বঙ্গমাতার নামে হাসপাতাল নির্মাণে পদে পদে দুর্নীতি

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৪:০৩ এএম

দরপত্র আহ্বানের সময় বিদ্যমান রেট শিডিউল (দর তফসিল) অনুসরণ না করে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। এ কারণে সরকারের ১ কোটি ৮০ লাখ ৪১ হাজার ৯৬৫ টাকা লোকসান হয়। এ ছাড়া সীমানা দেয়াল, মাটি ভরাট, ছাদ ও ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, রিজার্ভ ট্যাংকির কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করা হয়। দুর্নীতির এসব ঘটনা ঘটেছে খোদ প্রধানমন্ত্রীর মায়ের নামে গোপালগঞ্জে নির্মিত বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে। এ ঘটনার জন্য দায়ী করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (মেট্রোপলিটন জোন) প্রদীপ কুমার বসুর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই বিভাগীয় মামলা হয়েছে। একই ঘটনায় এর আগে এই প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) গণপূর্ত ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের এই প্রকৌশলী অনিয়ম আর দৃশ্যমান দুর্নীতি করা সত্ত্বেও নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে পার পেয়ে গিয়েছিলেন। এর মধ্যে তিনি দুই দফা পদোন্নতিও বাগিয়ে নিয়েছেন।

গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রদীপ কুমার বসু গোপালগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থাকাকালে তার তত্ত্ব¡াবধানে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নামে প্রতিষ্ঠিত চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ওই সময় তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিমের অভিযোগের পর পূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার সরেজমিন পরিদর্শন করে নানা অনিয়মের চিত্র পান।

সেখানে প্রকল্পের সীমানা দেয়াল, মাটি ভরাট, ভবনের ছাদ, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, রিজার্ভ ট্যাংকির কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই ঠিকাদারকে বিল দিয়ে দেন। এ ছাড়া ওই প্রকল্পে সোলার প্যানেল স্থাপনে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়। ২০১৬ সালের ২ অক্টোবর সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে প্রকৌশলী প্রদীপকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে প্রদীপ কুমার বসুর বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পেলে ২০১৬ সালের ২৩ জুন তৎকালীন গণপূর্ত সচিব তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। প্রকৌশলী প্রদীপের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সেই সঙ্গে তার ইনক্রিমেন্ট স্থগিত রাখা হয়। পরে ‘ম্যানেজ মাস্টার খ্যাত’ প্রকৌশলী প্রদীপ সবকিছু ধামাচাপা দিয়ে ধাপে ধাপে পদোন্নতি নিয়ে গণপূর্তের সবচেয়ে ‘দামি’ চেয়ার মেট্রোপলিটন জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেন।

এসব অনিয়মের ঘটনায় দায়ী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটি (পিএ)। কমিটির ১২তম সভা থেকে এই সুপারিশ আসে।

পূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত ১২ জানুয়ারি গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার বিভাগীয় মামলা করে চিঠি দেন। চিঠিটি প্রদীপ কুমার বসুর ঢাকার ঠিকানা (নিজ অফিস) ও স্থায়ী ঠিকানা নিজ জেলা মাগুরায় ‘অভিযোগ নামা’ হিসেবে পাঠানো হয়েছে। এর আগে পিএ কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে বিভাগীয় মামলা দায়েরের জন্য ২০২০ সালের ২৯ জুলাই গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) নন্দিতা রানী সাহা মন্ত্রণালয়ে ফাইল পাঠান। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দেড় বছর পর এই প্রকৌশলীকে শাস্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা নিয়েছে মন্ত্রণালয়।

সচিবের পাঠানো অভিযোগে বলা হয়, ‘গোপলগঞ্জের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ও বর্তমানে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (মেট্রোপলিটন জোন) প্রদীপ কুমার বসুর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ১/২২ দায়ের করা হলো। প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার বসু ২০১১ সালের ৫ মে থেকে ২০১৫ সালের ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত গোপালগঞ্জে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কর্মরত থাকাকালে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নির্মাণ প্রকল্পে সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

পিএ কমিটির সভার কার্যবিরণীর ৫.৪ আলোচ্য বিষয় ও অডিট আপত্তির ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের আওতায় চারতলা ১৬ ইউনিটের ৮০০ বর্গফুট কোয়ার্টার নির্মাণকাজের দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও অন্যান্য রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই কোয়ার্টার নির্মাণকাজের দ্বিতীয় দরপত্রদাতাকে নন-রেসপনসিভ করা হয়। প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতার মূল্য ছিল ৮ কোটি ৬৪ লাখ ৩৫ হাজার ৪২ টাকা। সেটা সংশোধন করে ৯ কোটি ৬৪ লাখ ৪৬ হাজার ৫৬৪ টাকা করা হয়। দরপত্র আহ্বানের সময় গণপূর্ত দর তফসিল ২০০৮ অনুসরণ করে প্রাক্কলন তৈরি করা হয়। কিন্তু দরপত্র মূল্যায়নের সময় দর তফসিল ২০১১ অনুসরণ করায় পুনরায় ১০ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তি দর নির্ধারণ করলে সেটা দাঁড়ায় ১০ কোটি ৬৪ লাখ ৭৭ হাজার ৫৭ টাকা; যা বিধিসম্মত নয়।

গণপূর্ত সচিবের পাঠানো অভিযোগে প্রদীপ বসুকে কেন চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে না, ১০ দিনের মধ্যে তা জানাতে বলা হয়েছে।

গণপূর্ত অধিদপপ্তরের একাধিক প্রকৌশলী জানান, প্রদীপ কুমার বসু চাকরির শুরু থেকেই নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তিনি গণপূর্ত বিভাগ-১, খুলনায় উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায়ও নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। খুলনা মেডিকেল কলেজের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এবং ক্যাজুয়ালিটি ভবন নির্মাণকাজে দুর্নীতির ঘটনায় তৎকালীন গণপূর্ত খুলনা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মনজুর মোর্শেদ আনোয়ার, খুলনা গণপূর্ত সার্কেলের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মিলে তাকে খুলনা জেলার বাইরে শাস্তিমূলক বদলির জন্য ২০০৭ সালের ৬ জুন প্রধান প্রকৌশলীর কাছে চিঠি দেন। নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়া সেই প্রদীপ কুমার বসুই ২০২০ সালের ১৫ জুলাই থেকে গণপূর্তের মেট্রোপলিটন জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্বে রয়েছেন। যার আওতাধীন রয়েছে গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বঙ্গভবন, সচিবালয়, কেন্দ্রীয় জেলখানা, সংসদ ভবন ও দেশের উচ্চ আদালতসহ সরকারের নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। কিন্তু এবার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায় থেকে প্রকৌশলী বসুর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে আনুষ্ঠানিক শাস্তির ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে অনেকেই মনে করেন, পিএ কমিটি যে অনিয়ম পেয়েছে, তা আর্থিক ক্ষতি। সরকারের প্রায় ২ কোটি টাকা গচ্চার ঘটনা কিছুদিন ধামাচাপা দিলেও তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ নেই। একমাত্র টাকা আদায় করা হলেই এর সমাধান হবে।

প্রদীপ কুমার বসুর বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. শামীম আখতার গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার বসুর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার পর মন্ত্রণালয় থেকে প্রধান প্রকৌশলীর পক্ষে প্রতিনিধি চাওয়া হয়েছে। আমরা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মো. নাসিমকে প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ করেছি। পরবর্তী সব কার্যক্রম মন্ত্রণালয় করবে।’

দুর্নীতির অভিযোগের ব্যাপারে বক্তব্য জানতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (মেট্রোপলিটন জোন) প্রদীপ কুমার বসুর মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি ধরেননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত