প্রথম দিনে শিথিল বিধিনিষেধ মানা হয়নি স্বাস্থ্যবিধি

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২২, ০২:৩৪ এএম

রাজধানীর রেস্তোরাঁগুলোর সামনে টানানো নোটিসে লেখা ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ ও ‘টিকার সনদ ছাড়া প্রবেশ করিবেন না’। এ ছাড়া শপিং মলের প্রবেশপথ ও নগরীতে চলাচলকারী বাসের গেটে লেখা রয়েছে ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’। তবে বাস্তবচিত্র অনেকটাই উল্টো। রেস্তোরাঁয় বসে খাবার খেতে চাইলেও কাউকে টিকার সনদ দেখাতে হয়নি। সেখানে যারা যাচ্ছেন তাদের অনেকের মুখেই মাস্ক নেই। এমনকি রেস্তোরাঁকর্মীর অনেকেরই মুখে নেই মাস্ক। রাজধানীর বড় বড় হোটেল ও রেস্তোরাঁর অনেকেই বিধিনিষেধের কথা জানলেও অলিগলির হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক-কর্র্তৃপক্ষ টিকা সনদ ছাড়া বসে খাবার খেতে দেওয়া যাবে না এ নির্দেশনাও পাননি। শপিং মলগুলোতেও মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। নগরীর বেশির ভাগ গণপরিবহনেও আসনের অতিরিক্ত অর্থাৎ দাঁড়িয়ে যাত্রী নিতে দেখা গেছে। অর্ধেকের বেশি যাত্রীর আবার মুখে মাস্ক নেই। কাঁচাবাজারগুলোতে দেখা গেছে একই চিত্র। সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধ কার্যকরের প্রথম দিন গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে।

তবে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিধিনিষেধ কার্যকরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা দেখা গেছে। স্বাস্থ্যবিধি না মানায় অনেককে গুনতে হয়েছে জরিমানাও।

সরেজমিনে গিয়ে গতকাল দুপুরে রাজধানীর মগবাজারের ‘ক্যাফে ডি তাজ হোটেল ও রেস্টুরেন্টের’ প্রবেশমুখে ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ ও ‘টিকার সনদ ছাড়া প্রবেশ করিবেন না’ এমন বার্তাসংবলিত স্টিকার দেখা গেছে। তবে খাবার খেতে আসা বেশির ভাগের কাছেই ছিল না টিকা সনদ। ‘টিকা সনদ’ আছে কি না ভোক্তার কাছে তা জানতেও চাননি সেখানকার কোনো কর্মী। রেস্টুরেন্টের অধিকাংশ কর্মীর মুখেও ছিল না মাস্ক।

একই এলাকার ‘উজ্জল হোটেল ও রেস্টুরেন্টের’ ব্যবস্থাপক উজ্জল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি। আমরা টিকার সনদ দেখছি না। আমাদের এখানে যারা খেতে আসছে তাদের সবাইকে খাবার দিচ্ছি। সরকারের উচিত আগে সবার টিকা নিশ্চিত করা। তারপর এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা। তা না হলে শুধু শুধুই ভোগান্তি বাড়বে।’

কারওয়ান বাজার এলাকার ‘তিন তারকা হোটেল ও রেস্টুরেন্টের’ ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের জায়গা থেকে আমরা প্রস্তুত রয়েছি। আমাদের অধিকাংশ কর্মী টিকা পায়নি। তবু সরকার যে নির্দেশনা দিয়েছে সেটা মানার চেষ্টা করছি।’

বিধিনিষেধের অংশ হিসেবে গণপরিবহনে অর্ধেক যাত্রী বহনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাসমালিক ও চালকরা বলছেন, এ নির্দেশনা তারা আগামী ১৫ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করবেন। গতকাল রাজধানীর রামপুরা, মগবাজার, কাকরাইল পল্টনসহ কয়েকটি এলাকায় বিভিন্ন বাসে যাত্রীদের স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখা যায়নি। যাত্রীদের চাপও ছিল বেশি। গুলিস্তান থেকে গাজীপুরগামী ‘প্রভাতী বনশ্রী পরিবহনের’ চালকের সহকারী মো. হৃদয় মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অর্ধেক যাত্রী নেওয়ার এখনো কোনো নির্দেশনা পাইনি। নির্দেশনা পেলেই আমরা সেই অনুযায়ী চলব।’

চিটাগাং রোডে ‘মঞ্জিল পরিবহনের’ হেলপার আবদুল ওহাব বলেন, ‘যাত্রীরা যেভাবে বাসে ওঠে, তাদের আটকানো যায় না। দরজা বন্ধ রাখলেও কোনো কোনো সময় সেটা ঠেলে ওঠার চেষ্টা করে। তখন আমরা অসহায় হয়ে তাদের তুলতে হয়।’

এদিকে বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ আছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, বিধিনিষেধ মানলে করোনা সংক্রমণ অল্প অল্প করে বাড়বে, নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে ও গণপরিবহনও একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে না। একইভাবে শপিং মল, দোকান মালিক সমিতি ও রেস্টুরেন্ট মালিকদেরও বোঝাতে হবে। কারণ সংক্রমণ বেশি হলে এসব প্রতিষ্ঠান আবার বন্ধ হয়ে যাবে। সরকারকে তাদের বোঝাতে হবে।

এ বিষয়ে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘এসব বিধিনিষেধ ঠিকমতো মানা গেলে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রভাব পড়বে। এসব বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ আছে। সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরও দায়িত্ব পালন করতে হবে। সবার স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ ছাড়া এসব বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।’

করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন মোকাবিলায় সরকারের দেওয়া ১১ বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে মাঠে আছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন ডিএমপির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ডা. সঞ্জীব দাস। তিনি বলেন, ‘পৌনে ২ ঘণ্টার অভিযানে ৫০-৬০ জনের প্রত্যেকেরই মাস্ক পরায় ত্রুটি দেখা যায়। কেউ থুতনিতে মাস্ক পরেছেন, কেউ ম্যাজিস্ট্রেট দেখে পকেট থেকে মাস্ক বের করেছেন। এ ছাড়া অধিকাংশের কাছেই ছিল না মাস্ক। তারা নানা অজুহাত দিয়েছেন। অভিযানে ১১ জনের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে। তাদের ১০০-২০০ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কয়েকজনকে মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে। পরে মাস্ক পরবে এ মর্মে মুচলেকাও নেওয়া হয়েছে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য সবাইকে সতর্ক করা।’

গত সোমবার ১১ দফা বিধিনিষেধের ব্যাপারে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সেখানে বলা হয়, বৃহস্পতিবার থেকে সারা দেশে এ বিধিনিষেধ কার্যকর হবে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তা বলবৎ থাকবে। বিধিনিষেধ চলাকালে বাস-ট্রেন ফের অর্ধেক যাত্রী নিয়ে চলবে। উন্মুক্ত স্থানে যেকোনো সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ করা যাবে না। এর আগে করোনা পরিস্থিতির অবনতি বিবেচনা করে গত ৩ জানুয়ারি এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়। সভা শেষে ৪ জানুয়ারি ১৫ দফা নির্দেশনা দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর ১১টি ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত