পাহাড়ে চাঁদাবাজি খুনোখুনিতে হাজারের বেশি অস্ত্রধারী

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০২:৩৮ এএম

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, যা শান্তিচুক্তি হিসেবে পরিচিত সেটাও পাহাড়ের তিন জেলায় শান্তি ফেরাতে পারেনি। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখনো তৎপর। তাদের বেপরোয়া চাঁদাবাজি এবং সে কারণে এলাকার দখল নিয়ে হানাহানি চলছে। বলতে গেলে অস্ত্রধারীদের হাতে জিম্মি পার্বত্য এলাকা। সম্প্রতি পুলিশের একটি গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পার্বত্য এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে পাঁচটি গ্রুপের অন্তত সহস্রাধিক সদস্য। তাদের হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্র।

অস্ত্রধারী গোষ্ঠীগুলোর চাঁদাবাজি, নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে সংঘর্ষ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর হামলার বিষয়ও উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে। সম্প্রতি বান্দরবানে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন এক সেনাসদস্য।

পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট পাহাড়ের সন্ত্রাসীদের বর্তমান তৎপরতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ওই প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে অস্ত্রধারী গ্রুপগুলোর বিষয়ে বিশদ তথ্য এসেছে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি নিয়ে গত মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরে আলাদা আলাদা বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি জেলার পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। পার্বত্য এলাকায় শিগগির বিশেষ অভিযান চালানো হবে।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাহাড়ি অঞ্চলের সন্ত্রাসীদের ধরতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কাজ করছে।

পাহাড়ে চাঁদাবাজি খুনাখুনিতে হাজারের বেশি অস্ত্রধারী ইতিমধ্যে সন্ত্রাসীদের একটি তালিকা করা হয়েছে। দেশের শান্ত পরিবেশকে কেউ অশান্ত করার চেষ্টা করলে তাদের কঠোরভাবে দমন করা হবে। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে যেসব অস্ত্রধারী গোষ্ঠী সক্রিয় আছে সেগুলো মূলত আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (সন্তু লারমা গ্রুপ), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ, প্রসিত গ্রুপ), পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা, সংস্কার গ্রুপ), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট-ইউপিডিএফ (সংস্কার গ্রুপ) ও মগ লিবারেল ফ্রন্ট।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি হয়। ওই চুক্তির মধ্য দিয়ে তখনকার শান্তি বাহিনী অস্ত্র সমর্পণ করে। এরপর প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহিত সমিতি। তবে চুক্তির বিরোধিতা করে গড়ে উঠে ইউপিডিএফ। তারা সশস্ত্র আন্দোলনের পথে হাঁটে। পরে জেএসএস ও ইউপিডিএফ ভেঙে যায়।

পুলিশের এই প্রতিবেদনের বিষয়ে পাহাড়ে সক্রিয় আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর বক্তব্য পায়নি দেশ রূপান্তর।

পুলিশ সূত্র জানায়, জেএসএস সংস্কারের সামরিক শাখার প্রধান প্রজ্ঞান খীসা খাগড়াছড়ি নিয়ন্ত্রণ করেন। তার নেতৃত্বে শতাধিক সদস্য খাগড়াছড়ি জেলা সদরের ভোগড়াছড়া, গোয়ামাহাট, রাঙাপানিছড়া, জঙ্গলিটিলা এলাকায় সক্রিয়। এই গোষ্ঠীর হাতে সাবমেশিন গান বা এসএমজির মতো অস্ত্র আছে। ইউপিডিএফ মূল অংশের দাপট খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার হাতিরমাথা পাহাড়, চেলাছড়াপাড়া, বাউরোপাড়া, গিরিফুল, দেওয়ানপাড়া, স্বনির্ভর এলাকা, পুড়িয়া, নারাংখাইয়াপাড়া, কৃষি গবেষণা ও আলুটিলা পাহাড়ে। জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি, শুকনা ছড়িতেও ইউপিডিএফ মূল অংশের অস্ত্রধারীরা সক্রিয়। মগ লিবারেশন ফ্রন্ট ও আরাকান সলিডারিটি নামের একটি গ্রুপও এসব এলাকায় সক্রিয় আছে। রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি নানিয়ারচর বরকল, মাইনি, হরিনা, রাজস্থলী ঘাগড়া জেএসএসের শক্ত অবস্থান রয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, গত এক বছরে খাগড়াছড়ি এলাকায় চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্তত ১৪ জন খুন হয়েছে। রাঙ্গামাটি এলাকায় খুন হয় ১৬ জন। তার মধ্যে জেএসএসের ১২ ও ইউপিডিএফের ৪ জন। আটক হয়েছে ৩৪ জন। তাদের মধ্যে ইউপিডিএফের ১৬, জেএসএস ১০ ও জেএসএস সংস্কারের ৮ জন রয়েছে। তাদের কাছ থেকে ৩৩টি ভারী অস্ত্র ও ৮৪৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন পার্বত্য এলাকায় ইউপিডিএফের (মূল) দায়িত্ব আছেন উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা। তার নির্দেশে বাঘাইছড়ি, দীঘিনালা লংগদু উপজেলার আংশিক এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে রঞ্জন মনি চাকমা। দলে তার ছদ্মনাম জানি ওরফে জিনেট। তার অধীনে রয়েছে রোমিও চাকমা, সৌরভ চাকমা, বিপ্লব চাকমা ও গরান্টু চাকমা। খাগড়াছড়ি সদর ও লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার আংশিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সমাজ প্রিয় চাকমার। তার অধীনে কাজ করেন গমেজ চাকমা, ইথু চাকমা, অর্জুন চাকমা ও রবি চাকমা। কাউখালী, রামগড়, গুইমারা ও লক্ষ্মীছড়ির আংশিক এলাকার নিয়ন্ত্রণ রতন বসু চাকমার হাতে। তার অধীনে আছেন সমির চাকমা, অগ্রসর চাকমা, চুসেন্দ্র চাকমা ও গোয়েন্তা চাকমা। নানিয়ারচর, মহালছড়ি লংগদু ও রাঙ্গামাটি সদরের আংশিক এলাকা শ্রাবণ চাকমার নিয়ন্ত্রণে।

পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, তাদের তথ্য অনুযায়ী শান্তিচুক্তির পর থেকে এ পর্যন্ত পাহাড়ি অস্ত্রধারীদের মধ্যে সংঘাতে সহস্রাধিক নারী-পুরুষ খুন হয়েছে। মাঝেমধ্যে গুম হওয়ার ঘটনাও আছে। সন্ত্রাসীরা অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত