ঘুষ লেনদেনের মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বরখাস্ত হওয়া পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির ও পুলিশের বরখাস্তকৃত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানকে কারাদ- দিয়েছে আদালত।
এর মধ্যে বাছিরকে দুটি ধারায় ৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ঘুষ গ্রহণের দায়ে তিন বছর সাজা দেওয়া হয়েছে। আর অর্থ পাচারের দায়ে আরও ৫ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তাকে ৮০ লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সাজা দেওয়া হয়েছে। দুই ধারায় দেওয়া সাজা তার একত্রে চলবে। এজন্য তাকে ৫ বছর সাজা ভোগ করতে হবে। অন্যদিকে মিজানুর রহমানকে একটি ধারায় ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের দন্ড থেকে হাজতবাসের সময় বাদ যাবে।
গতকাল বুধবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এর বিচারক শেখ নাজমুল আলম এই রায় ঘোষণা করেন। রায় দেওয়ার পর সাজা পরোয়ানা দিয়ে বাছির ও মিজানকে কারাগারে পাঠানো হয়।
গতকাল বেলা ১১টা ১৩ মিনিটে বিচারক রায় পড়া শুরু করেন। ১০৯ পৃষ্ঠার রায় পড়ে ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে আদালত দণ্ড ঘোষণা করে।
এর আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক শেখ নাজমুল আলম রায় ঘোষণার জন্য ২৩ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেন।
২০১৯ সালের ১৬ জুলাই ৪০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে মিজান ও বাছিরের বিরুদ্ধে জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১ এ মামলাটি করেছিলেন দুদকের পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্যা। তিনি এই মামলা তদন্ত করেন। ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারি আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তিনি। ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ কে এম ইমরুল কায়েশ অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। গত বছরের ১৮ মার্চ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত।
যেভাবে বিচারের কাঠগড়ায় দুজন: ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার থাকাকালে বিয়ে গোপন করতে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করানোর অভিযোগ ওঠে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া এক সংবাদ পাঠিকাকে প্রাণনাশের হুমকি ও উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে মিজানুরের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) হয়। এরপর নারী নির্যাতনের অভিযোগে ২০১৯ সালের জানুয়ারির শুরুর দিকে তাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদরদপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। ওই বছরই ২৪ জুন সম্পদের তথ্য গোপন ও অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মিজানুরের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এ মামলার অনুসন্ধান কর্মকর্তা ছিলেন তৎকালীন দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির।
মামলার তদন্তকালে ডিআইজি মিজান অভিযোগ করেন, অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থেকে রেহাই দিতে এনামুল বাছির তার কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেন। এ অভিযোগ ওঠার পর এনামুল বাছিরকে সরিয়ে দুদকের আরেক পরিচালক মো. মঞ্জুর মোরশেদকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়।
ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে শেখ মো. ফানাফিল্যাকে প্রধান করে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় তিন সদস্যের একটি দলকে।
ঘুষের অভিযোগ ওঠার পর তাদের দুজনকেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। ২০২০ বছরের ২২ জুলাই বাছিরকে গ্রেপ্তার করে দুদকের একটি দল। আরেক মামলায় গ্রেপ্তার ডিআইজি মিজানকেও পরে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
গত বছর ১৮ মার্চ আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ হয়। এরপর শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ।
গত ২৩ ডিসেম্বর মামলাটিতে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত ১৭ সাক্ষীর মধ্যে ১২ জনের সাক্ষ্য শোনে আদালত।
দুদকে এমন বাছির আরও আছে: একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সাজার রায়ের পরও মিজানকে আদালতে দেখা গেছে খোশ মেজাজে। দুই আঙুল তুলে বিজয়ের চিহ্নও দেখান তিনি। মিজানের গায়ে ছিল সাদা চেক শার্টের ওপরে কোট, গলায় মাফলার। আর কালো-কমলা চেক শার্ট পরা বাছিরের মাথায় ছিল টুপি। তার পকেটে একটি কলমও দেখা যায়।
রায় ঘোষণার পর এজলাস থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় হাস্যোজ্জ্বল মিজান বলেন, “এনামুল বাছির তাকে ঘুষ দিতে ‘বাধ্য করেছিলেন’। দুদকে বাছির একজন না, আরও বাছির আছে। তাদের খুঁজে বের করুন।”
মিজান আরও বলেন, তার বিচারে ‘ভালো রায়’ হয়েছে। এতে প্রমাণ হয়েছে যে, তিনি যা বলেছেন, সেটা সঠিক। তবে যেহেতু এটা ‘মান-সম্মানের’ বিষয়, আর ঘুষ যেহেতু ‘স্বেচ্ছায় দেননি’, সেহেতু তিনি উচ্চ আদালতে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।
রায়ের পর কাঠগড়া থেকে আইনজীবীদের কাছে চলে যান মিজান। নির্ভার চেহারায় তাকে বিস্কুট আর পানি খেতে দেখা যায়। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে কথাও বলেন তিনি।
আরেক আসামি এনামুল বাছিরকেও এজলাসে কেক খেতে দেখা যায়। রায়ের পর তিনিও পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। তিনিও এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা বলেছেন।
