বিধিবহির্ভূত নিয়োগে ১৬ বছর ধরে মাদ্রাসা অধ্যক্ষ!

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০২:১৪ এএম

পটুয়াখালীর দুমকী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে বিধিবহির্ভূত নিয়োগে ১৬ বছর ধরে চাকরি করার অভিযোগ উঠেছে। একই প্রতিষ্ঠানের আরও তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তথ্য গোপন রেখে বেতন স্কেল পরিবর্তন/পদোন্নতির অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে কমপক্ষে সোয়া কোটি টাকা লোপাটের তথ্য মিলেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ও তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে এসব গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়। কয়েক বছর আগের ওই প্রতিবেদনে চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হলেও অভিযুক্তরা নিয়োগসংক্রান্ত এসব অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা তদবির করে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিলেন বলে জানিয়েছেন মাদ্রাসাটির পরিচালনা পর্ষদের (গভর্নিং বডি) একাধিক সদস্য।

এদিকে সম্প্রতি ওই অডিট রিপোর্টটি এলাকায় প্রকাশ হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজের অপরাধ ঢাকতে ও চাকরি বাঁচাতে সংশ্লিষ্ট নানা মহলে জোর তদবির চালানোর পাশাপাশি অধ্যক্ষ তড়িঘড়ি করে নিজের অনুগতদের সমন্বয়ে মাদ্রাসার নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনে তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষা পরিদর্শক ভবেন্দ্র নাথ বাড়ৈ ও সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক রফিকুল হাসানের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দুমকী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে গুরুতর সব অভিযোগ তোলা হয়। মন্ত্রণালয়ের এই অডিট টিমটি ২০১৫ সালের ৫ মে দুমকী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা পরিদর্শন ও নিরীক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করলেও তাদের জমা দেওয়া প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালের ২৭ জুন। এর আগে একই বছরের ২১ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক আহম্মেদ সাজ্জাদ রশীদ স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং দুমকী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতিকে চার শিক্ষকের বিষয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।

ওই নিরীক্ষা প্রতিবেদনের প্রশাসনিক মন্তব্য ও সুপারিশে বলা হয়, প্রাক্তন অধ্যক্ষ মো. আ. হাকিমের জন্মতারিখ ভুল থাকায় তার নাম এমপিও থেকে কর্তন হলে অধ্যক্ষ মো. সাইদুর রহমান নিয়োগ পেয়ে ২০০৪ সালের ২০ ডিসেম্বর অধ্যক্ষ পদে যোগ দেন। পরে প্রাক্তন অধ্যক্ষ আ. হাকিম তার জন্মতারিখ সংশোধন করে ফের ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে পুনর্বহাল হন এবং ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কর্মরত থেকে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে মো. সাইদুর রহমান অধ্যক্ষ পদে যোগদানের তারিখ থেকে তার পূর্ব পদে অর্থাৎ সহকারী অধ্যাপক পদে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন, যা বিধিসম্মত নয়। অধ্যক্ষ আ. হাকিম স্বপদে ফিরে আসায় সাইদুর রহমানের অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ বহাল রাখাও বিধিসম্মত নয়। তাকে (সাইদুর রহমান) অধ্যক্ষ পদে পুনরায় কোনো নিয়োগও দেওয়া হয়নি। এ কারণে সহকারী অধ্যাপকের স্কেলে ২ বছরে ১ লাখ ৮৩ হাজার ১৩৯.৭৪ টাকা এবং অধ্যক্ষ পদে ১৫ বছরের বেতন-ভাতার প্রায় এক কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরৎযোগ্য।

অন্যদিকে সহকারী শিক্ষক মো. নাসির উদ্দিন এই মাদ্রাসায় ২০০৮ সালের পহেলা মার্চ যোগ দেন এবং তার আগে অন্য একটি বিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় ১৯৯৯ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি ২৫৫০ টাকা স্কেলে এমপিওভুক্ত হন। তিনি বিএসসি পাস বলে জানালেও কোনো সনদ দেখাতে পারেননি। তার বিএড প্রশিক্ষণও নেই। ১৯৯৯ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ বছর পর ২০০৭ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি তার ৫১০০ টাকার টাইমস্কেল প্রাপ্য। এর বাইরে অন্যকোনো উচ্চতর স্কেল তার প্রাপ্য নয়। ২০০১ সালের পহেলা জুন থেকে ৩৪০০ টাকা এবং ২০০৯ সালের পহেলা জুন থেকে ৬৮০০ টাকা স্কেলে বেতন-ভাতা গ্রহণ করায় ২০১৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত তার অতিরিক্ত নেওয়া ১১ লাখ ২ হাজার ৪৪৪.৫০ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরৎযোগ্য। তিনি ৬৮০০ টাকা স্কেলে সরকারি বেতন-ভাতা পাবেন না। একইভাবে প্রভাষক মো. দ্বীন ইসলামের ১৫ লাখ ৩৫ হাজার ৭৭০ এবং কম্পিউটার শিক্ষক মো. ফারুক হোসেনের ১২ লাখ ২৫ হাজার ৫৩৫ টাকা ফেরতযোগ্য।

চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দুমকী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার গভর্নিং বডির অন্যতম সদস্য মো. হারুন অর রশিদ মৃধা বলেন, ‘গভর্নিং বডির মেয়াদকালের কোনো সভাতেই এসব অনিয়ম-অসঙ্গতি কিংবা অডিট রিপোর্টের আপত্তি নিষ্পত্তির বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়নি। অধ্যক্ষ বরাবরই গোপনীয়তার আশ্রয়ে সকল অনিয়ম-দুর্নীতি ধামাচাপা দিয়ে আসছেন।’

আর মাদ্রাসাটির গভর্নিং বডির সাবেক সভাপতি মো. সুলতান আহম্মেদ হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘অধ্যক্ষ নিজের খেয়ালখুশি মতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছেন। কোনো সভায়ই অডিট রিপোর্ট উপস্থাপন করা হয়নি। অডিট রিপোর্ট গোপন রেখে পার পাওয়ার চেষ্টা করে আসছেন তিনি।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দুমকী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. সাইদুর রহমান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের অডিটের সত্যতা স্বীকার করলেও সেই প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের অডিট টিম মহলবিশেষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করে থাকতে পারে। আমার প্রতিষ্ঠানে কোনো অনিয়ম নেই এবং কখনো হয়নি।’ তবে নিজের বিধিবহির্ভূত নিয়োগ এবং অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত