এখনকার সময় চীন ও পশ্চিমের দ্বৈরথ বেশ জমে উঠেছে। বিশেষত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার কিছু পশ্চিমা মিত্ররা সাম্প্রতিক সময়ে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতার বিরুদ্ধে এক জোট হচ্ছে। চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা চরম শত্রুতার পর্যায়ে নিয়ে যান সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ে অস্বস্তি ছিল বিশেষত প্রযুক্তি মেধাস্বত্ব ইস্যুতে। ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা হুয়াহু-এর পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল প্রযুক্তিকে মূলত প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে দিয়েছে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত এখানেই, যেখানে চীন ক্রমবর্ধমানভাবে নিজেদের পশ্চিমা প্রযুক্তির শক্ত প্রতিপক্ষ এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে পশ্চিমকে ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সারা পৃথিবীতে বিশেষত এশিয়া ও আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোতে প্রযুক্তি সহজলভ্যতার ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা অপরিসীম। আশির দশকের শেষ দিকে দেং জিয়াও পিং-এর অর্থনৈতিক পুনর্গঠন চীনের বিশাল জনগোষ্ঠীর দরিদ্রতাই দূর করেনি অধিকন্তু এর দ্বারা উপকৃত হয়েছে তৃতীয় বিশ্বের কোটি কোটি দরিদ্র জনগোষ্ঠী। চীন এখন সারা পৃথিবীর কারখানা এবং তার সস্তা প্রযুক্তি পণ্যের বাজার পশ্চিমসহ সারা বিশ্বে। সম্ভবত এভাবে প্রযুক্তি পণ্যের সহজলভ্যতা তৈরি না হলে আজকের পৃথিবীর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রযুক্তিতে প্রবেশগম্যতা অনেক কমে যেত। আজ যারা ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দারিদ্র্য দূর করতে পেরেছে তা আরও বহু বছর লেগে যেত। অন্যদিকে চীনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ফলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর পক্ষে অর্থনৈতিক সহযোগিতা পাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলো এখন অপেক্ষাকৃত কম শর্তসাপেক্ষে ঋণ গ্রহণ করতে পারছে। এদের অনেকেরই আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের চাপিয়ে দেওয়া ঋণ ও শর্ত মেনে নিতে হচ্ছে না। যেমনটা হয়েছিল ১৯৮০-৯০ সালে দিকে পশ্চিমের সমর্থনপুষ্ট স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট পলিসি বাস্তবায়নের সময়।
অন্যদিকে পশ্চিমাদের সহযোগিতার একটি বড় অনুষঙ্গ হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে সেবাসমূহের বেসরকারিকরণ ও বাজারব্যবস্থা উন্মুক্ত করা। এর সঙ্গে যুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থা, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক চর্চার শক্তিশালীকরণ ইত্যাদি।
উল্লেখ্য, এগুলো সবাই পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে, ঔপনিবেশিক কাল থেকে পশ্চিমা রীতিনীতি ও ব্যবস্থার যে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়েছে তার সর্বজনীন রূপ দেওয়ার চেষ্টা বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার হাত ধরে। এই প্রক্রিয়ায় পশ্চিম ও পশ্চিমের সমর্থক গোষ্ঠী নিজেদের উচ্চ মানদণ্ডের ধারক হিসেবে চিহ্নিত করে এবং সমানতালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অন্যান্য নিজস্ব ব্যবস্থা ও কৌশলকে অগ্রাহ্য করে অধস্তন হিসেবে চিহ্নিত করে। যদিও গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বৈশিষ্ট্য রয়েছে পৃথিবীর সব সংস্কৃতির মধ্যেই। তবে পশ্চিমা ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্বের পক্ষে জনমত তৈরিতে বিশ্ব মিডিয়ায় প্রচারণাসহ নানা ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। পাশাপাশি মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণের ইস্যুকে কৌশলগতভাবে ব্যবহারের দৃষ্টান্ত এখনো বেশ জোরালো।
আশির দশকে চীনের সঙ্গে পশ্চিমের সম্পর্ক উন্নয়নের কারণ ছিল কৌশলগত, যদিও ১৯৮৯ সালের তিয়েন আন মেন স্কয়ারে বিক্ষোভে হত্যাযজ্ঞ সেই সম্পর্ককে বেশ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত করে। পরে পশ্চিমাদের সঙ্গে বাণিজ্যের প্রয়োজনে চীনে সঙ্গে সম্পর্ক আবার ঘনিষ্ঠ হয়। পশ্চিমারা চীনের বিশাল মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকে একটি বড় বাজার হিসেবে বিবেচনা করতে থাকে আবার একই সঙ্গে নিজেদের অর্থনীতিকে উচ্চপ্রযুক্তি ও সেবা খাতভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নিয়ে যাওয়ার জন্য উৎপাদন খাতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল তার পূরণের বিকল্প ছিল চীন। কিন্তু চীন আর তার আগের অবস্থায় নেই। অধিকন্তু সে পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করেছে, উচ্চপ্রযুক্তি অর্জনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, আর সংকটটা সেখানেই। এখানে বলে রাখা ভালো, চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মডেল সম্পূর্ণ তার নিজস্ব, সে পশ্চিম থেকে ধার করেছে সত্যি, কিন্তু তার সবকিছুই পশ্চিমের মতো নয়। নিজস্ব ব্যবস্থায় প্রায় সবকিছুতেই স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা চীনের একটি বড় কৌশল। যে কারণে চীন একদিকে যেমন ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ উন্মুক্ত করেছে অন্যদিকে সমাজে বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, শিক্ষা ও সম অধিকার বাস্তবায়নে বড় বড় কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করছে।
সম্প্রতি চীন সম্পর্কে দুটি অভিযোগ বেশ গুরুতর। যার একটি উইঘুরদের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অন্যটি সীমানা নিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিরোধে জড়ানো। সীমানা সংক্রান্ত বিরোধে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে চীনের আগ্রাসী ভূমিকা যেমন দায়ী একই সঙ্গে পশ্চিমাদের উসকানি ও অস্ত্রের বাজার টিকিয়ে রাখার কৌশলও কম দায়ী না। পশ্চিমা সংস্কৃতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হচ্ছে ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বীকৃতি ও চর্চা। তেমনি পশ্চিমা গণতন্ত্রের একটি বড় বিষয় হলো জনগণের ভোটাধিকার রক্ষা ও ক্ষমতার পরিবর্তন। পশ্চিমা ধনী দেশগুলো নিজেদের নাগরিকদের ভোটের পাশাপাশি, তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষায় যথেষ্ট সচেষ্ট। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা সমাজের লোকরঞ্জনবাদের উত্থান কতটুকু গণতান্ত্রিক তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তারপরও নিজের ঘর ঠিক রাখতে পশ্চিমের জুড়ি নেই কিন্তু অন্যের ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই বেখালি ও খামখেয়ালি বললেও অত্যুক্তি হবে না যার দৃষ্টান্ত এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন প্রান্তে।
ক্ষমতার ব্যবহার সম্পর্কিত আচার ও আচরণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু এখনো ক্ষমতার কেন্দ্রে আসীন তাই প্রভাব হারানোর ভয়টা তার একটু বেশিই, যদিও ইউরোপের কোনো কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের যৌক্তিক ও অযৌক্তিক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন বা অনুসরণ করে থাকে। বোঝা মুশকিল এই অন্ধ সমর্থনের পেছনে তাদের ঐতিহাসিক বন্ধন ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় কতটুকু কাজ করে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে আয়োজিত গণতান্ত্রিক সম্মেলন নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এর উদ্দেশ্য নিয়ে কথা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে চীনকে ঘায়েল করার জন্য, চীনের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য।
সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, এই চীন ও পশ্চিমের মধ্যে বর্তমান প্রতিযোগিতা বিশ্বকে নতুন কিছু না দেওয়ার প্রতিযোগিতা বরং বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের ক্ষমতা ও প্রভাব বলয় টিকিয়ে রাখার যারপরনাই চেষ্টা। এই প্রতিযোগিতার মধ্যে বিশ্বব্যবস্থায় কল্যাণকর কিছুই নেই, অধিকন্তু বিভাজন সৃষ্টির মাধ্যমে সংঘাত সৃষ্টির আশঙ্কা। অথচ পৃথিবী থেকে দরিদ্রতা, হানাহানি, বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্য এই উভয়ের ভূমিকা খুব দরকারি। সাম্প্রতিক সময়ে করোনাভাইরাস ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে বৈষম্যকে সবার সামনে দৃশ্যমান করেছে। বিশ্বব্যাপী টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে ধনী দেশগুলো নিজেদের দায়িত্বের অবহেলা ও নিজেদের স্বার্থকেন্দ্রিক বাড়াবাড়ি পৃথিবীর ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা সবার সমানে তুলে এনেছে।
বলা হয় বর্তমানে এই পৃথিবীর জিডিপির আকার ৯৪ ট্রিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে মাত্র চারটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান ও জার্মানি অর্ধেকের বেশি জিডিপির অধিকারী। এক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি বিশ্বের ১৭০টি দেশের জিডিপির থেকেও বেশি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই জিডিপি যদি বিশ্বের দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য বিমোচনে কাজে লাগানো না যায় তাহলে এর সার্থকতাই বা কী?
লেখক উন্নয়নকর্মী
