বগুড়া থেকে ঢাকার মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) এসেছেন একজন কলেজশিক্ষক। তার দাবি, এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) পেতে তিনি কলেজ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে ১০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন পরেও তার এমপিও হয়নি। তিনি মাউশি কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ জানাতে এসেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তাকে লিখিত অভিযোগ দিতে বললেও তিনি দেননি। কারণ লিখিত অভিযোগ করলে তিনি এলাকায় থাকতে পারবেন না বলে জানান।
নড়াইলের একজন স্কুলশিক্ষক নিজের এমপিও করাতে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও মাউশির খুলনা অঞ্চলের এক কর্মকর্তাকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন। কিন্তু নানা অজুহাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাকে দিনের পর দিন ঘোরাচ্ছেন।
এ দুজনের মতো সারা দেশে শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মাউশির মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি শিকার হয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন। প্রায় প্রতিদিন অনেক ভুক্তভোগী মাউশির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মৌখিক অভিযোগ জানাতে আসেন বলে মাউশির একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।
সেবা বিকেন্দ্রীকরণ ও সহজীকরণের কথা বলে ২০১৫ সালে এমপিও ব্যবস্থা মাউশির আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোর হাতে ছেড়ে দেয় সরকার। কিন্তু ছয় বছর পর এসেও দুর্নীতির একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। যেসব কর্মকর্তা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তাদের দিয়েই এসব অভিযোগের তদন্তকাজ করানো হচ্ছে। যে কারণে দুর্নীতি তো কমছেই না বরং সময়, শ্রম ও আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠানের। এর কারণে মাউশির এ সেবা বিকেন্দ্রীকরণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মাউশির কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভুয়া এমপিওভুক্তি, শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির দুর্নীতি, এমনকি মাউশির জেলা, উপজেলা ও আঞ্চলিক কার্যালয়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত দুর্নীতির শত শত লিখিত অভিযোগ জমা পড়ছে মাউশিতে।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধে একাধিক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেছেন, সেবা বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলে মাউশি থেকে এমপিও আঞ্চলিক কার্যালয়ে নেওয়া ছিল মূলত একটি অজুহাত। কারণ এমপিওভুক্তির দায়িত্বে থাকাকালে ব্যাপক দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল মাউশি। এ বদনাম ঘোচাতে সঠিক পরিকল্পনা ছাড়াই আঞ্চলিক পর্যায়ে এমপিওভুক্তির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতিকে ‘ফুটন্ত কড়াই থেকে জ¦লন্ত উনুনে পড়ার’ শামিল বলে মনে করছেন মাউশি কর্মকর্তারা।
যে সময় এমপিওভুক্তির দায়িত্ব মাঠপর্যায়ে পাঠানো হয় সে সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন নজরুল ইসলাম খান। তিনি মাউশির কর্মকর্তাদের অভিযোগের সঙ্গে একমত হননি। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘আমার সময়ে মাউশি থেকে ৩০০-৪০০ লোককে একসঙ্গে এমপিও দেওয়া হয়েছিল। তারা টাকা তোলাও শুরু করেছিল। পরে আমরা দেখি তারা সবাই ভুয়া। এই যে অনিয়ম এটা তো দূর করা দরকার। এজন্য সেবা সহজ ও বিকেন্দ্রীকরণের জন্য অঞ্চলে দেওয়া হয় একটি উন্নত অনলাইন আবেদন ব্যবস্থার মাধ্যমে। এটা যথাযথ কাজ করলে দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু আমার ধারণা এ অনলাইন ব্যবস্থায় খারাপ লোকরা দখলে রেখেছেন। ফলে এটা কাজ করছে না। তাই বলে বিকেন্দ্রীকরণকে দোষারোপ করা যাবে না।’
গত ছয় মাসে দেশ রূপান্তরের হাতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির অভিযোগসংক্রান্ত ৩০টি চিঠি এসেছে। যার প্রায় সবই শিক্ষকদের ভুয়া এমপিওভুক্তির বিষয়ে। এছাড়া রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের বিরুদ্ধে অবাধ দুর্নীতির অভিযোগ। দেখা যাচ্ছে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে আরেক শিক্ষক কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা কমিটি মাউশিতে এসব অভিযোগ পাঠাচ্ছেন। জনবল সংকটের কারণে মাউশির সংশ্লিষ্ট শাখাগুলো এসব যাচাই-বাছাই করতে হিমশিম খাচ্ছে।
সম্প্রতি মাউশির একজন উপপরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, কলাপাতা, কাঁঠালপাতাকেও এমপিও দিচ্ছেন মাউশির আঞ্চলিক কর্মকর্তারা। আর শত শত অভিযোগ আসছে তাদের কাছে। ঢাকা থেকে গিয়ে তো তারা তদন্ত করতে পারেন না। সে দায়িত্ব আঞ্চলিক কার্যালয়ের। দেখা যাচ্ছে যে কর্মকর্তা ঘুষ খেয়ে ভুয়া এমপিও দিয়েছেন তিনিই এ অভিযোগের তদন্ত করছেন। তাহলে দুর্নীতি বন্ধ হবে কী করে?
জানা যায়, মাউশি ছাড়াও গত তিন বছরে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ২৪৪টি দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। এর মধ্যে নানা সময়ে ১৮৪টি অভিযোগ তদন্তে মাউশিকে দায়িত্ব দিয়েছিল সংস্থাটি। পরে তদন্তের অগ্রগতি ও প্রতিবেদন পাঠাতে ৪০টি চিঠি মাউশিকে পাঠায় দুদক। কিন্তু কাজ না হওয়ায় বাধ্য হয়ে গত বুধবার মাউশির মহাপরিচালক (ডিজি) সৈয়দ গোলাম ফারুককে তবল করে দুদক।
ওইদিন সৈয়দ গোলাম ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, ‘নিয়মিত মিটিংয়ের অংশ হিসেবে দুদক থেকে তাকে ডাকা হয়েছিল। এর বেশি কিছু নয়।’
কিন্তু ওইদিনই দুদক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে ভিন্ন কথা। গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সংস্থাটি বলেছে, দুদক থেকে মাউশিকে যেসব তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সেগুলোর সম্পর্কে জানতে চিঠি দিয়েও কাজ হয় না। আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে এসব তদন্ত প্রতিবেদন না পাঠালে মাউশির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী স্বাধীন সংস্থাটি।
নিজ দপ্তরের কর্মকর্তাদের অভিযোগের বিষয়ে মাউশি ডিজি গোলাম ফারুক গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি মনে করি সিস্টেম অনলাইনে হওয়ায় আগের চাইতে দুর্নীতি কমেছে। তবে যেসব অভিযোগ আমরা পাই সেগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ কিন্তু এ প্রতিবেদকের সঙ্গে যেসব ভুক্তভোগীর কথা হয়েছে তারা বলেছেন, একটি ঘটনা তদন্ত ও তার প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে দুই বছরের বেশি সময় লাগে।
মাউশির ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, মূলত তদন্তকারী কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণেই ছোটখাটো এসব দুর্নীতি তদন্তে বছরের বছর সময় লাগছে। কারণ মাঠপর্যায়ের এসব কর্মকর্তার যোগসাজশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি সংঘটিত হচ্ছে।
উদাহরণ দিয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি মেহেরপুরের একটি বিদ্যালয়ে অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও চারজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে এমপিওভুক্তির অভিযোগ পেয়েছেন তারা। অভিযোগে যাদের যোগসাজশের কথা বলা হয়েছে তারা সবাই সরকারের কর্মকর্তা। উপায় নেই বলেই তাদের দিয়েই তদন্ত করা হবে। এ তদন্তের কী ফল হতে পারে সেটা অনুমান করা কঠিন নয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক এমপিওভুক্তি, নিয়োগসহ নানা খাতে যে দুর্নীতি বেড়েছে সেটা উঠে এসেছে গত বছর দেওয়া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে। সংস্থাটি বলছে, শিক্ষক এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মো. আক্তারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘দেশের অন্য কোথাও দুর্নীতি হয় কি না আমার জানা নেই। তবে আমার অঞ্চলে কোনো দুর্নীতি হয় না।’ এমনকি তদন্তকাজে কোনো বিলম্ব হয় না বলেও দাবি করেন এ কর্মকর্তা।
অবশ্য মাউশির এক কর্মকর্তা বলছেন, এমপিওভুক্তির কাজ অঞ্চলে হলেও এ থেকে লাভ হন মাউশির কর্মকর্তাদের অনেকেই। এমপিও যার কাছে, দুর্নীতি তার কাছে এ কথা শিক্ষার সবাই জানে। আগে মাউশিতে এমপিও থাকায় এর দুর্নামের শেষ ছিল না। এখন অঞ্চলে যাওয়ায় তাদের দুর্নাম নেই। অর্থাৎ মাউশি দুর্নীতির দায় নিজে নিতে চায় না। কিন্তু অন্যরা করলে তার ভাগ অনেকেই পায়।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি, সদ্য যোগ দেওয়া সচিব আবু বকর ছিদ্দিকসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি।
