লালা মুখের স্বাস্থ্যরক্ষায় নিঃসৃত বিশেষ ধরনের অতি প্রয়োজনীয় তরল যা তৈরি হয় কানের সামনে নিচের চোয়ালের দুই পাশে প্যারোটিড, মুখের নিচে দুপাশে সাব ম্যান্ডিবুলার ও জিহ্বার নিচের দুপাশে সাব লিঙ্গুয়াল-সহ মুখের মধ্যে অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র লালা গ্রন্থি থেকে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় আধা থেকে দেড় লিটার লালা আমাদের দাঁত ও মাড়ির পৃষ্ঠে লেগে থাকা খাবার ও জীবাণুকে ধুয়ে ফেলে, খাবারকে হজম করে, মুখকে পিচ্ছিল রেখে কথা বলা সহজ করে, খাবার গিলতে, ঘর্ষণজনিত ক্ষত থেকে রক্ষা করতে, মুখের দুর্গন্ধ প্রশমনে, খাবারের স্বাদ গ্রহণ-সহ কিছু জীবাণু ধ্বংসকারী উপাদানের মাধ্যমে নানা উপকার করে। লালা নিঃসরণের মাত্রা কম বা বেশি যেকোনো অবস্থা অস্বস্তিকর, মুখের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যরক্ষা ঝুঁকিতে থাকে। শুষ্ক মুখে দাঁতের গর্ত, মাড়িরোগ ও মুখে জ্বালাপোড়ার প্রবণতা অত্যধিক। লালা নিঃসরণের মাত্রা সঠিক আছে কি না অনুভব করা জরুরি না হলে ঘটতে পারে ছোট-বড় নানা বিপদ।
মুখ শুষ্ক হওয়ার কারণ
স্বাভাবিকভাবে পানি পান কম হলে, ডায়রিয়া, অপুষ্টি, বমি, ঘাম বা যেকোনো কারণে দেহে পানি স্বল্পতা হলে লালা নিঃসরণ কমে যায়। এছাড়া অনেক ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মুখ শুষ্ক হতে পারে, যেমন উচ্চরক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে, অ্যান্টিহিস্টামিন, অ্যান্টিডিপ্রেশন, কেমোথেরাপি। এছাড়া নাক বন্ধ থাকায় মুখ দিয়ে শ্বাস নিলে, যাদের দাঁতের অবস্থান ওপেন বাইট, রাতে মুখ খুলে ঘুমানো, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, ভয় বা আতঙ্ক, বিশেষ অটো ইমিউন রোগ জোগ্রেনস্ সিনড্রম-সহ নানা কারণে লালা নিঃসরণ কমে যেতে পারে।
ঘরোয়া চিকিৎসা
দিনে ৮ থেকে ১১ লিটার পানি পান করা। কফি কম পান, চিনিমুক্ত চুইংগাম চিবানো ও লজেন্স চোষা, লং ও দারুচিনি চিবানো, এলকোহল-মুক্ত মাউথ ওয়াশ, ভাজা পোড়া খাবার ও ধূমপান পরিহার করা। মুখ শুষ্ক থাকলে ফ্লোরাইড-যুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে প্রতিদিন দাঁত মাজা।
অতিরিক্ত লালা নিঃসরণের চিকিৎসা
মাথার নিচে উঁচু বালিশ রাখা, রাতে শোবার কমপক্ষে ৩০ মি. আগে পানি পান ও এক ঘণ্টা আগে খাবার গ্রহণ, আদা, টকমুক্ত ফল, অ্যালোভেরা, ওটমিল, ডিমের সাদা অংশ, সোডা পানি ও ধীরে ধীরে চিবিয়ে খাবার অভ্যাস করা।
সায়ালোলিথিয়াসিস
হঠাৎ খাবার খাওয়ার সময় নিচের চোয়ালে কানের সামনে বা নিচে ফুলে যায় ও আবার আস্তে আস্তে কমে এবং ব্যথা অনুভব হলে ধরে নেওয়া যায় পারোটিড লালা গ্রন্থি থেকে যে নালি মুখের মধ্যে লালা আনে তার মধ্যে পাথর হয়েছে। সার্জারির মাধ্যমে পাথর অপসারণ করতে হয়।
সংক্রমণ বা প্রদাহ
প্যারোটিভ গ্ল্যান্ড-সহ অন্যান্য লালা গ্রন্থিতে জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে। ছোটদের ভাইরাসজনিত ম্যামস্ প্রায়শই দেখা যায়। প্রচন্ড ব্যথাসহ লালা গ্রন্থি ফুলে যায়, দ্রুত রোগ শনাক্ত করে ওষুধ সেবন ও নিয়ম মেনে চললে কষ্ট ও ঝুঁকি দুটোই কমে।
টিউমার
বিশেষ করে প্যারোটিড গ্ল্যান্ডে প্লিওমরফিক এডেনোমা নামক বিশেষ ধরনের টিউমার দেখা যায়। সাধারণত এসব টিউমার থেকে ক্যানসারের মতো ভয়াবহতায় রূপ নেয় না, তবে সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা না পেলে লালা গ্রন্থিকে সার্জারির মাধ্যমে ফেলে দিতে হতে পারে। এধরনের সমস্যা হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা করতে হবে।
