বিদায়ের এক মাস আগে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচন দিয়ে কেএম নুরুল হুদা নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি) আস্থার ঝিলিক দেখিয়েছে। ইসি চাইলে যে শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারে এটাই গত রবিবার নাসিক নির্বাচনের পর উঠে এসেছে।
নুরুল হুদা কমিশন গঠনের পর জাতীয় নির্বাচনসহ গত পাঁচ বছরে এই নির্বাচন কমিশন যত নির্বাচন দিয়েছে তাতে সমালোচনার বাণে জর্জরিত হয়েছে। এ কমিশনের যোগ্যতা এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। খোদ ইসির দুই সদস্যই কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক করেছেন। কিন্তু যাওয়ার শেষ মুহূর্তে গত রবিবার নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন দিয়ে সমালোচক, রাজনীতিক, বিদেশি কূটনীতিকসহ সব মহলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে ইসি। এই ইসি এতটা শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে পারবে কেউই তা ভাবেনি।
বিশেষ করে গত বছর ২১ জুন থেকে দেশব্যাপী পাঁচ দফায় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে সহিংসতা ও এতে নিহত হওয়ার ঘটনা, বিশৃঙ্খলার ঘটনায় বিদায়ের আগে নুরুল হুদা কমিশনের ঝুড়িতে শুধুই ব্যর্থতা যোগ হয়েছে। এই ইসি তফসিল ঘোষণা করলেই শঙ্কা আর সংশয় বাড়তে থাকে এবার সহিংসতায় কতজন প্রাণ হারাবে বা কত জায়গায় অঘটন ঘটবে। নুরুল হুদা কমিশনের কর্মকাণ্ডকে ঘিরে ইসি গঠনের প্রক্রিয়াই সমালোচনা বিদ্ধ হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বাইরে অন্য সব রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচন বিশ্লেষকরা এ কমিশনকে পক্ষপাতদুষ্ট, সরকারের আজ্ঞাবহ এবং নখদন্তহীন কমিশন বলেই আখ্যা দিয়ে আসছে। এই ইসির কর্মকাণ্ড এতটাই সমালোচিত হয়েছে যে, এখন বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল নুরুল হুদা কমিশনের মতো ইসি গঠন চায় না। দেশের বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল চায় আইন করে ইসি গঠন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন।
গত রবিবার অনুষ্ঠিত নাসিক নির্বাচন সম্পর্কে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচন বিশ্লেষকরা ইসির ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, সবাই এরকম পক্ষপাতহীন এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশই চায় ইসির কাছে। তবে তারা পাশাপাশি এও বলেছেন, একেবারেই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ এ নির্বাচন অনুষ্ঠানে এই ইসি জনগণের আস্থাভাজন হওয়ার কৌশল নিয়েছে। যেন নির্বাচন নিয়ে মানুষের ভুল বোঝাবুঝি কেটে যায়। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর যে ভয় কাজ করে হুমকিধমকি দেখিয়ে নির্বাচনকে প্রভাবিত করা এবং কোনো পক্ষের বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার অভিযোগ থেকে ইসিকে মুক্ত করার কৌশলও হতে পারে।
বিশ্লেষকরা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, নাসিক নির্বাচন নিয়ে খুব বেশি অভিযোগ কারও নেই। নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি নেতারাও বলেছেন, এ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক কম। যদিও তারা প্রার্থী দেননি। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হারুন-অর-রশীদ এমপি বলেছেন, এ নির্বাচনে ইসি ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কৌশল করেছে। তারা মানুষের কাছে আস্থা অর্জনের কৌশল নিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা চায় আগামী সংসদ নির্বাচনও এরকম নিরপেক্ষ হবে।
ইসির কর্মকাণ্ডের প্রকট সমালোচক স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশ্লেষক এবং সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার আসলে যে বার্তাটি দিতে চেয়েছে সেটা হলো, তাদের (আওয়ামী লীগ সরকার) অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব এবং তাই সরকারের ওপর আস্থা রাখা যায়। নাসিকে সরকার বড় ধরনের ঝুঁকি নিয়েছে। এটা অবশ্য তারা অনেক বুঝেশুনেই নিয়েছে। এখানে জয়-পরাজয়ের কারণে ক্ষমতার বদল হয়ে যাবে না। এটা জাতীয় নির্বাচন নয়, এটা স্থানীয় নির্বাচন। তাই এটার সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনকে মিলিয়ে ফেলার সুযোগ কম। তবে নাসিক নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। এখানে কোনো হানাহানি, মারামারি হয়নি। এখানে দুই প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব সহিংসতায় পরিণত হয়নি। আরেকটা হলো এখানে কোনো কুৎসা রটনা হয়নি, মোটামুটিভাবে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশেই নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা ও ভোটগ্রহণ হয়েছে। প্রধান দুই প্রার্থী শিষ্টাচার রক্ষা করেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। যেটা আজকাল দেখা যায় না।’
নির্বাচন বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘নাসিক নির্বাচনে কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কোনো অভিযোগ লক্ষ করা যায়নি। এ নির্বাচনটা সুষ্ঠু বলা যায়। বড় কথা হলো, এ নির্বাচনে সরকার কোনোভাবেই নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেনি।’
সংশ্লিষ্টরা নাসিক নির্বাচনের নেতিবাচক বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, ইভিএম পদ্ধতির ত্রুটি। সেখানে ভোটারদের বিপুল উপস্থিতি সত্ত্বেও ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহারের কারিগরি ত্রুটির জন্য ভোটগ্রহণে অনেক সময় লেগেছে। অনেকে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও শেষে ভোট দিতে না পেরে ফিরে গেছেন। বাংলাদেশে যে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে, এতে ভোট দেওয়ার কোনো পেপার ট্রেইল নেই। অর্থাৎ কাগজে কোনো রেকর্ড থাকছে না। ফলে নির্বাচন কমিশন আমাদের ভোটের বিষয়ে যা জানাবে সেটাই চূড়ান্ত, এটা ক্রস চেক করার কোনো ব্যবস্থা নেই। আগামী জাতীয় নির্বাচনে এরকম ত্রুটিপূর্ণ ইভিএম ব্যবহার করাটা কোনোভাবেই ঠিক হবে না। বিষয়টি নির্বাচন কমিশন এবং সব রাজনৈতিক দলেরই আমলে নেওয়া দরকার।
