গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে চাকরি ও শেয়ার দেওয়ার (মালিকানার অংশ) নামে প্রায় আড়াইশ’ যুবকের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। সাইনবোর্ড সর্বস্ব ওই প্রতিষ্ঠানটির নাম এটিএক্স সোলার এনার্জি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি চাকরি ও শেয়ার দেওয়ার নামে একেকজনের কাছ থেকে সর্বনিম্ন দেড় লাখ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২৮ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে কার্যালয় গুটিয়ে পালিয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। এসব যুবকের কেউ সুদের ওপর দেনা করে আবার কেউবা গরু-ছাগল-জমি বিক্রি করে চাকরির জন্য টাকা দিয়েছেন। অনেকে আবার বাড়ির পাশে চাকরির আশায় অন্য চাকরি ছেড়ে দিয়ে এসে বিপদে পড়েছেন। টাকা ফেরতের জন্য পাওনাদারদের চাপের মুখে রয়েছেন তারা। গাইবান্ধা, রংপুর, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি জেলার এসব চাকরিপ্রত্যাশী এখন সবমিলিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে।
এটিএক্স সোলার এনার্জি লিমিটেড চাকরির আশায় সুদে টাকা ধার করে দিয়েছিলেন গোবিন্দগঞ্জের হরিরামপুর ইউনিয়নের হরিরামপুর গ্রামের আখতারুল ইসলাম। টাকা ফেরতের জন্য পাওনাদারদের চাপের মুখে থাকা এই যুবক গত ২৬ জানুয়ারি গোবিন্দগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও পুলিশ এখনো তার অভিযোগ মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করেনি।
লিখিত অভিযোগে আখতারুল ইসলাম জানান, ঢাকার কাকরাইলের ইস্টার্ন কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সের নবম তলায় এটিএক্স সোলার এনার্জি লিমিটেডের কার্যালয় রয়েছে। ২০২০ সালের নভেম্বরে গোবিন্দগঞ্জের হরিরামপুর ইউনিয়নের বার্নিতলা এলাকায় কথিত শাখা কার্যালয় স্থাপন করে প্রতিষ্ঠানটি। এই শাখা কার্যালয়ের মাধ্যমে একটি সোলার প্ল্যান্ট স্থাপন করা হবে এবং এর জন্য জনবল প্রয়োজন উল্লেখ করে এলাকায় প্রচারণা চালানো হয়। আর কথিত ওই সোলার প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য গোবিন্দগঞ্জের রাখালবুরুজ ইউনিয়নের রাখালবুরুজ খামারপাড়া গ্রামের আবদুল বাকী সরকারের ছেলে আজাহার আলী সরকারকে (৬১) জমিদাতা হিসেবে দেখানো হয়। আজাহার আলী সরকারের ছেলে মো. খালেকুজ্জামান মাসুদ (৩৮) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), মো. জাহিদ হাসান ওরফে সোহেল (৩৩) সদস্য, মো. রিয়াদ হাসান (৩০) সদস্য, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে বাদশা (৪২) জিএম, একই ইউনিয়নের সরকারপাড়া গ্রামের ওছমান সরকারের ছেলে শামীম সরকার (৪৫) এজিএম, আমিরুল ইসলামের ছেলে শিহাব সরকার (৩৩) অফিস সহায়ক এবং মিয়াপাড়া গ্রামের মোফাজ্জল হোসেনের ছেলে সাদা মিয়া (৪৭) অফিস সহায়ক হিসেবে এটিএক্সে কর্মরত ছিলেন। তারা প্রত্যেকে প্রত্যেকের নিকটাত্মীয় (আপন ভাই, চাচা ও মামা)।
আখতারুল তার অভিযোগে বলেন, ‘বেকার যুবকদের মোটা অঙ্কের বেতন-ভাতা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে চাকরি দেওয়ার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। জুনিয়র অ্যাক্সিকিউটিভ (অ্যাডমিন) পদে আমাকে নিয়োগ দিয়ে পাঁচ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন তারা। ২০২০ সালের ৬ ডিসেম্বর আমি যোগদানের পর তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড দেখে সন্দেহ হলে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজখবর নিয়ে বুঝতে পারি যে, এটি একটি ভুয়া কার্যালয়। তখন তাদের কাছে টাকা চাইলে তারা ফেরত দেওয়ার কথা বলে কালক্ষেপণ করে। ততক্ষণে তাদের প্রতারণার কথা এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে ২০২১ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে কার্যালয় গুটিয়ে নিয়ে এক রাতে তারা পালিয়ে যায়। পরে তাদের মোবাইল ফোনে কল করলে বন্ধ পাওয়া যায়।’
চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভার বুজরুক বোয়ালিয়া শিল্পপাড়া এলাকায় আজাহার আলী সরকারের বাড়িতে গিয়ে চাকরির জন্য দেওয়া টাকা ফেরত চাইলে তিনি টাকা না দিয়ে উল্টো ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেন জানিয়ে আখতারুল বলেন, ‘পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের শরণাপন্ন হলে আজাহার আলী সরকার কয়েকবার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও দেননি। উপরন্তু তিনি আমার দুলাভাই মো. এনামুল হকের নামে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তুলে গত ১১ জানুয়ারি গোবিন্দগঞ্জ থানায় একটি জিডি করেন।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাইনবোর্ড সর্বস্ব এটিএক্স সোলার এনার্জি লিমিটেডের প্রতারণার বিষয়টি জানাজানি হলে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকরা কথা বলেন। তখন ইউএনও জানান, স্থানীয় সাংসদের একটি ডিও লেটার ছাড়া আর কিছুই দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। সেসময় তৎকালীন জেলা প্রশাসকও জানিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠানটি অবৈধ। তবে সেই ডিও লেটারে প্রাথমিক কাজ শুরু করার জন্য লেখা আছে বলে জানা গেছে।
কয়েকজন ভুক্তভোগী দেশ রূপান্তরকে জানান, কোচাশহর ইউনিয়নের এক কলেজ কর্মচারীর কাছ থেকে ১৪ লাখ, রাখালবুরুজের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের কাছ থেকে ১৮ লাখ এবং হরিরামপুরের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ২৮ লাখ টাকা নিয়েছে এটিএক্স।
আখতারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৮০ জনের মতো একসঙ্গেই চাকরি করেছি। এছাড়া যোগদানের অপেক্ষায় ছিল আরও অনেকে। সে হিসেবে প্রায় ২৫০ জনের কাছ থেকে তিন থেকে চার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এটিএক্স চক্রটি। এমডি মো. খালেকুজ্জামান মাসুদ ঢাকায় পলাতক রয়েছেন। বাদবাকি সবাই নিজ গ্রামে ও গোবিন্দগঞ্জ শহরে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাদের ধরছে না। টাকা উদ্ধার করে দিতে পারছে না। গত ১১ ফেব্রুয়ারি থানায় বসে আলোচনার পরও কোনো সমাধান মেলেনি।’
এ প্রসঙ্গে আখতারুলের দুলাভাই এনামুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘থানায় বসে আলোচনার সময় আজাহার আলী সরকার বলেন, “একজনকে টাকা দিলে সবাইকেই দিতে হবে, আমি এখন কয়জনকে টাকা দেব?” শ্যালকের টাকা উদ্ধারের জন্য চেষ্টা করায় আমার নামে মিথ্যা অভিযোগে জিডিও করেন তিনি। এখন গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা শহরে এটিএক্সের কার্যালয়টিও বন্ধ। সেখানে কেউ আর বসেন না।’
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কার্যালয় গুটিয়ে পালানো এটিএক্সের এমডি মো. খালেকুজ্জামান মাসুদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তার বাবা প্রকল্পের জমিদাতা আজাহার আলী সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খালেকুজ্জামানের বিরুদ্ধে যা ব্যবস্থা নেওয়ার ওরা নিক। এ কথা আমি তাদের জানিয়েছি। তার বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। কেননা তার সঙ্গে আমার দীর্ঘদিন থেকে যোগাযোগ নেই। এসব লেনদেনের সঙ্গে আমি ছিলামও না। লেনদেন হয়েছে কিনা সেটাও আমি জানি না।’
সার্বিক বিষয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি মো. ইজার উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাইনি। এমন ঘটনার কথা ঠিক মনে পড়ছে না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।’
