লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্রচর্চার সূচনা ও ধারাবাহিকতা

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২২, ০৬:৫৮ এএম

স্প্যানিশ ভাষায় বাংলা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা বা তার অনুবাদ কখন থেকে শুরু হয়েছে তা নিয়ে সামান্য অস্পষ্টতা থাকলেও, ধীরে ধীরে সেই অস্পষ্টতা ঘুচতে শুরু করেছে। একটা বিষয় এখন নিশ্চিত যে রবীন্দ্রনাথই ছিলেন সেই সৌভাগ্যবান প্রথম বাঙালি যার সাহিত্য স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ হয়েছিল। তার আগে ভারতীয় সাহিত্য ও দর্শন অনুবাদ হলেও সেগুলোর উৎস ভাষায় বাংলা নয়। মধ্যযুগের বিদ্যাপতি অন্যান্য দু-একজন বাংলা কবির সঙ্গে স্প্যানিশভাষী পাঠকদের কেউ কেউ পরিচিত হলেও, সেই পরিচয় তাদের রচনার অনুবাদের মাধ্যমে নয়, বরং তাদের সম্পর্কে আলোচনার কারণেই পরিচিত হয়েছিলেন। সুতরাং বাংলা সাহিত্যের প্রথম স্প্যানিশ অনুবাদ যে রবীন্দ্রনাথকে দিয়েই শুরু হয়েছিল, এটা এখন প্রায় নিশ্চিত।

কিন্তু কবে কে প্রথম রবীন্দ্রনাথের লেখা অনুবাদ করেছিলেন, তা নিয়ে কিছুদিন আগে পর্যন্তও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। স্প্যানিশ ভাষা ও সাহিত্য বিশেষজ্ঞ শ্যামাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়ের গবেষণায় আমরা আগেই দেখেছিলাম যে গোটা স্প্যানিশ ভাষায় রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে প্রথম যে লেখাটি প্রকাশিত হয় সেটি ছিল পেরেস দে আইয়ালার একটি প্রবন্ধ, বেরিয়েছিল স্পেনের লা ত্রিবুনা নামক একটি পত্রিকায় উনিশশ তেরো শালের শেষে, ‘১৯১৩ সালের ২৩ ও ২৯শে আগস্ট’ (মারিয়া এলেনা বাররোর-আগারওয়াল, ব্লানচে সাকারিয়ে : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার প্রথম স্প্যানিশ অনুবাদক, বিডিআর্টস, ১১ মে , ২০২০)।

তার মানে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগেই। তবে শ্যামাপ্রসাদ এই মতের একটু সংশোধন করে নিয়েছেন শাশ্বত মৌচাক নামক বইয়ের একটি টিকায়। সেখানে তিনি জানাচ্ছেন যে বিসেন্তে রিসকো নামে এক কবি, ঔপন্যাসিক ও প্রাচ্যতত্ত্ববিদ রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেটি পেরেস দে আইয়ালারও আগে। তবে কত আগে সে ব্যাপারে তিনি মন্তব্য করেননি। অতএব প্রামাণ্য রূপে আইয়ালাই স্পেনে প্রথম রবীন্দ্র-প্রবক্তা।

কিন্তু আটলান্টিকের অপর পারে স্প্যানিশভাষী মহাদেশে কী ঘটেছিল সে সময়? বিশ শতকের আগে পর্যন্ত লাতিন আমেরিকান মহাদেশটি সাহিত্যের ক্ষেত্রে মোটামুটি স্পেনেরই মুখাপেক্ষী ছিল। কিন্তু নিকারাগুয়ার কবি রুবেন দারিও আসার পর থেকে সেই প্রবণতায় এক বড় রকমের পরিবর্তন দেখা দেয়। এক অর্থে স্প্যানিশ সাহিত্যের আধুনিকতা এবং আধিপত্যের শুরু রুবেন দারিওর মাধ্যমে। এরপর থেকে লাতিন আমেরিকার হাতে চলে আসে সাহিত্যের শাসনদণ্ড।

রবীন্দ্রচর্চার ক্ষেত্রে আমরা স্পেনের লিপ্ততা সম্পর্কে জানলেও, লাতিন আমেরিকায় তা কোন পর্যায়ে ছিল, কিংবা কখন শুরু হয়েছিল, সে সম্পর্কে কোনো পূর্ণাঙ্গ ধারণা আমাদের কাছে ছিল না, যদিও শ্যামাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় এই অঞ্চলে রবীন্দ্রচর্চার আভাস কিছুটা দিয়েছিলেন শাশ্বত মৌচাক গ্রন্থে, কিন্তু সেখানে এই অঞ্চলে এই চর্চার শুরু ও ধারাবাহিকতা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু নেই। থাকার কথাও নয়, কারণ তার পূর্ণ মনোযোগ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও স্পেনের মধ্যকার সম্পর্কটি আবিষ্কার করা এবং সেটা তিনি পরিপূর্ণভাবেই করেছেন। কিন্তু লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্রচর্চার শুরু ও ধারাবাহিকতার তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে একুয়াদরের প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও গবেষক মারিয়া এলেনা বাররেরা-আগরওয়াল আমাদের এক চমকপ্রদ তথ্যের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন অতিসম্প্রতি।

ব্লানচে সাকারিয়ে নামে বহু ভাষায় দক্ষ এক মার্কিন নারীর কথা জানিয়েছেন যিনি বিয়ে করেছিলেন কুবার অধিবাসী লুইস আলেহান্দ্রো বারাল্ত ই পেওলিকে। সেই সূত্রে স্প্যানিশ ভাষা ছিল তার আয়ত্তে কিংবা তা তিনি আগে থেকেই জানতেন। ব্লানচে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি নিয়ে একটি আলোচনা লিখেছিলেন। “তিনি নিবন্ধটির শিরোনাম দেন ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের এক কবি’। কবিতার প্রশংসার সঙ্গে গীতাঞ্জলির ১৭, ১৯, ৩৫, ৩৬ ও ৫২ শীর্ষক পাঁচটি গীতি কবিতার অনুবাদ যুক্ত করেন। এই অনুবাদ-সংবলিত আলোচনাটি হাভানার ‘এল দিয়ারিও দে লা মারিনা’ পত্রিকার আগস্ট ৬, ১৯১৩ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়,” (বিডিআর্টস, ১১ মে, ২০২০)। অর্থাৎ আইয়ালারও কয়েক সপ্তাহ আগেই এটি প্রকাশিত হয়েছিল।

এই অর্থে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে চর্চার সূত্রপাত সমগ্র স্প্যানিশভাষী দুনিয়ায় লাতিন আমেরিকাতেই প্রথম। আরও একটি বিষয়েও লাতিন আমেরিকার আগ্রবর্তীতা সম্পর্কে উল্লেখ করা দরকার। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে চর্চার সূচনা আটলান্টিকের উভয় পারে ১৯১৩ সালের দিকে শুরু হলেও, তার লেখা স্প্যানিশ অনুবাদে বই আকারে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৫ সালে। স্পেনে ১৯১৫ সালের জুলাই মাসে রবীন্দ্রনাথের The crescent moon বইটি স্প্যানিশ অনুবাদে la Luna Nueva নামে স্পেনের প্রধান কবি হুয়ান রামোন হিসেনেস ও তার স্ত্রী সেনোবিয়া কাম্প্র“বির অনুবাদে প্রকাশিত হয়। ঠিক একই বছর আর্জেন্টিনা থেকে প্রাচ্যমুগ্ধ অনুবাদক কার্লোস মুসসিও সায়েন্স পেইনঞার অনুবাদে রবীন্দ্রনাথের The Gardener থেকে ২৫টি কবিতার স্প্যানিশ অনুবাদ Poemas শিরোনামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। কিন্তু একই বছর হলেও বইয়ে প্রকাশের মাসটি উল্লেখ নেই। ফলে প্রমাণ করা মুশকিল এটি হিমেনেস দম্পতির অনুবাদের আগে বেরিয়েছিল কি না। তাছ াড়া হিমেনেসের অনুবাদটি রবীন্দ্রনাথের The crescent moon বইটির পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ হলেও, কার্লোস মুসসিওর অনুবাদটি পূর্ণাঙ্গ ছিল না, বইটি থেকে তিনি ২৫টি কবিতা গ্রহণ করেছিলেন। সেই দিক থেকে হিমেনেস দম্পতিই পূর্ণাঙ্গ অনুবাদের কৃতিত্বের দাবিদার।

তবে লাতিন আমেরিকায় আরেকজন অনুবাদক ছিলেন যিনি রবীন্দ্রনাথের নোবেলজয়ী গীতাঞ্জলি বইটির পূর্ণাঙ্গ অনুবাদের প্রথম অনুবাদক, তিনি বলিভিয়ার আবেল আলার্কন। তার হাত দিয়েই গোটা স্প্যানিশ ভাষায় ১৯১৭ সালে প্রকাশিত হলো গীতাঞ্জলির প্রথম এবং পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ। স্পেন থেকে হিমেনেস দম্পতির অনুবাদে এটি বেরোল পরের বছর ১৯১৮ সালে।

এক অর্থে রবীন্দ্রনাথের চর্চা ও অনুবাদ দুদিকেই এক রকম পাল্লা দিয়েই এগিয়ে গেছে। এই ধারাবাহিকতায় লাতিন আমেরিকায় যুক্ত হয়েছেন খ্যাতিমান ও স্বল্পপরিচিত অসংখ্য লেখক-শিল্পী। এবং তা তিহুয়ানা (মেক্সিকোর উত্তর সীমান্ত অর্থাৎ দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর) থেকে তিয়েররা দেল ফুয়েগো (আর্জেন্টিনার দক্ষিণাঞ্চল, অর্থাৎ দক্ষিণ আমেরিকার একেবারে দক্ষিণ) পর্যন্ত বিস্তৃত।

মেক্সিকোতে লেখকদের মধ্যে অকালপ্রয়াত পেদ্রো রেকেনা লেগাররেতা, হোসে বাস্কন্সেলোস, হোসে গরোস্তিসা, সেলেস্তিনো গরোস্তিসা, পেদ্রো গ্রিঙ্গোইরে, আন্তোনিও কাস্ত্রো লেয়াল, আমাদো নের্বো, অক্তাবিও পাস ও হাইমে সাবিনেস থেকে শুরু করে চিত্রশিল্পী দিয়েগো রিবেরা, রবের্তো মন্তেনেগ্রো, গাব্রিয়েল ফের্নান্দেস লেদেসমা। এরা ছাড়াও আরও অনেকেই আছেন। অন্যদিকে আর্জেন্টিনায় লেখকদের মধ্যে কার্লোস মুসসিও সায়েন্স পেইনঞা, হোয়াকিন বে. গনছালেস, বিক্তোরিয়া ওকাম্পো, ফ্রিদা স্চুল্ৎস দে মান্তোবানি, অস্বাল্দো সবানাসিনি, এদুয়ার্দো গনছালেস লানুসা, হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর মতো উজ্জ্বল সব ব্যক্তিত্ব। এরা হয় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখেছেন, নয়তো অনুবাদ করেছেন। কিন্তু এরা ছাড়াও, লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশের অংশ গ্রহণও কম নয়।

বিশেষ করে চিলে যেখানে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে রীতিমতো বিতর্কের এক প্রবল ঝড় উঠেছিল নেরুদা কর্র্তৃক রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতাকে আত্মসাতের অভিযোগে। এই বিতর্কে একে একে জড়িয়ে পড়েছিলেন বলোদিয়া তেইতেলবৌম, বিসেন্তো ইউদোব্রো, পাবলো দে রোকার মতো বাঘা বাঘা কবি লেখকরা। এবং এই বিতর্কের রেশ বহু বছর গড়িয়েছে। কিন্তু বিতর্ক ছাড়াও রবীন্দ্রনাথের অভিঘাত যাদের রচনায় এক স্নিগ্ধ আবহ তৈরি করেছেন তাদের মধ্যে প্রধানত কবি পেদ্রো প্রাদো আর নোবেলজয়ী গ্রাবিয়েলা মিস্ত্রাল ছিলেন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে চিলির প্রথম সারির প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক আর্তুরো তররেস রিওসেকো যদিও খুব একটা রবীন্দ্রানুরাগী ছিলেন না, কিন্তু লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথের প্রবল উপস্থিতি এবং সেখানকার লেখকদের উদ্বেলিত করার বিষয়টি ঠিকই লক্ষ করেছেন এবং তা স্বীকারও করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ আজকের লাতিন আমেরিকান লেখকদের কতটা আকৃষ্ট করে তা জানা না গেলেও, সেখানকার পাঠকদের কাছে তার রচনা এখনো কদর হারিয়ে ফেলেনি। এখনো লাতিন আমেরিকার নানান দেশ থেকে তার বিভিন্ন বইয়ের সংস্করণ প্রতি বছরই বের হচ্ছে। বেরোচ্ছে নতুন নতুন অনুবাদ। এসবই রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের সর্বজনীন আবেদনেরই প্রমাণ।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত