ইউক্রেনে পুতিনের আগ্রাসী পদক্ষেপ কেন

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ১১:১২ পিএম

রাশিয়া ও ইউক্রেন সীমান্তে টানটান উত্তেজনা চলছে। যেকোনো মুহূর্তে ইউক্রেনে হামলা করতে পারে রুশ বাহিনী। চুপচাপ বসে নেই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট ন্যাটো। ইউক্রেন আক্রান্ত হলে চড়া মূল্য দিতে হবে বলে হুঁশিয়ার করেছে পশ্চিমা দেশগুলো। ক্রিমিয়ার মতো ইউক্রেন দখল কেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য জরুরি? লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া  

ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়ার সাম্প্রতিক সামরিক কর্মকাণ্ড ইউরোপকে বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকটে ফেলে দিয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের পর আরেকটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মহাদেশটি। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ উপদ্বীপ ক্রিমিয়া দখল করে রাশিয়া। এ নিয়ে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ আজও চলছে। তবে ইউক্রেন সীমান্তে সম্প্রতি রাশিয়ার এক লাখ সেনা মোতায়েন চলমান উত্তেজনা আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। ইউক্রেনে সামরিক হস্তক্ষেপের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে মস্কোর পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর কাছে সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন বিষয়ে বেশ কয়েকটি নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট দাবি উত্থাপন করে রাশিয়া। ইউক্রেনসহ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্য দেশগুলো যাতে ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র হতে না পারে, তা এসব দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ইউরোপের পূর্বাঞ্চলে ন্যাটোর সব ধরনের সামরিক কর্মকাণ্ড বন্ধেও জোটের কাছে দাবি জানায় রাশিয়া, যার অর্থ পোলান্ড ও তিন বাল্টিক রাষ্ট্র এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া থেকে ন্যাটোভুক্ত দেশের সেনাদের সরে যেতে হবে। মোদ্দা কথা, রাশিয়া চাইছে নিজেদের ১৯৯৭ সাল পূর্ববর্তী অবস্থানে ফিরে যাক ন্যাটো।

ইউক্রেন সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছে, পরিকল্পিত সামরিক আগ্রাসনের আগে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আরও আগ্রাসী পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে সরে দাঁড়াতে রাশিয়ার প্রতি বারবার আহ্বান জানাচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো। ইউক্রেনকে ঘিরে পুতিনের পদক্ষেপের এরই মধ্যে নিন্দা জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের কোনো অধিকার রাশিয়ার নেই বলে জানান জোটের মহাসচিব জেন্স স্টলটেনবার্গ। অন্যদিকে সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর বিষয়ে রাশিয়া বলছে, অস্ত্র সরবরাহ, প্রশিক্ষণসহ ইউক্রেনকে ন্যাটোর অন্যান্য সামরিক সহায়তা বৃদ্ধি হুমকিতে ফেলেছে মস্কোর পশ্চিমাঞ্চলকে।

সীমান্ত পরিস্থিতি

ইউক্রেন সীমান্তের চারদিকে রাশিয়ার সেনাদের সাম্প্রতিক অবস্থান ও তাদের গতিবিধি ‘অস্বাভাবিক’ হিসেবে অভিহিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো। ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর পরিণতি ভয়াবহ হবে বলে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে হুঁশিয়ার করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ইউরোপীয় নেতারা। তা সত্ত্বেও ইউক্রেন সীমান্তে এক লাখের মতো সেনা জড়ো করেছে রাশিয়া। গত বছরের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালের শুরুতে ইউক্রেনে সামরিক হামলা চালাতে পারে রাশিয়া। চলতি মাসের ১৯ তারিখে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে যান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন। সেখানে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ইউক্রেন সীমান্তে সামরিক কর্মকাণ্ড জোরদার করেছে রাশিয়া। প্রায় এক লাখ সেনা সেখানে এরই মধ্যে মোতায়েন করা হয়েছে। এর চেয়ে দ্বিগুণ সেনা দ্রুত সীমান্তবর্তী এলাকায় মোতায়েনের আশঙ্কা রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্র কুলেবাও উপস্থিত ছিলেন। গত বছরের শেষের দিকে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাওয়া ছবিতে দেখা যায়, ইউক্রেন সীমান্ত থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে এক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বন্দুক, ট্যাংকসহ অত্যাধুনিক অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম জড়ো করেছে রাশিয়া।      

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক গোয়েন্দা প্রতিবেদন বলছে, দেশটির সীমান্ত  এলাকায় ১ লাখ ২৭ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করেছে মস্কো। এদের মধ্যে ২১ হাজারের মতো বিমান ও নৌসেনা রয়েছে। এ ছাড়া সীমান্তে স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী যান পাঠানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে রাশিয়া। ইউক্রেন সীমান্তে সাম্প্রতিক উত্তেজনা নিরসনের লক্ষ্যে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা দেশের তিন ধাপের কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিবেদন সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, আগামী মাসে বা তার পরের মাসের যেকোনো সময়ে ইউক্রেনে আগ্রাসন চালাতে পারে রাশিয়া।

রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে ইউক্রেনের অবস্থান। মস্কোর বেশির ভাগ সামরিক ঘাঁটি দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। ইতিহাস বলছে, অবস্থানগত সুবিধার কারণে ইউক্রেনের ওপর ফের হামলা হতে পারে। অবশ্য সীমান্তে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধির বিষয়ে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নিয়মিত শীতকালীন সামরিক মহড়া চলছে, আর কিছুই নয়। এদিকে রাশিয়ার সীমান্তবর্তী ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দোনেতস্ক ও লুহানস্ক (দনবাস অঞ্চল নামে পরিচিত) ২০১৪ সাল থেকে রাশিয়া সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে। ওই অঞ্চলেও সম্প্রতি রুশ বাহিনী অবস্থান নিয়েছে। এ ছাড়া ইউক্রেনের দক্ষিণে দখলকৃত ক্রিমিয়ায় নিজেদের নৌঘাঁটিতে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করেছে রাশিয়া।

গত পাঁচ বছরে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষ না বাধলেও ছোটখাটো  সংঘর্ষ ও স্নাইপার অ্যাটাকে (দূরপাল্লার ছোট অস্ত্র দিয়ে গোপন স্থান থেকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে হামলা) উভয় দেশ প্রায়ই লিপ্ত হয়। গত বছরের অক্টোবরে রাশিয়াপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দখল করা অঞ্চল মুক্ত করার লক্ষ্যে প্রথম তুরস্ক নির্মিত ড্রোন ব্যবহার করে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী। এ ঘটনা প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত করে রাশিয়াকে।

কেন ইউক্রেন 

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের পেছনে সাম্প্রতিক প্রাসঙ্গিকতা ও ঐতিহাসিক উভয় কারণই রয়েছে। ক্রিমিয়ার সবচেয়ে বড় বন্দরনগরী সেভাস্টোপল কৃষ্ণ সাগরে অবস্থিত। এ ছাড়া এই সাগর তীরে রয়েছে আরও অনেক ওয়ার্ম ওয়াটার পোর্ট (যেসব বন্দরের পানি শীতকালে বরফ হয় না)। এ কারণে গত কয়েক শতাব্দী ধরে কৃষ্ণ সাগরকে নিজেদের নিরাপত্তার কেন্দ্রস্থল হিসেবে দেখছে রাশিয়া। ১৭৮৩ সালে অটোমান তুর্কিদের কাছ থেকে ক্রিমিয়া দখল করে রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী ক্যাথরিন দ্য গ্রেট। আর আফগানিস্তানে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন আগ্রাসন চালালে অনেক রুশ স্বপ্ন দেখেছিলেন, এবার তারা ভারত মহাসাগরের উষ্ণ পানিতে পা ধুতে পারবেন।  উষ্ণ পানির জন্য রাশিয়ার এমন মরিয়া ভাব একদমই অমূলক নয়। কারণ আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত দেশটির বেশির ভাগ বন্দর বছরের বেশ কয়েক মাস বরফে ঢাকা থাকে। অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বন্দর ভøাদিভস্তক বছরের চার মাস বরফে ঘেরা থাকে।

ক্রিমিয়া দখল করে কৃষ্ণ সাগরের সেভাস্টোপলের বন্দর ব্যবহারে সক্ষম হয় রাশিয়া। এটিই এখন দেশটির একমাত্র উষ্ণ পানির বন্দর। অবশ্য কৃষ্ণ সাগর পেরিয়ে ভূমধ্যসাগর ব্যবহারে দেশটিকে এখনো সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। কারণ ১৯৩৬ সালের এক চুক্তি (মন্ট্রা কনভেনশন) বসফোরাস প্রণালী নিয়ন্ত্রণের পুরো অধিকার দিয়েছে তুরস্ককে। ন্যাটোর সদস্যভুক্ত রাষ্ট্র তুরস্ক। বসফোরাস প্রণালীতে রাশিয়ার জাহাজ চলাচল করতে পারলেও সংঘর্ষের সময় তা বন্ধ থাকে। তুরস্কের প্রতি রাশিয়ার সাম্প্রতিক পদক্ষেপের অন্যতম বড় কারণ এই প্রণালী।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় কৃষ্ণ সাগরে কর্র্তৃত্ববাদী শক্তিতে পরিণত হয় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত পতনের পর কৃষ্ণ সাগর অঞ্চলের বড় অংশ ধীরে ধীরে খোয়াতে থাকে রাশিয়া। আর সাবেক সোভিয়েতভুক্ত অনেক দেশ পশ্চিমের দিকে হেলতে শুরু করে। কৃষ্ণ সাগরকে ঘিরে ইউক্রেনের সঙ্গে এক চুক্তি হয় রাশিয়ার। এতে বলা হয়, কৃষ্ণ সাগর রাশিয়ার নৌবাহিনী ব্যবহার করতে পারবে এবং সেভাস্টোপলে রুশ জাহাজ ভিড়তে পারবে। ২০১০ সালে কৃষ্ণ সাগরে রাশিয়ার জাহাজ চলাচলের লিজ ২০৪২ সাল পর্যন্ত নবায়ন করে ইউক্রেন। তবে ২০১৪ সালে ইউক্রেনে বিপ্লবের সময় দেশটির রাশিয়াপন্থি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকভিচ ইউক্রেনে পালিয়ে যান। ২০১০ সালের কৃষ্ণ সাগরকেন্দ্রিক চুক্তি ইউক্রেন বাতিল করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে পুতিনের।  

ইউক্রেনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রুশ বসবাস করেন। এই জনগোষ্ঠীর পাঁচ লাখের বেশি মানুষকে গত এক দশকে রাশিয়ান পাসপোর্ট দিয়ে সহায়তা করে মস্কো। সাম্প্রতিক এক আদমশুমারি বলছে, ইউক্রেনে ৮০ লাখ রাশিয়ান বাস করে। দেশটির দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে মূলত এদের বাস। রাশিয়ার এক আইনে উল্লেখ রয়েছে, জাতিগত রুশদের রক্ষায় বাধ্য থাকবে মস্কো। এমনকি কেউ শুধু রাশিয়ান ভাষায় কথা বলতে পারলেই তার নিরাপত্তার দায়িত্ব রাশিয়ার ওপর বর্তাবে। তাই ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে রাশিয়াপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা ও সমর্থনের বিষয়ে পুতিনের যুক্তি, ওই অঞ্চলের জাতিগত রাশিয়ানদের স্বার্থ রক্ষা করছেন তিনি। এমনকি ইউক্রেনের ওই অঞ্চলকে নভোরোসিয়া বা নিউ রাশিয়া বলতেও দ্বিধা করেন না তিনি।  পুতিনের এই যুক্তিকে উদ্বেগজনক মনে করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। কারণ বেশ কয়েক লাখ জাতিগত রাশিয়ান সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরে ও রাশিয়ার মূল ভূ-খণ্ডের বাইরে বাস করেন। ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে রাশিয়াপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিষয়ে পুতিন এ অবস্থান নিলে একই কৌশল প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্ষেত্রেও তিনি প্রয়োগ করতে পারেন বলে আশঙ্কা রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। ২০০৬ সালে জর্জিয়া ও ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল তাদের এই আশঙ্কার মূল ভিত্তি। পুতিনের সাম্রাজ্যবাদী পররাষ্ট্রনীতি রাশিয়ায় সম্প্রতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা পুতিনের প্রতি জনসমর্থন ৮০ ভাগে নিয়ে গেছে, যা বেশ কিছু সময় ধরে টানা পড়তির দিকে ছিল। 

গত কয়েক দশকে ন্যাটোর সামরিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ মস্কোকে ব্যাপক চাপ ও হুমকির মধ্যে ফেলে। এটি ইউক্রেনের প্রতি রাশিয়ার আগ্রাসী তৎপরতার অন্যতম আরেক কারণ। নব্বইয়ের দশকে ন্যাটোর পক্ষ থেকে রাশিয়াকে বেশ কয়েকবার আশ্বস্ত করা হয়েছিল এই বলে যে, ভবিষ্যতে নিজেদের সামরিক কর্মকাণ্ডের আর সম্প্রসারণ ঘটাবে না জোট। কিন্তু ১৯৯৭ সাল থেকে ন্যাটোর পরিধি আরও বাড়তে থাকে। চেক রিপাবলিক, পোলান্ড, বুলগেরিয়া, রোমানিয়াসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশ ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত হয়। ন্যাটোর যে কোনো ধরনের সম্প্রসারণ উদ্যোগ চিন্তায় ফেলে রাশিয়াকে। ক্রিমিয়া দখলের সময় ন্যাটোর উদ্দেশে পুতিনের বার্তা ছিল পরিষ্কার। তিনি সে-সময় বলেছিলেন, ‘একটি স্প্রিংকে সব দিক থেকে যত জোরে চাপ দেওয়া হবে, এটি তার আগের অবস্থানে আরও জোরে ও দ্রুত ফিরে আসবে। বিষয়টি আপনাদের সবসময় মনে রাখা দরকার।’

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে সামাল দিতে বিরোধী শক্তি হিসেবে একসময় সামরিক জোট ন্যাটো গঠন করা হয়। ন্যাটোভুক্ত কয়েকটি দেশের সঙ্গে রাশিয়ার সরাসরি সীমানা রয়েছে। সেসব দেশে সংঘর্ষ বাধলে তার আঁচ রাশিয়ার গায়েও লাগে। এসব বিষয় বিবেচনা করলে ন্যাটোর কর্মকাণ্ড ও সম্প্রসারণ রাশিয়াকে উদ্বেগে ফেলবে, এটাই স্বাভাবিক। ন্যাটোর পক্ষ থেকে এ নিয়ে রাশিয়াকে নিরুদ্বেগ করার কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তাতে খুব একটা লাভ হয়নি। ন্যাটোর সম্প্রসারণ তৎপরতা ও এর জেরে রাশিয়ার উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালে মস্কোর সঙ্গে সামরিক জোটটির একটি চুক্তি হয়। এতে বলা হয়, ইউরোপের পূর্বাঞ্চলে সেনা মোতায়েন বা পারমাণবিক অস্ত্র সরবরাহ করবে না ন্যাটো। এই চুক্তি দীর্ঘদিন মেনে চলে ন্যাটো। ইউক্রেনকে জোটে নেওয়ার আবেদন বেশ কয়েকবার বাতিলও করে ওই জোট।

পাল্টাপাল্টি

সম্প্রতি রাশিয়ার পক্ষ থেকে অভিযোগ করে বলা হয়, অস্ত্র সরবরাহ, সেনা প্রশিক্ষণসহ সামরিক খাতে ইউক্রেনকে সহায়তা করছে ন্যাটো, যা তার দেশের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এ ছাড়া দনবাস অঞ্চল পুনর্দখলের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সেনাসংখ্যা বৃদ্ধি করেছে ইউক্রেন। ন্যাটোর সঙ্গে ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তির বিষয়টি উল্লেখ করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন জানান, চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়ার সীমান্তে ওই সামরিক জোট তাদের সম্প্রসারণ ও সামরিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারে না। ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাসহ অত্যাধুনিক অস্ত্র ইউক্রেনকে দিচ্ছে ন্যাটো। এই জোট ইউক্রেনকে দিন দিন সামরিকভাবে শক্তিশালী করছে। গত বছরের নভেম্বরে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ জানান, যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটোভুক্ত অন্যান্য দেশ ইউক্রেনে অস্ত্র ও সামরিক উপদেষ্টা পাঠাচ্ছে। পূর্ব ইউরোপের ওই দেশটিকে এসব সহায়তা দেওয়া বন্ধ না করলে দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার রাখে মস্কো।  অন্যদিকে ইউক্রেন সরকারের বক্তব্য, কিয়েভ যদি ন্যাটোর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চায়, সে ক্ষেত্রে রাশিয়া তাতে বাধা দিতে পারে না। ন্যাটোর সঙ্গে ইউক্রেনের চলমান আলোচনা নিয়ে রাশিয়ার মন্তব্য করার কোনো এখতিয়ার নেই। পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সম্প্রসারণ কর্মকাণ্ড জারি না রাখার রাশিয়ার প্রস্তাব সম্পূর্ণ অবৈধ। রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান পরিকল্পনারও অভিযোগ আনে ইউক্রেন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্র কুলেবা সম্প্রতি সতর্ক করে বলেন, দেশে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে সরানোর চক্রান্ত করছে রাশিয়া। আগ্রাসন চালানোর আগে ইউক্রেনকে চরম অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে চাইছে মস্কো।

অভ্যুত্থানের তথ্য

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্র কুলেবার সতর্কবার্তা অহেতুক নয় বলে গত রবিবার মন্তব্য করে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘রাশিয়া ইউক্রেনে মস্কোপন্থি প্রেসিডেন্ট বসানোর পরিকল্পনা করছে, এমন তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। ইউক্রেনের সাবেক এমপি ইয়েভহেন মুরায়েভকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।’ এ ছাড়া বিবৃতিতে প্রার্থী তালিকায় আরও চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ‘আমরা জানতে পেরেছি, সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রীসহ ইউক্রেনের কয়েকজন রাজনীতিকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা।’     

ইউক্রেনে রাশিয়ার অভ্যুত্থান সম্পর্কিত তথ্য অবশ্য কেবল যুক্তরাজ্যের কাছেই পৌঁছায়নি। একই তথ্য পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। এ নিয়ে হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইউক্রেনে রাশিয়া আরও আগ্রাসন চালালে মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। সীমান্তে এ মুহূর্তে ইউক্রেন ও রাশিয়া যুদ্ধংদেহী অবস্থানে রয়েছে। রাশিয়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইউক্রেন দখল করবে না কি ন্যাটোর প্রতিরোধের মুখে হাত গুটাবে, তা সময়ই বলে দেবে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত