দুই চালকের রেষারেষি

অ্যাম্বুলেন্সে ছটফট করতে করতে প্রাণ গেল শিশুর

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০১:২৭ এএম

ঢাকার সাভারে আগে যাওয়া নিয়ে আম্বুলেন্স ও মাইক্রোবাস চালকের বাগ্বিতণ্ডার মধ্যে অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে আটকে থেকে ছটফট করতে করতে মারা গেছে ক্যানসারে আক্রান্ত ৯ বছর বয়সী এক শিশু। তার নাম আফসানা আক্তার। বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর মহাসড়কের আশুলিয়ার বাইপাইল ত্রিমোড় এলাকায় গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। ব্যস্ত মহাসড়কে শত শত মানুষের চলাচল থাকলেও ঘটনার আকস্মিকতায় অসহায় হয়ে পড়া আফসানার পরিবারকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেননি কেউ।

রাজধানীর মহাখালীর ক্যানসার হাসপাতাল থেকে গতকাল দুপুরে ক্যানসারে আক্রান্ত শিশু আফসানাকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধায় ফিরছিল তার পরিবারের সদস্যরা। পথে আশুলিয়ার বাইপাইলে ওভারটেকিংকে (পাশ কাটিয়ে আগে যাওয়া) কেন্দ্র করে অ্যাম্বুলেন্সের চালককে মারধর করেন একটি মাইক্রোবাসের চালক। একপর্যায়ে অ্যাম্বুলেন্সের চাবিটিও ছিনিয়ে নেন তিনি। তখন আফসানার পরিবারের সদস্যরা অনুনয়-বিনয় করে বারবার অ্যাম্বুলেন্সে অসুস্থ শিশু থাকার কথা বললেও মন গলেনি মাইক্রোবাস চালকের। উল্টো আরও কয়েকজন সহযোগীকে ফোন করে ডেকে এনে অ্যাম্বুলেন্স চালককে মারধর করতে থাকেন। এরই মধ্যে ছটফট করতে করতে বাবার কোলে মৃত্যু হয় আফসানার।

মারা যাওয়া আফসানা গাইবান্ধা সদর থানার মধ্য ধানগড়ার সাপলামিল এলাকার আলম মিয়ার মেয়ে। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে প্রায় চার মাস ধরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। সেখান থেকে ঢাকার মহাখালী ক্যানসার হাসপাতালে রেফার্ড করলে শিশু আফসানাকে নিয়ে ঢাকায় আসে তার পরিবার। চিকিৎসককে দেখিয়ে গতকাল অ্যাম্বুলেন্সে করে বাড়ি ফিরছিল তারা।

আফসানার মৃত্যুর খবর পেয়ে পাশে থাকা ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে এসে অ্যাম্বুলেন্সের চাবি সংগ্রহ করলেও চালককে মারধরকারী মাইক্রোবাসের চালকসহ অন্যরা পালিয়ে যায়। তবে মাইক্রোবাসটি জব্দ করা হয়।

দীর্ঘ সময় পর অ্যাম্বুলেন্সের চাবি পেয়ে আফসানার নিথর দেহ নিয়ে পাশের নারী ও শিশু হাসপাতালে ছুটে যান তার পরিবারের সদস্যরা। তবে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে আনার আগেই আফসানার মৃত্যু হয়েছে। আশুলিয়া থানা পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়েছে।

অ্যাম্বুলেন্স চালককে মারধরকারী মাইক্রোবাস চালকের নাম নজরুল ইসলাম বলে জানা গেছে। তিনি বাইপাইলের আবদুল মজিদ নামে এক ব্যক্তির মালিকানাধীন রেন্ট-এ-কার প্রতিষ্ঠানের মাইক্রোবাসটি চালান। এছাড়া তার সহযোগীদের নামও জানা গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অ্যাম্বুলেন্সে নিজের চোখের সামনে মেয়ের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে আফসানার বাবা আলম মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার মেয়ে ক্যানসারের রোগী। রংপুর থেকে মহাখালীতে এসে ডাক্তার দেখিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে বাড়ি ফিরছিলাম। পথে সাইড না পেয়ে মাইক্রোবাসের চালক অ্যাম্বুলেন্স ব্যারিকেড দিয়ে চালককে মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে তাদের লোকজন অ্যাম্বুলেন্সের চাবিও নিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরেও চাবি ফেরত না পাওয়ায় মেয়েটি আমার অ্যাম্বুলেন্সেই চোখের সামনেই মারা গেল।’

অ্যাম্বুলেন্স চালক মারুফ হোসেন বলেন, ‘সাইড না দেওয়ার জেরে মাইক্রোবাস চালক নজরুল গাড়ি আটকে আমাদের মারধর শুরু করে। অনেকবার অনুরোধ করে বলেছি, গাড়িতে জরুরি রোগী আছে। সে কোনো কথা শুনে নাই, উল্টো ফোন করে আরও লোকজন নিয়ে আসছে। পরে ৯৯৯-এ ফোন দিলে পুলিশ এসে চাবি সংগ্রহ করে রোগীকে স্থানীয় নারী ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায়। কিন্তু তার আগেই রোগী মারা যায়।’

প্রত্যক্ষদর্শী সোলায়মান মিয়া বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্সটি আটকে চাবি না নিলে হয়তো শিশুটি বেঁচে থাকত। ঘটনার সময় অনেকেই চাবি ফেরত দিতে বললেও হামলাকারীরা কারও কথা শোনেনি। মাইক্রোবাস চালকের কারণেই শিশুটির করুণ মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনার উপযুক্ত বিচার হওয়ার দরকার।’

আশুলিয়া থানার এসআই সামিউল ইসলাম বলেন, ‘নিহত শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শেষে ঊর্ধ্বতন অফিসারের সঙ্গে পরামর্শ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া মাইক্রোবাসটি আটকসহ এটির চালক ও তার সহযোগীদের পরিচয় জানা গেছে। দ্রুত তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত