আইনি সহায়তা পান না দ. আফ্রিকায় অপহৃতরা

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২২, ০২:০৯ এএম

দক্ষিণ আফ্রিকায় অপহরণের শিকার প্রবাসী বাংলাদেশিরা সময়মতো আইনি সহায়তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। অপহরণের পর তাদের ওপর চলে নির্মম নির্যাতন। সেই অমানবিক নির্যাতনের স্থির ও ভিডিও চিত্র বাংলাদেশে স্বজনদের পাঠিয়ে আদায় করা হয় লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ। ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজন এবং পুলিশ সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

ভুক্তভোগীর স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, অপহরণকারী চক্রের নির্দেশ অনুযায়ী নির্ধারিত স্থান ও সময়ে টাকা নিয়ে অপেক্ষা করতে হয়। আগে থেকে তিন সংখ্যার গোপন সংকেত জানিয়ে দেওয়া হয়। চক্রের বাংলাদেশি সদস্যরা ওই কোড বলার পর টাকা দেন ভুক্তভোগীর স্বজন। তবে মুক্তিপণের টাকা নিয়েও অপহৃত প্রবাসী বাংলাদেশিকে হত্যার নজির রয়েছে। অপহৃতের জীবন রক্ষার্থে স্বজনরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কিছু জানাচ্ছেন না। আর যারা জানাচ্ছেন তারাও ঠিকমতো আইনি সহায়তা পাচ্ছেন না।

বাংলাদেশের পুলিশের দাবি, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ অন্যান্য দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে পুলিশের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় সেসব স্থানে সময়মতো ও যথাযথ আইনি সহায়তা পান না ভুক্তভোগীরা। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালেও কোনো সুরাহা হচ্ছে না। গত ২৭ জানুয়ারি পুলিশ সপ্তাহের সমাপনী অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে মতবিনিময়কালে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে লিয়াজোঁ কর্মকর্তা পদ সৃষ্টি করে পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়োগের দাবি জানান। ওই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে একই দাবি জানিয়েছিলেন।

পুলিশের এমন দাবির যৌক্তিকতার বিষয়ে তারা বলছেন, বিশ্বের যেসব দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক ও প্রবাসীরা রয়েছেন সেসব দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে লিয়াজোঁ অফিসারের দায়িত্ব দিতে হবে পুলিশকে। কারণ তারা নানা ধরনের জটিলতা ও মামলার মারপ্যাঁচে পড়ে ভোগান্তির শিকার হন। এ ছাড়া পুলিশ ভেরিফিকেশন, দেশ থেকে আসামি পালিয়ে যাওয়াসহ নানা বিষয়ে সমন্বয়ের জন্য দূতাবাসে পুলিশের একটি পদ সৃষ্টি সময়ের দাবি বলে তারা মনে করছেন।

সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকায় অপহরণের শিকার প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী রেজাউল আমিন মোল্লার (৩০) স্বজনরা অপহরণকারী চক্রের বাংলাদেশি সদস্যদের ১১ লাখ টাকা দিলেও তাকে হত্যা করে তারা। পরে লাশ পুড়িয়ে দেয়। এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করেন রেজাউলের ভাই নিজামুর রহমান মাসুদ। মামলাটি তদন্ত করছে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) ওয়ারী বিভাগ। তবে এখনো চক্রের বাংলাদেশি সদস্যদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

গত বছরের ১১ ডিসেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার কুমুতলাং শহর থেকে অপহরণের শিকার হন রেজাউল। তিনি মাদারীপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা আবদুল মান্নান মোল্লার ছেলে। তার স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, তার ওপর চালানো নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও বাংলাদেশে তার ভাই মাসুদকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারী চক্র। রেজাউলের পরিবার দুই দফায় ১১ লাখ টাকা দেয়। কিন্তু এর পরও তাকে ফিরে পায়নি।

দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশের বরাত দিয়ে ডিবি কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, অপহরণকারীদের নির্মম নির্যাতনে মারা যান রেজাউল। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর রাতে তার মরদেহ দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের অদূরে পান্ডাভিল পার্কের পরিত্যক্ত স্থানে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। সেখান থেকে ৯০০ মাইল দূরে দক্ষিণ আফ্রিকার সীমান্ত এলাকায় এক বাংলাদেশির কাছে আশ্রয় নেয় দুর্বৃত্তরা। সেই বাংলাদেশিকেও অপহরণ করতে গিয়ে গণপিটুনি খেয়ে পুলিশের হাতে আটক হয় চক্রের চার সদস্য। তারা হলো সিলেটের নোমান, একই জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জের আল আমিন, জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার শিহাব ও সোলেমান। তারা এখন দক্ষিণ আফ্রিকার কারাগারে আছে। তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশেও একাধিক মামলা রয়েছে।

ডিবি আরও জানায়, রেজাউলকে হত্যার পর প্রবাসীরা সে দেশের প্রাইভেট পুলিশকে জানায়। কিন্তু তারা উদ্ধার করতে পারেনি। পরে রেজাউলের পরিবারের অভিযোগ পাওয়ার পর ডিবি পুলিশ দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। গত ৩০ ডিসেম্বর তারা রেজাউলের কঙ্কাল উদ্ধার করে।

রেজাউলের ভাই মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনি দুই দফায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী আকবর হোটেলের সামনে ও গাজীপুরের সুরিছালা এলাকায় গিয়ে ১১ লাখ টাকা চক্রের সদস্যের দিয়েছেন। যারা টাকা নিয়েছে তারা বাংলাদেশেই আছে।

টাকা কীভাবে দিয়েছেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আগে জানাননি এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমাকে ৭৮৯ কোড নম্বর বলে দিয়েছিল অপহরণকারীরা। তাদের কথামতো নির্ধারিত স্থানে টাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তাদের লোক এসে কোডটি বলে একবার টাকা নিয়েছে। আরেকবার কোড বলে আমাকে শনাক্তের পর রাজধানীর গোলাপ শাহ মাজার এলাকা থেকে কয়েকবার বাস বদলে গাজীপুরের সুরিছালায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে টাকা নিয়ে তারা চলে যায়।’ তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে কিছু জানালে ভাইকে হত্যা করা হবে বলে আমাকে হুমকি দিয়েছিল অপহরণকারীরা।’

ডিবির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আশরাফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকায় রেজাউল অপহরণ ও এর সঙ্গে বাংলাদেশিরা জড়িত থাকার বিষয়টি সরকারিভাবে দূতাবাস থেকে আমাদের জানানো হয়নি। আমরা জেনেছি ব্যক্তিগত পরিচয়ের মাধ্যমে।’

দেশে মুক্তিপণের টাকা নেওয়ার বিষয়ে মামলার বাদীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

ডিবি কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকার দূতাবাসে যদি আমাদের পুলিশের প্রতিনিধি থাকত তাহলে এ ধরনের ঘটনা তাৎক্ষণিক সমাধান করা সহজ হতো, ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা যেত।’

নাম প্রকাশ না করে ডিবির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তদন্তে তারা জানতে পেরেছেন দক্ষিণ আফ্রিকায় গ্রেপ্তার শিহাব ওই অপহরণকারী চক্র গড়ে তুলেছে। এর আগেও দেশ থেকে টাকা নিয়ে চক্রের সদস্যরা শিহাবের মাকে দিয়েছে। তবে রেজাউলের ঘটনায় শিহাবের মা কোনো টাকা নেয়নি বলে দাবি করেছে। তিনি দাবি করেছেন, এর আগে বিভিন্ন মানুষ তাকে টাকা দিয়ে গেছে। সে টাকা অপহরণের মাধ্যমে নেওয়া কি না তা তিনি জানেন না।

রেজাউল ছাড়াও গত ২৬ জানুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকার মুসিনিয়া এলাকা থেকে অপহরণের শিকার হন ১০ বাংলাদেশি। তাদের স্বজনদের কাছে টাকা চায় অপহরণকারীরা।

রেজাউলসহ অপহৃত কয়েকজনের ওপর চালানো নির্যাতনের কিছু ভিডিও এসেছে দেশ রূপান্তরের হাতে। এসব ডিভিও ফোনেসেটে ধারণ করা।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি সংঘবদ্ধ অপহরণকারী চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন সময় আন্দোলনও করেছে মুক্তবাংলা ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব প্রিটোরিয়া, টাঙ্গাইল কমিউনিটি প্রিটোরিয়াসহ কয়েকটি সংগঠন ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা। দেশটিতে বাংলাদেশিদের নিয়ে কাজ করা সোশ্যাল অ্যাকটিভিস্ট এস এইচ মোহাম্মদ ওরফে মোশাররফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানে অপহরণকারী চক্রে থাকা বাংলাদেশিরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। রেজাউল অপহরণের সঙ্গে জড়িত চক্রটির বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকায় বেশ কটি অপহরণ ও হত্যা মামলা রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত