নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সবাইকে স্বাগত জানিয়েছে আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট। ক্ষমতাসীন দলের এই জোটের নেতারা বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে যে কমতি-ঘাটতি, বিতর্ক ও অনাস্থা তৈরি হয়েছে আশা করি নতুন নির্বাচন কমিশন সেটা দূর করবে। সংবিধান অনুযায়ী নিরপেক্ষভাবে, দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে।
অবশ্য সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে রাজি হয়নি। বিএনপি বলেছে, নির্বাচন কমিশন নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। আর মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিএনপি জোটের শরিক কোনো কোনো দল। অন্যদিকে বাম জোট বলেছে, নতুন ইসি করেও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব নয়।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ইসি হয়েছে : আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের সংবিধান, আইন এবং দেশের বিভিন্ন স্তরের জনগণ, রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজসহ সবার সঙ্গে আলোচনা করে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের সবাইকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও নাম শুনেছি। তাদের সবারই শিক্ষিত, মার্জিত এবং ভালো মানুষ হিসেবে সুনাম আছে। নির্বাচন করা এবং নির্বাচন পরিচালনা করা চ্যালেঞ্জিং। আশা করি দেশের সব রাজনৈতিক দল ও মানুষের সহযোগিতা পাবে এবং চ্যালেঞ্জিং কাজটা সুষ্ঠুভাবে করতে পারবে।’
নির্বাচন ও গণতন্ত্র নিয়ে বিএনপির কথার গুরুত্ব আছে বলে মনে করেন না ফারুক খান। তিনি বলেন, ‘অতীতে যখন তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল তখন কোনোবারই গণতান্ত্রিকভাবে কোনো নির্বাচন কমিশন গঠন করতে পারেনি। যার প্রমাণ ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালের নির্বাচন কমিশন। তারা নির্বাচনে বিজয়ী হলে বলে নির্বাচন সুষ্ঠু, আর হেরে গেলে বলে বয়কট। আমি আশা করি বিএনপি তাদের নেতাকর্মী ও জনগণের চাপে নির্বাচনে আসবে। দেশে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হবে।’
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি ভালো নির্বাচন কমিশন গঠন হয়েছে। রাষ্ট্রপতি যাদের নির্বাচন কমিশনে নিযুক্ত করেছেন তারা সবাই স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। আমরা মনে করি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যতটুকু শুনেছি এখানে বিএনপি ঘরানার লোকেরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। বিএনপির পক্ষ থেকে হলো, নাকি তাদের পক্ষে হলো না এটা বিবেচ্য বিষয় নয়। বিবেচ্য হলো তার যোগ্যতা আছে।’
অনাস্থা-বিতর্ক দূর হবে : আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রপতির ওপর আস্থা রাখতে চাই। দেশে নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। আশা করি নতুন নির্বাচন কমিশন নির্বাচন ব্যবস্থা পুনর্সংগঠিত করার কাজে সত্যিকারভাবে কাজ করবে।’
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন সিইসি ও নির্বাচন কমিশনাররা সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন। নিরপেক্ষভাবে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করবেন। গত নির্বাচন কমিশন নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে কমতি-ঘাটতি ও অনাস্থা দেখা দিয়েছে তা দূর করবেন।’
সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, নতুন নির্বাচন কমিশন ‘ইমপ্রেসিভ’। তার দাবি, নতুন সিইসি একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষ। তিনি জাতিকে একটি ভালো নির্বাচন উপহার দিতে পারবেন।
জাতীয় পার্টির (জেপি) মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, আশা করি নতুন নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশে নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে যে অনাস্থার সংকট রয়েছে সেটা দূর করার চেষ্টা করবে।
ইসি করে কোনো লাভ হবে না : বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘সরকার তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে নিজেদের লোক দিয়ে ইসি গঠন করেছে। ইসি করে কোনো লাভ হবে না। বিএনপি নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না, নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না। আমরা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ ইসি চাই।’
বিএনপির শরিকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া : বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মুহাম্মদ ইবরাহীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার পদে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাদের কর্মকা- পর্যবেক্ষণ করা হবে। দেখা যাক তারা কীভাবে কাজ করেন। তাদের কাজের মূল্যায়ন করবে দেশের জনগণ।’
ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের নায়েবে আমির মাওলানা ফয়জুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন ইসি আগের ইসির মতো আচরণ করে কিনা তা দেখে বলা যাবে। যদি সরকারের পক্ষে থাকে তাহলে জনগণ তাদের গ্রহণ করবে না। আর যদি জনগণের পক্ষে থাকে তবে জনগণ তাদের গ্রহণ করবে।’
খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার তাদের নিজেদের মতো করে ইসি গঠন করেছে। আমরা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার চাই। সেই সরকারের অধীনে নির্বাচন চাই।’
তবে সাধুবাদ জানিয়েছে ২০ দলীয় জোটের শরিক ইসলামী ঐক্যজোট। দলের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি নতুন ইসি নিয়োগ দিয়েছেন। আশা করছি তিনি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবেন।’
নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয় : বাম জোটের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের আশঙ্কা অনুযায়ী সরকারে বিশ্বস্ত ও অনুগতদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন যাকেই দেওয়া হোক না কেন দলীয় সরকারের অধীনে তাদের পক্ষে নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব নয়।’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘নির্বাচনের জন্য একটা নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন। কিন্তু দেশের সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আরও বেশি জরুরি কাজ রয়েছে। প্রথমত নির্বাচনকালীন সরকার কী হবে এবং নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার হবে কিনা। তা যদি না হয় তবে যতই ভালো নির্বাচন কমিশন হোক না কেন, তাদের কাছ থেকে ভালো নির্বাচন হবে তা আশা করা যায় না।’
