কমিউনিটি সংক্রমণের দিকে ওমিক্রন, তৃতীয় ঢেউ শুরু

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২২, ০১:৫২ এএম

দেশে গত তিন সপ্তাহ ধরেই করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। বিশেষ করে প্রতি সপ্তাহেই রোগী বাড়ছে দ্বিগুণ হারে এবং দৈনিক রোগী ও শনাক্ত হারও আগের দিনের তুলনায় বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। এভাবে বাড়তে বাড়তে সর্বশেষ গতকাল সোমবার তার আগের দিনের তুলনায় দ্বিগুণ রোগী শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ গত চার মাস পর এই প্রথম রোগী দুই হাজারের ঘর ছাড়াল।

একইভাবে গতকাল তার আগের দিনের তুলনায় শনাক্ত হার বেড়েছে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ থেকে এক দিনে বেড়ে শনাক্ত হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশে। এমনকি গত চার দিন ধরেই শনাক্ত হার ৫ শতাংশের ওপরে রয়েছে।

এমন অবস্থায় গতকাল দেশে নতুন করে আরও নয়জনের শরীরে করোনার নুতন ধরন ওমিক্রন পাওয়া গেছে। এ নিয়ে দেশে মোট ওমিক্রন শনাক্তের সংখ্যা দাঁড়াল ৩০ জনে। আক্রান্তরা সবাই ঢাকার বাসিন্দা।

করোনা সংক্রমণের এ আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি ওমিক্রনের কারণেই হচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দেশে এতদিন ওমিক্রনের ক্লাস্টার বা গুচ্ছ সংক্রমণ থাকলেও এখন ধরনটির কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সামাজিক সংক্রমণ শুরু হয়েছে। এমনকি ওমিক্রনের কারণেই করোনার তৃতীয় বা নতুন ঢেউ দেখা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে আরও বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে সংক্রমণ চূড়ায় উঠতে পারে, আবার সে মাসেই নেমে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এখন বিধিনিষেধ ও নিয়মকানুন না মানলে মার্চে সংক্রমণ আবার বেড়ে যেতে পারে বলেও সতর্ক করে দেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার পরপর দুই সপ্তাহ ৫ শতাংশের বেশি থাকলে দেশে তৃতীয় ঢেউ আঘাত হেনেছে বলে ধরে নিতে হবে। দেশে পরপর চার দিন শনাক্তের হারের এই ঊর্ধ্বগতির কারণে এখন করোনার তৃতীয় ঢেউ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর আগে গত বছর ৩ ফেব্রুয়ারি করোনার প্রথম ঢেউ নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু এ পরিস্থিতি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মার্চেই দ্বিতীয় ঢেউ দেখা দেয় এবং তা নিয়ন্ত্রণে আসে ৪ অক্টোবর।

আরও ৯ জনের ওমিক্রন শনাক্ত : দেশে আরও নয়জনের শরীরে করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন পাওয়া গেছে। এ নিয়ে মোট শনাক্ত ওমিক্রনের রোগী বেড়ে ৩০ জন হলো। নতুন শনাক্ত রোগীদের সবাই ঢাকার বাসিন্দা। তাদের শরীর থেকে নেওয়া ভাইরাসের নমুনার জিন বিন্যাস বিশ্লেষণ করে গতকাল ওমিক্রন সংক্রমণের তথ্য জানায় জার্মানির গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা (জিআইএসএআইডি)। এর আগে গত ১১ ডিসেম্বর দেশে প্রথমবারের মতো ওমিক্রন সংক্রমিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এক মাসের মাথায় শনাক্তের সংখ্যা ত্রিশে পৌঁছল।

জিআইএসএআইডির তথ্য অনুযায়ী, নতুন শনাক্ত নয়জনের মধ্যে ছয়জন রাজধানীর মহাখালী এলাকার এবং বাকি তিনজন বাসাবোর বাসিন্দা। মহাখালীর বাসিন্দাদের মধ্যে ছয়জন নারী, তাদের বয়স ১৮ থেকে ৫২ বছরের মধ্যে। আর বাসাবোতে যাদের ওমিক্রন ধরা পড়েছে তাদের দুজন ৫১ ও ৩০ বছর বয়সী পুরুষ এবং একজন ৫৬ বছর বয়সী নারী।

জিআইএসএআইডি জানিয়েছে, ২৯ ডিসেম্বর থেকে ৩ জানুয়ারির মধ্যে বিভিন্ন সময় তাদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। এসব নমুনার জিনোম সিকোয়েন্স করে তা জিআইএসএআইডিতে জমা দিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)।

এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর বলেন, ‘বিদেশফেরত কারও কভিড ধরা পড়লে তাদের শরীর থেকে ভাইরাসের নমুনা নিয়ে জিনোম সিকোয়েন্সিং করা হচ্ছে। পাশাপাশি আক্রান্তদের সংস্পর্শে এসেছেন এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে নমুনা নিয়েও জিনোম সিকোয়েন্স করা হচ্ছে। আক্রান্তদের সংস্পর্শে এসে দেশেও কয়েকজন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পেয়েছে আইইডিসিআর।’

৬১তম অবস্থানে বাংলাদেশ : জিআইএসএআইডির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থার তালিকাভুক্ত ওমিক্রন আক্রান্ত দেশের সংখ্যা ১০৫টি। এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬১তম। এর আগে ৬০তম পাকিস্তান। বাংলদেশের পরে আছে ৬২তম অবস্থানে নেপাল।

এক দিনে রোগী বাড়ল দ্বিগুণ : গতকাল দেশে এক দিনে শনাক্ত করোনা রোগীর সংখ্যা এক লাফে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ২০০ ছাড়িয়ে গেছে। সেই সঙ্গে দৈনিক শনাক্তের হার ছাড়িয়ে গেছে সাড়ে ৮ শতাংশ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গতকাল সোমবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ২ হাজার ২৩১ জনের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে ও মৃত্যু হয়েছে তিনজনের।

অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছর ১০ সেপ্টেম্বর এক দিনে এর চেয়ে বেশি ২ হাজার ৩২৫ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছিল। আর দুই হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছিল সর্বশেষ ১৪ সেপ্টেম্বর। নতুন রোগীদের নিয়ে দেশে মোট শনাক্ত করোনা রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ১৫ লাখ ৯৫ হাজার ৯৩১ জনে। তাদের মধ্যে ২৮ হাজার ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

একইভাবে প্রায় চার মাস পর গতকাল শনাক্ত হার ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। গতকাল শনাক্ত হার ছিল ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ, যা আগের দিন ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ ছিল। এর আগে গত বছর ১০ সেপ্টেম্বর নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার এর চেয়ে বেশি ছিল। সেদিন প্রতি ১০০ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৮ দশমিক ৬৫ জনের করোনা পজিটিভ এসেছিল।

এক সপ্তাহে রোগী বেড়েছে ১২৫ শতাংশ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত এক সপ্তাহে (৩-৯ জানুয়ারি) দেশে তার আগের সপ্তাহের (২৭ ডিসেম্বর-২ জানুয়ারি) তুলনায় রোগী বেড়েছে ১২৫ দশমিক ১ শতাংশ। চলতি সপ্তাহে মোট রোগী শনাক্ত হয়েছে ৭ হাজার ২৩৪ ও তার আগের সপ্তাহে ৩ হাজার ২১৩ জন। অন্যদিকে, গত এক সপ্তাহে তার আগের সপ্তাহের তুলনায় করোনায় মৃত্যু বেড়েছে ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ। চলতি সপ্তাহে মারা গেছে ২৫ ও তার আগের সপ্তাহে ১৭ জন।

শুরু ওমিক্রনের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন : আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন দেশে সংক্রমণের যে অবস্থা, তাতে ওমিক্রনের কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের শুরুর দিক বলা যায়। ফলে সংক্রমণ আরও বাড়বে। এতদিন ওমিক্রনের ক্লাস্টার বা গুচ্ছ সংক্রমণ ছিল। এখন কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হচ্ছে। ঢাকাতেই শুধু নয়, অন্যান্য বড় শহরেও রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। এক দিনে দুই হাজার লোক সংক্রমিত হলো। এই সার্ভিলেন্স ডেটা থেকেই তো বোঝা যাচ্ছে ওমিক্রন ছড়িয়ে পড়ছে। আরেকটি ইনডিকেটর হচ্ছে হাসপাতালের দিকে তাকালে বোঝা যায় যে রোগী কমে আসছে। সুতরাং বর্তমানে সংক্রমণের যে ধরন, তা থেকে বোঝা যায় যে ওমিক্রন কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের দিকে যাচ্ছে। কারণ এখন আর ওমিক্রনে আক্রান্তরা শুধু বিদেশ ফেরতে থাকছে না। এখন যাদের পাওয়া যাচ্ছে, তাদের হয়তো বিদেশফেরতদের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই। এরকম হলেই কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বলা যায়। এখন সেরকম হচ্ছে। তা না হলে এত রোগী হতো না।’

শুরু হয়েছে তৃতীয় ঢেউ : ওমিক্রনের কারণে দেশে করোনা সংক্রমণের তৃতীয় বা নতুন ঢেউ শুরু হয়েছে বলে জানান ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, ‘করোনা সংক্রমণের নতুন ঢেউ শুরু হয়েছে। ডেল্টার ধরনের সংক্রমণের সময় একটা ঢেউ ছিল। এখন ওমিক্রনের কারণে নতুন ঢেউ শুরু হয়েছে। কারণ শনাক্ত হার ৫ শতাংশের নিচে বহুদিন ছিল। সেখান থেকে দিন দিন বাড়ছে। এখন ঢেউয়ের শুরুর দিক। এটা বাড়তে থাকবে। কারণ ওমিক্রনের কারণে সংক্রমণ বৃদ্ধি ডেল্টার চেয়েও দ্রুত হবে। ডেল্টার সংক্রমণ করোনাভাইরাসের প্রথম বা আদিরূপের চেয়ে দ্রুত ছিল। ওমিক্রন ডেল্টার চেয়ে দ্রুত উঠবে ও নেমে যাবে।’

ফেব্রুয়ারিতে পিকের আশঙ্কা : এ ব্যাপারে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘নতুন ঢেউয়ের সংক্রমণ মাত্র শুরু হলো এবং ক্রমেই চূড়া বা পিকের দিকে যাচ্ছে। ডেল্টার সংক্রমণের সময় দৈনিক যত রোগী পাওয়া গেছে, ওমিক্রনে তার চেয়ে বেশি পাওয়া যাবে। ডেল্টার যতদিন লেগেছে পিকে উঠতে, ওমিক্রন তার চেয়ে দ্রুত পিকে উঠবে।’

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আগামী ফেব্রুয়ারিতে সংক্রমণ চূড়ায় উঠবে এবং সম্ভবত সে মাসেই নিচে নেমে যেতে পারে। এখন থেকে বাড়তে থাকবে এবং ফেব্রুয়ারিতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ হবে, অর্থাৎ চূড়ায় যাবে।’ তবে বিধিনিষেধ না মানলে মার্চে ফের সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই যদি এখন সতর্ক থাকি ও নিয়ম মেনে চলি, তাহলে মার্চে সংক্রমণ বাড়ার কোনো আশঙ্কা নেই।’

ওমিক্রনের কারণেই সংক্রমণ বাড়ছে : ওমিক্রনের কারণেই এখন সংক্রমণ বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, ‘বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এখন ওমিক্রনের কারণেই রোগী বাড়ছে। এর কতগুলো নির্দেশিকা রয়েছে। যেমন একটি হচ্ছে করোনা পজিটিভ রোগীর নমুনার জিনোম সিকোয়েন্স। জিনোম সিকোয়েন্সের রেজাল্ট পেতে কমপক্ষে এক সপ্তাহ সময় লাগে। এখন যাদের জিনোম সিকোয়েন্স করা হচ্ছে, দেখা যাবে তাদের বেশিরভাগই ওমিক্রনে আক্রান্ত এবং তারা ডেল্টাকে রিপ্লেস করে ফেলবে। আর ওমিক্রনের বৈশিষ্ট্য হলো এ ধরনটি দুদিনেই রোগী দ্বিগুণ হয়ে যায়। গত দুদিনে সেটা হয়েছে। সামনে আরও হবে। এছাড়া ওমিক্রনে গুরুতর অসুস্থতার হার কম। উদ্বেগের কারণে হাসপাতালে হয়তো অনেক মানুষ যাবে, কিন্তু আইসিইউতে চাপ কম থাকবে। হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা কম থাকবে বলে আমরা আশা করি। তবে ওমিক্রনের এমন ধরনে অসতর্ক হওয়া চলবে না। সংক্রমিত হলে গুরুতর অসুস্থ না হলেও শরীরে যে পরিবর্তন হয়, অনেক দিন ভুগতে হয়। এমনকি সেরে যাওয়ার পর শারীরিক নানা জটিলতা দেখা দেয়। যেমন ঘুম হয় না, ডায়াবেটিস রোগীদের ডায়াবেটিস বেড়ে যায়, রক্তে জমাট বেঁধে হৃদরোগ হতে পারে, যেকোনো অসুস্থতা হতে পারে। তাই কোনোভাবেই সংক্রমিত হওয়া যাবে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত