। কলকাতায় তখন নজরুলের ঠিকানা ৩ /৪-সি তালতলা লেন। দোতলা বাড়ির নিচের তলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ঘরটিতে থাকেন মুজফ্্ফর আহমেদ আর নজরুল। তালতলার বাড়িটি ছিল ভাড়ার বাড়ি। প্রথমে ভাড়া নিয়েছিলেন ত্রিপুরা জেলার নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর দৌহিত্ররা। ওপরে-নিচে মোট চারটি ঘরের দুটি ঘর থেকে একটি ঘরে থাকতে হয়েছিল তাদের। ১৯২১ সালের দিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বের অভিঘাতে বিশ্বব্যাপী অবক্ষয়, নৈরাজ্য, ব্যক্তির একাকিত্ব এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা তাকে তীব্রভাবে আলোড়িত করে। আধুনিকতাবাদীদের মধ্যে তখন সামষ্টিকের পরিবর্তে ব্যক্তি পর্যায়ে আত্মউন্মোচনের প্রবণতা প্রবল হয়ে ওঠে। ঠিক ওই সময়েই ধূমকেতুর মতো কাজী নজরুল ইসলামের অতুলনীয় প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। প্রস্তুত ছিল সময়ও। তিনি মিটিয়েছেন সে সময়ের সবচেয়ে কঠিন দাবি। উত্তাল সেই সময়ে, ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে নজরুল রচনা করেন তার কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’।
ব্যক্তিগত জীবনের প্রণয় বিয়োগ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর অভিজ্ঞতা, জাতীয়তাবাদী ভাবের উদয় এসবের মিশ্রণে অনুভূতির উর্বরক্ষেত্রে জন্ম হয় বিদ্রোহী কবিতা।
রচনাকাল
বিদ্রোহী কবিতা কত তারিখে রচিত হয় তার সঠিক দিন জানা যায় না। নজরুল তার অধিকাংশ রচনার সঙ্গে সময়কাল যুক্ত করতেন না। তবে তার তৎকালীন সঙ্গী মুজফ্্ফর আহমেদের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায় কবিতাটি ১৯২১ সালের বড়দিনের অবকাশকালীন অর্থাৎ ২৫ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের কোনো এক রাতে নজরুল লিখেছিলেন।
‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি লেখা হয়েছিল গভীর রাতে, অন্ধকারে। শ্রমক্লান্ত মুজফ্্ফর আহমেদ রাত ১০টার পর ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। সকালে ঘুম থেকে উঠলে কবি তাকে শোনান কবিতাটি। মুজফ্্ফর আহমেদ ও নজরুল দুজনের কারও ছিল না ফাউন্টেন পেন। দোয়াত কলমে লেখা নকল করা হতো বটে, কিন্তু তা দিয়ে তারা লিখতে চাইতেন না। লেখার স্বতঃস্ফূর্ততা নষ্ট হতো বারবার কলম ডুবিয়ে কালি নিতে গিয়ে। সে রাতে নজরুল প্রাণের আবেগে কবিতাটি একটানে লেখেন পেন্সিল ব্যবহার করে।
‘কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা’ বইয়ে মুজফ্্ফর আহমেদ লিখেছেন, ‘আসলে বিদ্রোহী কবিতা রচিত হয়েছিল ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে বড়দিনের ছুটিতে।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘তখন নজরুল ও আমি নিচের তলার পূর্ব দিকের অর্থাৎ বাড়ির নিচেকার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ঘরটি নিয়ে থাকি। কবিতাটি নজরুল লিখেছিলেন রাতে। রাতের কোন সময় তা জানি না। রাত ১০টার পরে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে এসে আমি বসেছি এমন সময় নজরুল বলল, সে একটা কবিতা লিখেছে। পুরো কবিতাটিই সে আমাকে পড়ে শোনাল। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আমিই প্রথম শ্রোতা। আমার মনে হয়, নজরুল শেষ রাতে কবিতাটি লিখেছিল। তা না হলে এত সকালে সে আমাকে কবিতা পড়ে শোনাতে পারত না।’
মুজফ্্ফর আহমেদ কাউকে তার সম্মুখে প্রশংসা করতেন না। অসাধারণ কবিতাটি শোনার পরেও তিনি নজরুলের কাছে কোনো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেননি। তবে অন্যদের কাছে পরবর্তী সময়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। তার মনে হয়েছে নজরুল হয়তো এ কারণে মনঃক্ষুন্ন হয়েছেন। স্মৃতিকথায় মুজফ্্ফর আহমেদ এ কথা উল্লেখ করেছেন।
প্রকাশ
ওই বাড়িতে বিভিন্ন সময় আড্ডা দিতে আসতেন শিল্পী-সাহিত্যিক-সম্পাদকসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। সেদিন ওই বাড়িতে এসেছিলেন ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকার আফজালুল হক। কবিতাটি পড়ে তাকে শোনান নজরুল। শোনার পর ভীষণ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন আফজালুল হক। তিনি কবিতাটি মোসলেম ভারতে প্রকাশের জন্য কপি করে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর আসেন বিজলী সম্পাদক অবিনাশচন্দ্র। অসাধারণ এই কবিতাটি লেখার পরে নজরুল ছিলেন দারুণ উজ্জীবিত। তাকেও কবিতাটি শোনান নজরুল। তিনিও কবিতাটি বিজলী-তে প্রকাশের জন্য নজরুলের কাছে চান। মোসলেম ভারতের জন্য কবিতাটি দিয়েছেন জানালে অবিনাশচন্দ্র বলেন, মোসলেম ভারত মাসিক পত্রিকা, উপরন্তু অনিয়মিত। বিজলী সাপ্তাহিক। প্রতি সপ্তাহে প্রকাশ হচ্ছে। এমন অগ্নিঝরা কবিতা প্রকাশে বিলম্ব হওয়া উচিত নয় বলে তিনি যুক্তি দেন। কবিও তার যুক্তি তাৎক্ষণিক মেনে নেন। অবিনাশচন্দ্রও কবিতাটির একটি কপি করেন। অবিনাশ চন্দ্রের এই প্রবল আগ্রহের কারণেই এর সপ্তাহখানেক পরে ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি সাপ্তাহিক বিজলী’তে বিদ্রোহী কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয়। তখন কবিতাটি ছিল ১৩৯ পঙ্ক্তির।
প্রকাশের দিন ছিল বৃষ্টিমুখর। কিন্তু কবিতাটির কারণে পত্রিকার চাহিদা এত হয়েছিল যে, বিজলী’র দুটি মুদ্রণ বের করতে হয়েছিল। পরে মোসলেম ভারতে ফাল্গুন মাসে আবার ছাপা হয়। কবিতাটি প্রকাশের পর থেকেই সাহিত্যের পাঠক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, আবৃত্তিশিল্পী, রাজনৈতিক কর্মী, সচেতন মানুষের কাছে প্রবলভাবে আদৃত হয়। মাসিক প্রবাসী, মাসিক সাধনা, সান্ধ্য পত্রিকা নবযুগ, নজরুল সম্পাদিত ধূমকেতু ইত্যাদি পত্রিকায়ও ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হয়েছিল। কবিতাটির প্রবল চাহিদা লক্ষ করে চলমান বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক পত্রিকা কবিতাটি ছাপতে থাকে। কবিতাটির প্রতি সবার এমন আগ্রহ দেখে কবিও তাতে আপত্তি করেননি।
আলোচনা-সমালোচনা
সাধারণ মানুষের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পী-সাহিত্যিক-সম্পাদক-সমঝদারদের কাছেও বিদ্রোহী কবিতা দারুণভাবে সমাদৃত হয়। কবিতাটি প্রকাশের দশ দিন পর ১৭ জানুয়ারি ১৯২২ সালে নজরুল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে যান। তাকে কবিতাটি পড়ে শোনান। বিজলী সম্পাদক অবিনাশচন্দ্র নজরুলের মুখে শুনে লিখেছেন, বিদ্রোহী ছাপা হওয়ার পরে নজরুল এটি রবীন্দ্রনাথকে পড়ে শোনানোর পর তিনি সানন্দে নজরুলকে বুকে চেপে ধরে আশীর্বাদ করেছিলেন।
বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, ‘বিদ্রোহী’ পড়লুম ছাপার অক্ষরে মাসিক পত্রে- মনে হলো, এমন কখনো পড়িনি। অসহযোগের অগ্নিপরীক্ষার পরে সমস্ত মনপ্রাণ যা কামনা করেছিল, এ যেন তা-ই, দেশব্যাপী উদ্দীপনার এ-ই যেন বাণী। (নজরুল ইসলাম, কালের পুতুল, বুদ্ধদেব বসু)।
রবীন্দ্র বলয়ের বাইরে আসার ক্ষেত্রে এই কবিতার প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, বাংলা সাহিত্যে বিশ শতকে রবীন্দ্র প্রভাব এত সর্বগ্রাসী হয়েছিল যে, মনে হচ্ছিল এর বাইরে যাওয়া যাবে না, যতক্ষণ না বিদ্রোহী কবিতার নিশান উড়িয়ে হই হই করে নজরুল এসে হাজির হলেন।’ (রবীন্দ্রনাথ ও উত্তর সাধক : সাহিত্যচর্চা, বুদ্ধদেব বসু)
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত বলেছিলেন, এ কে নতুন কবি? নির্জীব দেশে এ কার বীর্যবাণী? শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, সমগ্র দেশ নাড়া দিয়ে জেগে উঠল। এমনটি কোনোদিন শুনিনি, ভাবতেও পারিনি। যেন সমস্ত অনুপাতের বাইরে, যেন সমস্ত অঙ্ক পাতেরও অতিরিক্ত।...গদগদ বিহ্বলের দেশে এ কে এলো প্রচণ্ড বজ্রনাদ হয়ে? আলস্যে আচ্ছন্ন দেশ আরামের বিছানা ছেড়ে হঠাৎ উদ্দ- মেরুদণ্ডে উঠে দাঁড়াল।
কাজী আবদুল ওদুদ বলেন, এর মর্মকথা হচ্ছে এক অপূর্ব উন্মাদনা এক অভূতপূর্ব আত্মবোধ; সেই আত্মবোধের প্রচণ্ডতায় কবি উচ্চকিত, প্রায় দিশেহারা।
এমন দিশেহারা শুধু সে সময়ের সাহিত্যিক-বোদ্ধা পাঠকই হননি, বিদ্রোহী কবিতা রস জুগিয়ে যাচ্ছে আজও, একশ বছর ধরে।
ভাষাসংগ্রামী ও গবেষক আহমদ রফিক বলেন, বিষয়ে ও প্রকরণে সামাজিক-রাজনৈতিক পটভূমিতে নজরুলের বিদ্রোহী প্রকাশ বাংলা সাহিত্যে তাই এতই পরিস্ফুট এবং এমন ধ্বনি-গম্ভীর যে অসতর্ক পাঠকেরও চিত্ত স্পর্শ করে, প্রাণে ঝংকার তোলে। বিদ্রোহের এই দৃশ্যময়, ধ্বনিময় ও আবেগময় প্রকাশের কারণেই বাংলা সাহিত্যে একমাত্র নজরুলই ‘বিদ্রোহী কবি’ রূপে চিহ্নিত; এবং বাংলা সাহিত্যের মহীরুহ পেরিয়েই বিদ্রোহের মর্যাদায় অভিষিক্ত। এদিক থেকে নজরুল সর্বতোমুখী বিচারেও অদ্বিতীয়, অতুলনীয়। (নজরুলের বিদ্রোহ; বিদ্রোহের স্বরূপ-অন্বেষা, আহমদ রফিক)
নজরুল গবেষক জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সম্পর্কে বলেন, ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব, ভারতের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, তুরস্কের কামাল পাশার আবির্ভাব, বাংলা সাহিত্যের এসব পটভূমি নজরুলকে বিদ্রোহীর মতো কবিতা লেখার জন্য প্রভাবিত করেছে।...নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা বদলে দেয় বাংলা সাহিত্যের ধারা। বাংলা সাহিত্যে ‘আধুনিক কবিতা’ বলতে আমরা যা বুঝি, তার পেছনে রয়েছে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা।...গত একশ বছরে বহু আন্দোলন-সংগ্রামে কবিতাটি বাঙালিকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। কেবল ‘বিদ্রোহী’র জন্য হলেও নজরুল যুগ যুগ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’
তবে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপও কম হয়নি। সে সময়ে ‘শনিবারের চিঠি’ সাপ্তাহিক পত্রিকায় নজরুলকে ব্যঙ্গ করে বেশ কয়েকজনের বিদ্রোহী কবিতার প্যারোডি লেখা ছাপা হয়েছিল। সজনীকান্ত দাস বিদ্রোহী কবিতাকে প্যারোডি করে লিখেছিলেন, ‘আমি ব্যাঙ/লম্বা আমার ঠ্যাং/আমি ব্যাঙ/আমি সাপ, আমি ব্যাঙেরে গিলিয়া খাই/আমি বুক দিয়ে হাঁটি ইঁদুর ছুঁচোর গর্তে ঢুকিয়া যাই।’
কবি গোলাম মোস্তফাও কাব্যে সমালোচনা করতে ছাড়েননি। তার ‘নিয়ন্ত্রিত’ শিরোনামের কবিতায় কালজয়ী বিদ্রোহী কবিতাকে আঘাত হানার চেষ্টা করেছেন, “ওগো ‘বিদ্রোহী’ বীর!/সংযত কর, সংহত কর উন্নত তব শির/তুই যদি ভাই বলিস চেঁচিয়ে-উন্নত মম শির,/আমি বিদ্রোহী বীর,/সে যে শুধুই প্রলাপ, শুধুই খেয়াল, নাই নাই/তার কোন গুণ,/শুনি স্তম্ভিত হবে ‘নমরুদ’ আর ‘ফেরাউন’!”
নিষিদ্ধ না হওয়ার কারণ
কবিতাটি বাংলায় নবজাগরণের সূচনা করে। সুস্পষ্ট রাজদ্রোহের ঘোষণা থাকলে সে সময়ের ইংরেজ সরকার কবিতাটি নিষিদ্ধ করতে পারেনি নানা কারণে। এ সম্পর্কে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত উল্লেখ করেছেন, এ কবিতায় হিন্দু-মুসলমান দু’ধর্মের এত পুরাণ প্রসঙ্গ ঢুকেছে যে ব্রিটিশ সরকার সরাসরি একে রাজদ্রোহ বলে চিহ্নিত করতে পারল না। কখনো ঈশান-বিষানের ওঙ্কার বাজছে, কখনো বা ইস্রাফিলের শিঙ্গা থেকে উঠছে ঝঙ্কার। কখনো বা হাতে নিয়েছে মহাদেবের ডমরু-ত্রিশূল, কখনো বা অর্ফিয়াসের বাঁশি। কখনো বাসুকীর ফণা জাপটে ধরেছে। কখনো বা জিব্রাইলের আগুনের পাখা, কখনো চড়েছে তাজি বোরাক (পক্ষীরাজ ঘোড়া)-কে কখনো বা উচ্চৈঃশ্রবায়। একে রাজদ্রোহ বলতে গেলে ধর্মের উপরে হাত দেওয়া হবে। (জৈষ্ঠ্যের ঝড়)
সরাসরি নিষিদ্ধ করতে না পারলেও প্রকাশিত কপি বাজেয়াপ্ত করা এবং পুড়িয়ে ফেলতে কসুর করত না ইংরেজ সরকার। এর ফলে যেন সম্পাদক-প্রকাশক-পাঠকের জেদ বেড়ে গেল আরও। তারা আরও বেশি বেশি করে বিভিন্ন পত্রিকায় ‘বিদ্রোহী’ ছাপাতে লাগলেন।
শতবর্ষ উদযাপন
বিদ্রোহী কবিতার শতবর্ষ উদযাপনে দেশে-বিদেশে গৃহীত হয়েছে নানা কর্মসূচি।
‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ পূর্তিতে বাংলা একাডেমিতে স্মারক ভাস্কর্যের উদ্বোধন করা হয়েছে। বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে এই স্মারক ভাস্কর্যের শুভ উদ্বোধন করা হয়। এ উপলক্ষে ভারতে এ কবিতা ১০০ ভাষায় অনুবাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারতের নজরুল সেন্টার অব সোশ্যাল অ্যান্ড কালচারাল স্টাডিজের পরিচালক ও ভারতের কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক স্বাতী গুহ জানান, এ বছর কবির লেখা বিদ্রোহী কবিতার ১০০ বছর উদ্যাপিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে কবির ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি ভারতীয় উপমহাদেশের ১০০টি ভাষায় অনুবাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষের সংস্কৃতির মধ্যে আরও বেশি ছড়িয়ে যাবে।
বিদ্রোহী কবিতার শতবর্ষ উদযাপন করতে নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে এ কবিতার ওপর গত ১০০ বছরে প্রকাশিত প্রবন্ধ নিয়ে ‘বিদ্রোহী’ নামে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া বাংলা একাডেমি থেকেও একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
