টাঙ্গাইলের বাসাইলে ঝিনাই নদী থেকে অবৈধ ড্রেজার দিয়ে প্রকাশ্যে চলছে বালু উত্তোলন। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রচ্ছায়ায় একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ চালিয়ে আসছে বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী। আর এসব তথ্য স্থানীয় সাংবাদিকদের দেওয়ায় স্থানীয় এক যুবককে পিটিয়ে গুরুতর আহত করার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
মো. মামুন মিয়া (২৮) নামে ওই যুবককে গুরুতর আহত অবস্থায় বাসাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি স্থানীয় মুদি দোকানি আবদুল হকের ছেলে।
আহত মামুন মিয়ার অভিযোগ, তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বাসাইলের কাঞ্চনপুর কোদালিয়া পাড়ায় নিজেদের মুদি দোকানে বসে ছিলেন। এ সময় কাঞ্চনপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সুমন মিয়া (২৫) এবং তার সহযোগী ছাত্রলীগ কর্মী মাসুম রানা (২৪) ও মো. শাকিল আহমেদ সোহাগ (৩০) তার ওপর হামলা চালায়। তখন তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাসাইল পৌর এলাকার বালিনা নদীর ঘাট এলাকা ও তার দুইশ গজ উত্তরে দুটি বাংলা ড্রেজার বসিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা ঝিনাই নদী থেকে বালু উত্তোলন করছেন। এর মধ্যে কাঞ্চনপুর পশ্চিমপাড়ায় ঝিনাই নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে বাংলা ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করছে প্রভাবশালী একটি চক্র। এতে করে নদীতীরবর্তী এলাকার বাড়িঘর, কবরস্থান, আবাদি জমি, কাঁচা-পাকা সড়কসহ বিভিন্ন স্থাপনা এরই মধ্যে নদীতে চলে গেছে। বাকি স্থাপনাগুলোও হুমকির মধ্যে রয়েছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের এই মহাযজ্ঞ দ্রুত বন্ধ না হলে আগামী বর্ষা মৌসুমে আরও শত শত ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হতে পারে বলে ভাষ্য এলাকাবাসীর।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বর্ষা মৌসুমে ঝিনাই নদীর মাজমের দও এলাকার বাঁকে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। ভাঙনকবলিত জায়গায় বাংলা ড্রেজার বসানোয় পুরো এলাকায় নতুন করে ভাঙনের সৃষ্টি হয়ে বাড়িঘর ও আবাদি জমি নদীতে চলে যায়। সম্প্রতি ডিডিআইআরডব্লিউএসপি প্রকল্পের আওতায় ১ কোটি ২৫ লাখ ৩২ হাজার ৪৬২ টাকা ব্যয়ে আদাজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কোদালিয়া পাড়া সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ চলছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তাপস ট্রেডার্স ১১০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে এ রাস্তায় ১৪ লাখ ২৩ হাজার টাকা ব্যয়ে তিনশ পনেরো মিটার প্যালাসাইটিং এবং ১৩ লাখ ৪৭ হাজার ৪৫২ টাকা ব্যয়ে মাটি ভরাটের কাজ করছে। ছাত্রলীগের স্থানীয় একাধিক নেতা ঝিনাই নদীতে বাংলা ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করে ওই প্রকল্পে সরবরাহ করছেন। এ বিষয়ে কয়েক দিন ধরে স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক সরেজমিনে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। এ খবর পেয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা মুদি দোকানি মামুনের ওপর হামলা চালায়।
হামলার বিষয়ে বক্তব্য জানতে কাঞ্চনপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সম্পাদক মো. সুমন মিয়ার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে বাসাইল উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি কামরান খান বিপুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে তা সত্য হলে আমরা দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
ঝিনাই নদী থেকে অবৈধভাবে উত্তোলন করা বালু প্রকল্পের কাজে ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তাপস ট্রেডার্সের প্রতিনিধি ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক নাহিদ হোসেন মীম রাস্তার কাজ করছেন, আপনি ওনার বক্তব্য নেন।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ছাত্রলীগ নেতা নাহিদ হোসেন মীম বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আমি ড্রেজার চালিয়ে দিয়ে এলাকার স্বার্থে সহযোগিতা করছি। এজন্য আমি ওই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কোনোপ্রকার অর্থনৈতিক সুবিধা পাই না।’
তবে সড়ক প্রশস্তকরণের ওই কাজে বালু ফেলার জন্য আলাদা করে অর্থ বরাদ্দ আছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী মো. আবদুল জলিল। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাইড বাই সাইড মাটির কাজ ধরা আছে। বালু ফেলার জন্যও অর্থ বরাদ্দ ধরা আছে। ড্রেজার ব্যবহার করে বালি ফেললে এর দায়ভার ঠিকাদারকেই নিতে হবে। আমরা ড্রেজার ব্যবহারের বিপক্ষে।’
যুবকের ওপর হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে বাসাইল থানার ওসি হারুনুর রশিদ বলেন, ‘কাঞ্চনপুরে ওই যুবকের ওপর হামলার বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্তাধীন।’
নদী থেকে প্রকাশ্যে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন রোধে পদক্ষেপের ব্যাপারে জানতে চাইলে বাসাইলের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদা পারভীন বলেন, ‘ড্রেজার বন্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। স্পটে গিয়ে ড্রেজার পেলেই আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
