চলমান ইউক্রেন উত্তেজনায় যুদ্ধ ঠেকাতে চায় সবাই। যুদ্ধ এড়াতে চলছে দেনদরবার। বিশ্ব মোড়লরা এই উত্তেজনার মূল সূত্রধর যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা ও বৈঠক করছে।
এদিকে রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায়ের জন্য তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব দেশের সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা চলমান পরিস্থিতি তুলে ধরে এ ইস্যুতে বাংলাদেশের সমর্থন চেয়েছে।
বাংলাদেশ এই ইস্যুতে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ এই নীতির কথা জানিয়েছে। বাংলাদেশ জানিয়েছে, উভয়েই বাংলাদেশের বন্ধুদেশ। এ ইস্যুতে বাংলাদেশ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রত্যাশা করে।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউক্রেন ইস্যু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে রেখেছে বাংলাদেশ। কোনো ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ও সংঘাতের সৃষ্টি হয়, এমন কিছুকে সমর্থন করে না বাংলাদেশ। ইউক্রেন ইস্যুতে আমরা কারও পক্ষে-বিপক্ষে যেতে পারি না। কারণ সব দেশই আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র। নীতিগতভাবেই এটি আমাদের অবস্থান। আমরা আশা করছি, কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুই পক্ষ আলোচনা করে শান্তিপূর্ণ একটি সমাধানে পৌঁছাবে। এ নিয়ে সংঘাত হলে এর প্রভাব বাংলাদেশসহ সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন গত শুক্রবার জার্মানিতে শুরু হওয়া ‘৫৮তম মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন’-এ বলেন, ইউক্রেন ইস্যুতে বাধাগ্রস্ত হতে পারে জলবায়ুর বৈশি^ক অর্থায়ন। কারণ ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিরতার দিকে এগোচ্ছে। এমনটা হতে চললে জলবায়ুর ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য উন্নত দেশগুলো অর্থায়নে তাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেটি ব্যাহত হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেন ইস্যুতে ভূরাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। রাশিয়া পূর্ব ইউক্রেনের রুশপন্থি দুটি বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলকে স্বাধীন হিসেবে ঘোষণার পর মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে জ¦ালানি তেলের মূল্য গত সাত বছরের মধ্যে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ ডলার ছুঁয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ইউক্রেনে হামলা চালালে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তা রাশিয়ার পাশাপাশি তৃতীয় দেশের ওপরও প্রভাব ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্রের এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক থাকা দেশগুলোর ওপরও যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে বা যে দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার ব্যবসাসহ নানা ধরনের সংযোগ রয়েছে, সেই দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র অসন্তুষ্ট থাকবে। বাংলাদেশও এর থেকে বাদ যাবে না।
তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার সুসম্পর্ক থাকার পাশাপাশি দেশে মেগা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তারা। আবার রাশিয়ার ওপর যখন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দেবে, তখন রাশিয়াও তাদের প্রতি একই পদক্ষেপ নেবে এবং রাশিয়াও চাইবে না যে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভালো সম্পর্ক থাকুক। তখনো বাংলাদেশ বিপদে পড়বে। ইউক্রেন ইস্যু যত চরমে পৌঁছাবে বিশ্বরাজনীতিও ততটা চরমে পৌঁছাবে। তখন অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে দেশের স্বার্থ আদায় করা খুব কঠিন হবে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধে বাংলাদেশ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে আমদানি-রপ্তানি নিয়ে তৈরি হবে জটিলতা; বিশেষ করে এই উত্তজনায় রাশিয়ার জ¦ালানি তেলের পাইপলাইন বন্ধ করে দেওয়ার যে আলোচনা জোরালো হচ্ছে তাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাশিয়া জ্বালানি পাইপলাইন বন্ধ করে দিলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে চড়া দামে তেল কিনতে হবে বাংলাদেশকে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, চলমান ইউক্রেন পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ। কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে এই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় ঢাকা। বাংলাদেশ বিশ্বাস করে এই অঞ্চলের সংকট শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন একটি শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান হতে পারে। তাই সংলাপ ও সহযোগিতার চেতনাকে সমুন্নত রেখে এই সংকট নিরসনে সব পক্ষকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পক্ষেই বাংলাদেশের অবস্থান।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, যুদ্ধ বাধলে বাংলাদেশসহ দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে। রাশিয়া জ¦ালানি পাইপলাইন বন্ধ করলে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বিকল্প জ¦ালানির উৎস বের করতে হবে। ইউরোপ যদি মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সংগ্রহ করে তাতে জ¦ালানি সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ¦ালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়বে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাশিয়া পূর্ব ইউক্রেনের রুশপন্থি দুটি বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলকে স্বাধীন হিসেবে ঘোষণার পর এখন শান্তিপূর্ণভাবে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পথ অনেকটাই কমে গেছে। বিশ্বরাজনীতি অনেক জটিল হচ্ছে। এই উত্তেজনার ফলে বিশ্ব অর্থনীতি যে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে যাচ্ছে তার আঘাত বাংলাদেশের ওপরও আসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, রাশিয়া ও ইউরোপ-আমেরিকা উভয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ বাধলে বাংলাদেশ নিরপেক্ষ থাকলে উভয় পক্ষই অসন্তুষ্ট হতে পারে, তখন আরও বড় বিপদ আসতে পারে। আবার এক পক্ষ নিলে আরেক পক্ষ অসন্তুষ্ট হবে। আবার কোনো এক পক্ষ নিলেও ভবিষ্যতে তা কীভাবে সমন্বয় করা হবে তা আগেভাগেই ভাবতে হবে। এ বিষয়টি খুবই জটিল।
এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিও ইউক্রেন সংকটে বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বর্তমানে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে রাশিয়ায় ৬৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। একই সময়ে দেশটি থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে ৪৬ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের পণ্য।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন সমস্যা ও শুল্ক জটিলতা না থাকলে উভয় দেশের বাণিজ্য আরও বাড়ত। দেশটিতে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের ভালো চাহিদা রয়েছে। কিছু জটিলতার কারণে অন্য দেশের মাধ্যমে রাশিয়ায় তৈরি পোশাক রপ্তানি করতে হচ্ছে। এগুলো সমাধানেরও চেষ্টা চলছে।
২০১৫ সালে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া দখল করার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। এরপর থেকে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সরাসরি ব্যাংকিং সুবিধা বন্ধ আছে। বর্তমানে রাশিয়ায় ব্যবসা করা গ্লোবাল ব্র্যান্ডগুলো হংকং ও সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশের আমদানি মূল্য পরিশোধ করছে। বাংলাদেশের জন্য রাশিয়ার বাজারকে বেশ সম্ভাবনাময় উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ থেকে মাছ, সবজি, আলু ও ফলমূল নেওয়ার বিষয়ে রাশিয়ার সঙ্গে অলোচনা হয়।
