করোনার প্রথম বছরের শাখা সম্প্রসারণ বড় ধরনের ধাক্কা খেলেও দ্বিতীয় বছরে তা কিছুটা কাটিয়ে উঠেছে ব্যাংকগুলো। তারপরও করোনাপূর্ববর্তী সময়ের মতো ব্যাংক শাখা খোলা এখনো শুরু হয়নি। তবে এজেন্ট ব্যাংকিং, উপশাখা, মোবাইল ব্যাংকিং, অটোমেটেড টেলার মেশিন (এটিএম) বুথ, বিক্রয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) মেশিন, ক্যাশ রিসাইকেলার মেশিন (সিআরএম) ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে ব্যাংকের গ্রাহকের লেনদেন বাড়ায় তথ্য জানান দিচ্ছে শাখায় না গিয়েও তারা ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ করা পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২১ সালে দেশের ব্যাংকগুলো ২৬৮টি নতুন শাখা খুলতে সক্ষম হয়েছে। এর আগের বছর অর্থাৎ করোনার প্রথম বছরে (২০২০ সালে) নতুন শাখা খোলা হয় ১০৩টি। অথচ করোনার আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে ব্যাংকগুলো মোট শাখা খুলেছিল ২৮৭টি।
তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ৬১টি ব্যাংকের শাখার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯৩৯টিতে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকের শাখার সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৬৭১টি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকের শাখার সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৫৬৮টি।
অর্থাৎ করোনা মহামারীর মধ্যে ব্যাংকগুলোর শাখা সম্প্রসারণ কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে এই সময়ে অনলাইন লেনদেনে আগ্রহ বাড়ায় ব্যাংকগুলো এজেন্ট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কার্ড লেনদেনে মনোযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি শাখার খরচ কমাতে উপশাখা বাড়ানোর বিষয়েও জোর দিয়েছে।
আলোচিত বছরে এটিএম বুথ, পিওএস মেশিন, সিআরএম ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে ব্যাংক গ্রাহকরা মোট ২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা লেনদেন করেন। ২০২০ সালে এই চারটি বিকল্প ডেলিভারি চ্যানেলে ব্যাংকের গ্রাহকরা লেনদেন করেন ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ গত বছর এই চারটি প্ল্যাটফর্মে ব্যাংকের লেনদেন বেড়েছে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা।
প্রাপ্ত তথ্যে আরও দেখা যায়, ২০২১ সালে ব্যাংকের গ্রাহকরা ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে লেনদেন করেছেন ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। ২০২০ সালে ইন্টারনেট ব্যাংকিং লেনদেন ছিল ৭৯ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। সেই হিসেবে আলোচিত বছরে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের লেনদেন বেড়েছে ৭৭ হাজার কোটি টাকা।
আলোচিত বছরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ৭ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা লেনদেন করেছেন গ্রাহকরা। ২০২০ সালে এই লেনদেন ছিল ৫ লাখ ৬১ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। সেই হিসেবে ১ বছরে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার লেনদেন বেড়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২১ সালে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ৪ লাখ ৬০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এর আগের বছর এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের লেনদেন ছিল ২ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসেবে আলোচিত বছরে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে লেনদেন বেড়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে মাত্র একটি ছাড়া সব ব্যাংক শাখাই পুরোপুরি অনলাইনে চলে এসেছে। ফলে করোনায় ব্যাংকের শাখা সম্প্রসারণ বিগত বছরগুলোর তুলনায় কিছুটা কম থাকলেও গ্রাহকরা লেনদেনে পিছিয়ে নেই। তারা আগে যেসব লেনদেনের জন্য ব্যাংক শাখায় আসতেন, এখন সেসব খুচরা অনেক লেনদেন তারা ঘরে বসেই করছেন। বা এজেন্ট ব্যাংকিং বা উপশাখা থেকেও ব্যাংকিং সেবা নিচ্ছেন গ্রাহকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোর এটিএম বুথ বেড়ে হয়েছে ১২ হাজার ৮৩১টি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে এটিএম বুথ ছিল ১১ হাজার ৯২৩টি। আলোচিত বছরে পিওএস মেশিন বেড়েছে ১৮ হাজার ৮৫৭টি। সিআরএম বেড়েছে ৪২০টি। সিডিএম বেড়েছে ১৭১টি।
ফলে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকের গ্রাহকদের ডিজিটাল লেনদেনের এই আগ্রহকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে শাখা খোলার গতি অনেক বেড়েছে। যদিও করোনাপূর্ববর্তী সময়ে শাখা সম্প্রসারণের গতি আরও বেশি ছিল। তারপরও বর্তমানে যেহেতু ব্যাংকের উপশাখা এবং এজেন্ট পয়েন্ট থেকে অনেক ধরনের সেবা পাওয়া যাচ্ছে, সেহেতু শাখার বিকল্প দাঁড়িয়ে গেছে। ফলে আগের মতোই যে শাখা বাড়াতে হবে তারও আর প্রয়োজন নেই। তাছাড়া সব ব্যাংকের ব্যবসা একরকম নয়। ফলে সব ব্যাংকের শাখা হয়তো একই হারে বাড়বেও না।’
