অন্যান্যবারের মতো এবারও অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) কাটছাঁট করা হয়েছে। উন্নয়ন ব্যয়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে ১৭ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা কমিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) বরাদ্দ চূড়ান্ত করেছে সরকার। মূলত সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বেশ কয়েকটি মেগাপ্রকল্পে খরচ কাটছাঁটের কারণেই উন্নয়ন ব্যয় প্রায় ৮ শতাংশ কমছে, যার পুরোটাই বিদেশি উৎস থেকে ঋণ হিসেবে পাওয়ার কথা ছিল। সংশোধিত এডিপিতে সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকার মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, যমুনা নদীর ওপর নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু, সাউথ এশিয়া সাবরিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন (সাসেক) সড়ক সংযোগ প্রকল্পের এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর চার লেন সড়ক ও পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণে বরাদ্দ কমিয়েছে সরকার।
গতকাল বুধবার সংশোধিত এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১০ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা কমিশনের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে যোগ দেন। এ সময় এনইসি সম্মেলন কক্ষে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান জানান, সংশোধিত এডিপিতে ২ লাখ ৭ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩০০ কোটি এবং বৈদেশিক খাত থেকে ৭০ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে।
প্রসঙ্গত, চলতি অর্থবছরে এডিপিতে ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত সবচেয়ে বড় প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে রাশিয়া ঋণ দেবে ৯০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের এডিপিতে এ প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্পটিতে বরাদ্দ কমিয়ে ১৪ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা নামিয়ে আনা হয়েছে। এ প্রকল্পে ৩ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ কমেছে।
পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা ব্যয় কমেছে। এডিপিতে অগ্রাধিকার মেগা প্রকল্পের তালিকায় থাকা এ প্রকল্পটির অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা সংশোধিত এডিপিতে কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা।
এডিপিতে মেট্রোরেল প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ছিল ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। চূড়ান্ত করা এডিপিতে ৫৬৭ কোটি টাকা কমিয়ে বরাদ্দ ৪ হাজার ২৩৩ কোটি টাকায় নেমেছে। সাউথ এশিয়া সাবরিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন (সাসেক) সড়ক সংযোগ প্রকল্পের এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পে বরাদ্দ কমে ২ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা হয়েছে। এছাড়া যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু রেলওয়ে সেতু নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ কমেছে। চলতি অর্থবছরের এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এখন বরাদ্দ কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দ কমেছে ১ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা।
এদিকে বেশিরভাগ মেগাপ্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হলেও কয়েকটিতে বেড়েছে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প এগিয়ে নিতে ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বাড়ানো হয়েছে। এডিপিতে প্রথম সংশোধিত প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা। গতকালের চূড়ান্ত সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪) প্রকল্পটিতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৬ হাজার ১৩৮ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। প্রায় হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে বরাদ্দ ৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা করা হয়েছে। এছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তর প্রকল্প সাপোর্ট টু ঢাকা (কাঁচপুর)-সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ এবং উভয় পাশে পৃথক সার্ভিস লেন নির্মাণ প্রকল্পটিতে বরাদ্দ বেড়েছে। এডিপিতে মোট বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা, যা সংশোধিত এডিপিতে ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। অবশ্য মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার প্রকল্পের বরাদ্দ ঠিক থাকছে। প্রকল্পটিতে সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬ হাজার ১৬২ কোটি টাকা।
