৪ সন্তানসহ পাড়াপ্রধানকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০২:৫০ এএম

বান্দরবানের রুমায় কারবারিসহ (পাড়াপ্রধান) একই পরিবারের পাঁচজনকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে গ্যালেংগা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম আবুপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। জুমের জমি নিয়ে বিরোধ এবং মন্ত্রের বাণে প্রাণে মেরে ফেলার অভিযোগ তুলে পাড়ার ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা পাড়াপ্রধানের ওপর এ হামলা চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

হামলাকারীরা হত্যার পর পাঁচজনেরই মরদেহ পাড়ার পার্শ্ববর্তী একটি ঝরনার খাদে ফেলে দেয়। খবর পেয়ে গতকাল শুক্রবার দুপুরে রুমা থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ পাঁচটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহগুলো আজ শনিবার সকালে বান্দরবান সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন রুমা থানার ওসি আবুল কাশেম চৌধুরী।

নিহতরা হলেন কারবারি লকরুই ম্রো (৭০), তার ছেলে রুমতুই ম্রো (৪৫), লেনঙি ম্রো (৪২), মেনওয়াই ম্রো (৩৭) ও রিংরাও ম্রো (৩৫)। নিহত কারবারি লকরুই ম্রোর আরেক ছেলে ঘটনার সময় পালিয়ে রক্ষা পেয়েছেন। তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন।

নিহতদের পরিবারের বেঁচে থাকা সদস্যরা জানান, পাড়াপ্রধান লকরুই ম্রোকে তার তিন ছেলেসহ নিজ বাড়িতে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সেজো ছেলেকে তার বাড়ির উঠোনে কুপিয়ে মারা হয়। এসব হত্যার ঘটনায় পাড়ার প্রতিপক্ষ ১৫ জনের বেশি লোক অংশ নিলেও নিহতদের স্ত্রী-সন্তানরা পাঁচজনের নাম বলেছেন। তারা হলো রুইতুই ম্রো, পালে ম্রো, কাইনপ্রে ম্রো, থংওয়ে ম্রো ও ত্লাসাই ম্রো।

আবুপাড়ার বাসিন্দা একাধিক নারীর ভাষ্য, পাড়াপ্রধান নিহত লকরুই ম্রোর সঙ্গে জুমের জমির দখল নিয়ে পাড়ার অনেক বাসিন্দার বিরোধ চলছিল দীর্ঘদিন ধরে। তাদের দখলে থাকা যে জমিই লকরুই ম্রোর পছন্দ হতো সেটিই জোর করে দখলে নিতেন। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে মন্ত্র ও জাদুর বাণ মেরে দুনিয়া থেকে সরিয়ে ফেলতেন লকরুই ম্রো। আবার কাউকে কাউকে প্রাণে না মেরে দিনের পর দিন অসুস্থ করে রাখতেন এমন বিশ্বাস পাড়াবাসীর। এসব নিয়ে পাড়াবাসীর সঙ্গে তার বিরোধ চলে আসছিল। এরই জেরে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে পাড়ার লোকজন জোট বেঁধে কারবারি লকরুই ম্রোর বাড়িতে যায়। তারা মন্ত্র ও জাদু করে অসুস্থ করে রাখাদের সুস্থ করে দিতে বলে। পাড়াবাসীর এমন কথায় ক্ষিপ্ত হয়ে পাড়াপ্রধান লকরুই ম্রো মন্ত্র বা জাদুর প্রমাণ চান। তিনি বলেন, ‘তোমরা প্রমাণ দিতে না পারলে জঙ্গলের পার্টিকে লাগিয়ে সবাইকে পেটাব’। এ সময় দুপক্ষের বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে মারপিট বেঁধে গেলে ঘটনাস্থলেই তিন ছেলেসহ কারবারিকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে মেরে ফেলে পাড়াবাসীরা। পরে আরেকটি ঘরে গিয়ে নিহত কারবারির সেজো ছেলেকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী একজন জানিয়েছেন, হামলাকারীরা পাড়াপ্রধানের আরেক ছেলে মেনলক ম্রোকে ঘটনার সময় ধরে বেঁধে ফেলে। তবে বাবা-ভাইদের হত্যার ঘটনায় কোথাও কোনো অভিযোগ দেবেন না এবং হত্যাকারীদের ওপর ভবিষ্যতে কোনো প্রতিশোধ নেবেন না এমন শপথ করানোর পর মেনলক ম্রোকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ঘটনার সময় তিনিও আহত হয়েছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নিহত পাড়াপ্রধান লকরুই ম্রোর স্ত্রী তুনকং ম্রো বলেন, ‘ওই রাতের ঘটনার সময় থেকে চতুর্থ সন্তান মেনলকের সঙ্গে আমাদের কারও কোনো যোগাযোগ নেই। তাকেও মেরে ফেলেছে কি না বলতে পারছে না কেউ।’

পাড়াপ্রধানসহ পাঁচজনকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন হামলায় অংশ নেওয়া রুইতুই ম্রো। তিনি বলেন, ‘পাড়াপ্রধান মন্ত্রের জাদুর বাণ দিয়ে পাড়াবাসীকে অনেক কষ্ট দিয়ে মেরেছে। এটা অনেক দিন ধরে চলছে। আমার ছেলে রেংচং ম্রোও (১৮) গত তিন বছর ধরে অসুস্থ। তাই নিজ হাতে আমি ওদের মেরেছি। এতে আরও অনেকে অংশগ্রহণ করেছে।’

গালেংগ্যা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেনরত ম্রো বলেন, ‘কারবারির পরিবারের সঙ্গে পাড়াবাসীর জুমের জমি নিয়ে গত বছর থেকে বিরোধ চলছে। এর মধ্যে পাড়ায় কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়ে। পাড়াবাসীর সন্দেহ, কারবারির পরিবারের সদস্যরা গোপনে জাদুমন্ত্র করার কারণে পাড়ার লোকজন রোগাক্রান্ত হচ্ছে। এ ক্ষোভে কারবারির পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়েছে।’

পাড়াপ্রধানসহ একই পরিবারের পাঁচজনকে হত্যার খবর পেয়ে এসআই আতিক ও আমিনের নেতৃত্বে গতকাল সকালে রুমা থানা পুলিশের একটি দল আবুপাড়ার উদ্দেশে রওনা হয়। পুলিশের দলটি দুপুরে ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঝরনার খাদ থেকে নিহত পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করে।

এসআই আতিক বলেন, ‘রাতে মেরে ফেলার পর হয়তো গুম করার জন্য লাশগুলো ঝরনার খাদে ফেলে দেওয়া হয়। আমরা লাশ পাঁচটি উদ্ধার করে রুমা থানায় এনেছি।’

পাড়াবাসী কেন কারবারি ও তার পরিবারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটিয়েছে তার তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন বান্দরবানের পুলিশ সুপার জেরিন আখতার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত