দুদক কর্মকর্তার অপসারণ নিয়ে প্রশ্ন, প্রতিবাদ

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০২:২০ এএম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পটুয়াখালী জেলা কার্যালয়ে কর্মরত উপসহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দীনকে হঠাৎ করে চাকরিচ্যুত করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে মনে করছেন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে দুর্নীতিবাজদের লাগাম টেনে ধরায়, তাদের বিরুদ্ধে মামলায় করা এই সাহসী কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিষয়টিকে অসাংবিধানিক আখ্যায়িত করে ওই কর্মকর্তাকে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন।

রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দেওয়া এবং ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করাসহ অনিয়মের বিভিন্ন ঘটনার তদন্ত করে আলোচনায় আসেন শরীফ। ‘হত্যা ও চাকরি খাওয়ার হুমকি’ পাওয়ার কথা জানিয়ে চট্টগ্রামের খুলশী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন তিনি। তার ১৬ দিনের মাথায় গত বুধবার দুদক কার্যালয় থেকে তাকে চাকরি থেকে অপসারণের প্রজ্ঞাপন জারি হয়।

দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (কর্মচারী) বিধিমালা, ২০০৮-এর বিধি ৫৪(২)-তে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে মো. শরীফ উদ্দীন, উপসহকারী পরিচালক, দুদক, সমন্বিত জেলা কার্যক্রম, পটুয়াখালীকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হলো। তিনি বিধি মোতাবেক ৯০ দিনের বেতন এবং প্রযোজ্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন।’ এই আদেশ ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার পর রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে শরীফ উদ্দিনকে অপসারণের আদেশ বাতিলের দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছেন দুদক কর্মকর্তারা। একই দাবিতে তারা দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধনও করেছেন। কার্যালয়ের শতাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশ নেন। তা ছাড়া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তার চাকরিচ্যুত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

জানতে চাইলে দুদক সচিব মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘উপসহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দীনের বিরুদ্ধে তিনটি বিভাগীয় মামলা চলছে। আরও কয়েকটি বিভাগীয় মামলা প্রক্রিয়াধীন। তার কারণে দুদকের সম্মানহানি হচ্ছিল। এ কারণে বিধি অনুযায়ী তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।’ তবে শরীফের বিরুদ্ধে কী অভিযোগে বিভাগীয় মামলা চলছে সে বিষয়ে দুদক সচিব স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।

দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে দুদক কর্মচারী বিধিমালার যে ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে, তার কার্যকারিতার বিষয়টি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। ওই ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই বিধিমালায় ভিন্নরূপ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, উপযুক্ত কর্র্তৃপক্ষ কোনো কারণ না দর্শাইয়া কোনও কর্মচারীকে নব্বই দিনের নোটিশ প্রদান করে অথবা নব্বই দিনের বেতন পরিশোধ করেই তাকে চাকরি হইতে অপসারণ করিতে পারিবে।’ অন্যদিকে সংবিধানের ১৩৫(২) নম্বর অনুচ্ছেদে লেখা আছে ‘অনুরূপ পদে (প্রজাতন্ত্রের অসামরিক পদে) নিযুক্ত কোনও ব্যক্তিকে তাহার সম্পর্কে প্রস্তাবিত কোনও ব্যবস্থা গ্রহণের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর যুক্তিসংগত সুযোগদান না করা পর্যন্ত তাহাকে বরখাস্ত, অপসারিত বা পদাবনতি করা যাবে না।’

দুদক সূত্র জানায়, দুর্নীতি দমন কমিশন কর্মচারী (চাকরি) বিধিমালা, ২০০৮-এর ৫৪ বিধিটি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন নম্বর ১৪২৪/২০১১ করা হলে ২০১১ সালের ১৭ অক্টোবর হাইকোর্ট বিভাগ দুদক চাকরি বিধিমালার ৫৪ বিধিকে অসাংবিধানিক হিসেবে ঘোষণা করে। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে আপিল আদালত ২০১৬ সালের ১০ নভেম্বর আপিল খারিজ করে হাইকোর্ট বিভাগের ৫৪ বিধি অসাংবিধানিক ঘোষণাটি বহাল রাখে। এর বিপরীতে কমিশন আপিল বিভাগের ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৩২/২০১৭ সিভিল রিভিশন করলে একতরফা (রিটকারীর প্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে) শুনানি করে গত বছরের ২৮ নভেম্বর হাইকোর্টের আদেশটি স্থগিত করে। বিষয়টি এখনো উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে বিচারাধীন।

দুদকের মধ্যমসারির একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এভাবে একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাকে আকস্মিক চাকরি থেকে অপসারণ করায় দুদক দুর্নীতিবাজদের সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা করছে বলে সাধারণ মানুষ মনে করতে পারে। যদি উপসহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দীনের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তবে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে তার শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। এ কারণে দুদকের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীই কাজের প্রতি স্পৃহা হারিয়ে ফেলতে পারেন।

দুর্নীতিবিরোধী আলোচিত যত অভিযান : শরীফ উদ্দিনের সহকর্মীরা বলেছেন, তিনি দীর্ঘদিন দুদকের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। তিনি দক্ষ ও পরিশ্রমী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তিনি চট্টগ্রাম অফিসে কর্মরত থাকাকালে ৫২টি মামলা করেন। দুদকের প্রতিটি মামলার আগে বাদী প্রাথমিক ইনকোয়ারি বা অনুসন্ধান করে ঘটনার সত্যতা পেলে মামলার জন্য কমিশন বরাবর প্রতিবেদন পাঠান। পরে কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে মামলা করা হয়। উপসহকারী পরিচালক শরীফ নিজেই তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে ১৫টি মামলার তদন্ত শেষ করে বিচারের জন্য আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছেন।

অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার ঘটনায় সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির বড় ছেলে আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির সদস্য মো. মুজিবুর রহমান, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. সারওয়ার হোসেন, সাবেক ব্যবস্থাপক মো. মজিবুর রহমান, সাবেক মহাব্যবস্থাপক মো. আলী চৌধুরী, সার্ভেয়ার মো. দিদারুল আলমের বিরুদ্ধে মামলা করে আলোচনায় আসেন শরীফ উদ্দিন। এই মামলায় এরই মধ্যে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. সারওয়ার হোসেন, সাবেক কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান ও সার্ভেয়ার মো. দিদারুল আলমকে গ্রেপ্তার করেছে দুদক।

তা ছাড়া চট্টগ্রাম দুদক কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে ২০২১ সালের ১৬ জুন ভোটার তালিকায় রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের পরিচালকসহ ইসির চার কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করেন শরীফ উদ্দিন। একই বছর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হাইওয়ে সংলগ্ন কলাতলী বাইপাস রোড এলাকায় পিবিআই কার্যালয় তৈরির জন্য এক একর জমি অধিগ্রহণে জালিয়াতির ঘটনা উঠে আসে শরীফ উদ্দিনের তদন্তে।

শরীফ কক্সবাজারের আলোচিত ভূমি অধিগ্রহণের নামে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এ কারণে বিভিন্ন পক্ষ তাকে বিভিন্ন সময় নানাভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রাণনাশের হুমকি ও ‘চাকরি খাওয়ার’ হুমকিও দিয়েছেন।

কক্সবাজারের মেগা প্রকল্পগুলোর জমি অধিগ্রহণের দুর্নীতিতে জড়িত বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে মামলাও করেন তিনি। এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসহ স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে নামে দুদক। পরে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার ও বেশ কটি মামলা করেছিলেন শরীফ উদ্দিন।

গত বছরের ১৬ জুন দুদক পরিচালক মুহাম্মদ মনিরুল ইসলামের সই করা এক অফিস আদেশে শরীফ উদ্দিনকে চট্টগ্রাম থেকে পটুয়াখালীতে বদলি করা হয়।

শরীফ উদ্দিনের জিডি : গত ৩০ জানুয়ারি দুদক কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিন চট্টগ্রামের খুলশী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন, যার নম্বর ১৬৪৫। জিডিতে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জীবননাশের শঙ্কায় রয়েছেন জানিয়ে তিনি নিরাপত্তা চেয়েছেন।

টিআইবির প্রশ্ন : প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের চাপের কারণেই শরীফ উদ্দিনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে কি না সেই প্রশ্ন তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এ নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা দূর করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি জানানো হয়।

টিআইবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চট্টগ্রামে কর্মরত অবস্থায় দক্ষতা ও সাহসের সঙ্গে কক্সবাজারে ভূমি অধিগ্রহণে বিশাল অঙ্কের দুর্নীতি, রোহিঙ্গা নাগরিকদের এনআইডি ও পাসপোর্ট জালিয়াতি, কর্ণফুলী গ্যাসে অনিয়মসহ বেশ কিছু আলোচিত দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ও মামলা পরিচালনায় মূল ভূমিকায় ছিলেন শরীফ উদ্দিন। এসব অভিযান ও মামলায় সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মধ্যে যাদের বিরাগভাজন হচ্ছিলেন এই কর্মকর্তা, তাদের চাপের কারণেই কি তাকে চট্টগ্রাম থেকে পটুয়াখালী বদলি করা এবং সবশেষ চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এমন প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠেছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদক কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিন সোচ্চার ছিলেন। তিনি একজন সাহসী অফিসার। আপস করেননি বলেই তিনি দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের রোষানলের শিকার হয়েছেন, যা কাম্য নয়। আমরা চাই এর সুষ্ঠু তদন্ত।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত