ইউক্রেনে হামলার প্রথম দিনই চেরনোবিল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিত্যক্ত এলাকা দখলে নিয়েছিল রাশিয়া। ঠিক ৯ দিনের মাথায় গত শুক্রবার আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র জাপোরিঝিয়া দখল করে রাশিয়া। এমন পরিস্থিতিতে পরমাণু তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রাশিয়ার উদ্দেশ্য নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া
সাল ১৯৮৬। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত ইউক্রেনের চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে এপ্রিলের শেষের দিকে। বিস্ফোরণ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির চার নম্বর চুল্লির ওপরের প্রায় এক হাজার টন কংক্রিটের ঢাকনা সরে যায়। পারমাণবিক তেজস্ক্রিয় কণা ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপজুড়ে। মানবসৃষ্ট বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ পারমাণবিক সেই বিপর্যয়ের পর ২০০০ সাল থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। ওই ঘটনার প্রায় ৩৬ বছর পর ইউক্রেনে ২৪ ফেব্রুয়ারি হামলা চালায় রাশিয়া। ইউক্রেন পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোতে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা চালানোয় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের নির্দেশে আগ্রাসন শুরু হয়। পুতিনের হামলার নির্দেশের কয়েক ঘণ্টা পরই রাশিয়ার সেনাবাহিনী দুই দশকের বেশি সময় ধরে পরিত্যক্ত চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দখলে নেয়। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে যে এলাকায় মানববসতি নেই এবং এখনো রয়েছে তেজস্ক্রিয় ধ্বংসাবশেষ, সেটি দখলে নেওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসে যুদ্ধের কৌশলগত গুরুত্ব। রাশিয়ার মিত্র প্রতিবেশী দেশ বেলারুশের সীমান্ত থেকে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে পৌঁছার অন্যতম সহজ মহাসড়ক গেছে ইউক্রেনের চেরনোবিল শহর হয়েই।
এদিকে ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এনারহোদার শহরে জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গত শুক্রবার ভোরে হামলা চালায় রাশিয়ার সেনারা। ওই সময় গোলার আঘাতে কেন্দ্রটির ছয়টি চুল্লির একটিতে আগুন ধরে যায়। হামলা শুরুর ৯ দিনের দিন রাশিয়ার ইউক্রেনের আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দখলে নেওয়ায় ভৌগোলিক গুরুত্বের পাশাপাশি রুশদের রণকৌশল নিয়ে আলোচনা উঠেছে। জাপোরিঝিয়া ইউরোপের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ইউক্রেনের এক-চতুর্থাংশ বিদ্যুৎ ওই কেন্দ্র থেকে সরবরাহ করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এই বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে নিতে রাশিয়া সেখানে হামলা চালায়। এ ছাড়া ইউরোপের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দখলে নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বকে পুতিন চাপে রাখতে চান বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাশিয়ার হামলার পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে পরমাণু সন্ত্রাসের অভিযোগ তোলেন। রাশিয়া ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি চায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
যা ঘটেছিল চেরনোবিলে
চেরনোবিল শহর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার এবং ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে চেরনোবিল পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবস্থান। ১৯৮৬ সালের ২৫ এপ্রিল এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারটি চুল্লির মধ্যে চতুর্থটিতে বিস্ফোরণ ঘটে। দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল মূলত অপরিকল্পিত পারমাণবিক পরীক্ষা চালাতে গিয়ে। এর জন্য দায়ী করা হয় এর সঙ্গে যুক্ত পরিচালকদের, যারা দক্ষতার দিক থেকে ছিলেন অনেকটাই আনাড়ি। কয়েকজনকে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়। চার নম্বর চুল্লিতে করা হয়েছিল ‘নিরাপদ শীতলীকরণের’ পরীক্ষা। এজন্য অপারেটররা চুল্লিটির পাওয়ার রেগুলেটিং সিস্টেম বন্ধ করে দেন। সেই সঙ্গে এর জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থাটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু রিঅ্যাক্টরটি তখনো ৭ শতাংশ শক্তি নিয়ে কাজ করছিল। অপরিকল্পিত সেই পরীক্ষার একপর্যায়ে চুল্লির চেইন রিঅ্যাকশন এমন পর্যায়ে চলে যায়, তা আর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। রাত প্রায় দেড়টার দিকে চুল্লিটি বিস্ফোরিত হয়।
পরপর দুটি বিস্ফোরণে চতুর্থ পারমাণবিক চুল্লিটির ওপরের প্রায় এক হাজার টন কংক্রিটের ঢাকনা সরে যায় এবং ছাদ ভেঙে এক বিশাল গহ্বরের সৃষ্টি হয়। দুর্ঘটনার ২০ ঘণ্টা পর বাইরের বাতাস চুল্লিটির দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে গেলে ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত হয়। ১০ দিন স্থায়ী সেই আগুন থেকে উৎপন্ন পারমাণবিক তেজস্ক্রিয় ধুলা প্রায় ১ কিলোমিটার উঁচুতে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ধুলার মেঘ ইউক্রেন, পার্শ্ববর্তী বেলারুশ, রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের ওপর দিয়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চল, যুক্তরাজ্য এমনকি পূর্ব আমেরিকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক বিস্ফোরণের ফলে দুজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া বিস্ফোরণের তিন মাসের মধ্যে ২৮ জন দমকলকর্মী এবং জরুরি পরিচ্ছন্নতাকর্মী তীব্র পারমাণবিক বিকিরণের কারণে অসুস্থতায় এবং একজন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আর ২০০৫ সালে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, চেরনোবিলের বিকিরণের কারণে প্রায় ৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। বিস্ফোরণের পর ২৭ এপ্রিলের মধ্যেই প্রায় ৩০ হাজার স্থানীয় বাসিন্দাকে অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হয়।
বিস্ফোরণটির ভয়াবহতার পরিমাপে বলা হয়, এটি জাপানের হিরোশিমায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেলা পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের চেয়ে ৪০০ গুণ বেশি বিকিরণ ঘটিয়েছিল। আর হিরোশিমা-নাগাসাকির তেজস্ক্রিয় পদার্থের বিকিরণের প্রায় ১০০ গুণ ছিল। তেজস্ক্রিয়তা পরিবেশ ও জীবজগতের ওপর যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। তেজস্ক্রিয়তাজনিত রোগ ও ক্যানসারে (বিশেষ করে থাইরয়েড ক্যানসার) আক্রান্ত হয় মানুষ। বিকলাঙ্গ হয়ে জন্ম নেয় শিশু। প্রথমে সোভিয়েত কর্মকর্তারা বিপর্যয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে সুইডিশ কর্মকর্তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের দিক থেকে তীব্র মাত্রায় বিকিরণ বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করার পর ক্রেমলিন দুর্ঘটনার বিষয়টি স্বীকার করে। ওই দুর্ঘটনার চার বছর পর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে এটিকে বিবেচনা করা হয়।
এখনো রয়েছে তেজস্ক্রিয়তা
চেরনোবিল বিস্ফোরণের পর তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়ন বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। এ ছাড়া পারমাণবিক চুল্লিটিকে কেন্দ্র করে এর চারপাশে ৩২ কিলোমিটার ব্যাসার্ধবিশিষ্ট একটি বৃত্তাকার পরিত্যক্ত এলাকা নির্দিষ্ট করা হয়। সাধারণত এই নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে কাউকে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হয় না। তবে বিজ্ঞানী বা গবেষকদের জন্য বিশেষভাবে এবং স্বল্প সময়ের জন্য এখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
বিস্ফোরণের পরও চার নম্বর চুল্লিতে প্রায় ২০০ টনের মতো তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে যায়। গবেষকদের হিসাবে, এই তেজস্ক্রিয় পদার্থ পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হতে আরও ১০০ থেকে ১ হাজার বছর লাগবে। বিস্ফোরণের পর তেজস্ক্রিয় পদার্থ প্রায় ৮০০ স্থানে পুঁতে ফেলা হয়। এতে ভূগর্ভস্থ পানিতেও দূষণ ছড়িয়ে পড়ে। চার নম্বর চুল্লি থেকে বিকিরণ ঠেকাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন একে ঘিরে কংক্রিটের সার্কোফ্যাগাস বা বিশেষ আবদ্ধ ঘর তৈরি করে। তবে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বের হওয়া ঠেকানোর সেই সার্কোফ্যাগাস তৈরি করা হয়েছিল ৩০ বছরের জন্য। এটি এখন ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে শুরু করেছে, যা ফের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।
ঝুঁকি সত্ত্বেও দখল
চেরনোবিলে রাশিয়ার আক্রমণ কোনোভাবেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। এর অন্যতম কারণ চেরনোবিলের ভৌগোলিক অবস্থান। বেলারুশের সীমান্ত থেকে কিয়েভ যাওয়ার সংক্ষিপ্ততম পথটি চেরনোবিলের মধ্য দিয়ে যায়। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, এ কারণে কয়েক মাস আগে উত্তেজনার শুরুতে এলাকাটিতে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করেছিল ইউক্রেন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ইউক্রেনে হামলার নির্দেশ দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর চেরনোবিল বিদ্যুৎকেন্দ্রে আক্রমণ করে রুশ বাহিনী। ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার সেনারা ইউক্রেনের অন্য এলাকার সীমান্ত পার হওয়ার আগেই চেরনোবিলের পরিত্যক্ত এলাকায় ঢুকে পড়ে। ইউক্রেন প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা মিখাইল পোদোলিয়াক জানান, সেখানে প্রচণ্ড যুদ্ধের পরে পরিত্যক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দখল নেয় রাশিয়া। ইউক্রেনের আরেক কর্মকর্তা ফেইসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন, চুল্লিটির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বেশ কয়েকজন কর্মীকে আটক করা হয়।
সামরিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য, চেরনোবিল দখল একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। রাশিয়ার সেনাবাহিনী বেলারুশ থেকে কিয়েভে দ্রুত এবং সহজে হামলা চালাতে পারবে। চেরনোবিল দখল করে রাশিয়া তার সেনাবাহিনীর জন্য ইউক্রেনে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ পথটি সুরক্ষিত করে। এ ছাড়া তারা প্রিপিয়াত নদীপথও দখল করে, যাতে নৌপথেও দ্রুত সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম আনা যায়। এ বক্তব্যের সত্যতা মেলে রাশিয়ার হামলার কৌশল থেকে। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে হামলার জন্য রাশিয়ার ৬৫ কিলোমিটারের সামরিক বহরটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে থাকলেও চেরনোবিল হয়ে উত্তর পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে আরেকটি বাহিনী অগ্রসর হয়। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, চেরনোবিল হয়ে যাওয়া রাশিয়ার বাহিনী সবচেয়ে দ্রুতগতিতে কিয়েভের দিকে এগোচ্ছে এবং তারা এরই মধ্যে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিজেদের অধীনে নিয়েছে। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের বিশেষজ্ঞ জেমস অ্যাক্টন বলেন, এটি ছিল এ থেকে বি তে যাওয়ার দ্রুততম পথ। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক আর্মি স্টাফ প্রধান জ্যাক কিন বলেন, চেরনোবিল ‘কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ’ এবং ইউক্রেন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে রাশিয়ার ‘শিরেদ’ কৌশলের অন্যতম অংশ। ইউক্রেন আক্রমণে রুশ বাহিনীর চারটি ‘অক্ষ’-এর একটি এ পথ। অন্য তিনটি হচ্ছে বেলারুশ থেকে উত্তরের বাহিনী, পূর্বে ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভ এবং রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ক্রিমিয়া থেকে উত্তরে খেরসন শহরের দিকের বাহিনী।
চ্যাথাম হাউজের ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রোগ্রামের ডিরেক্টর প্যাট্রিসিয়া লুইসের কাছে অবশ্য বিষয়টি ‘ধাঁধার’ মতো লাগছে। তিনি বলেন, ‘রাশিয়া কী করছে এবং কেন তারা এটি করেছে, এটি বড় প্রশ্ন।’ তিনি জানান, সাধারণত একটি দেশে সামরিক অভিযান চালানোর সময় আক্রমণকারী শক্তির উৎস, যোগাযোগ এবং কৌশলগত স্থানগুলো দখলের চেষ্টা করে। সেদিক থেকে চেরনোবিল প্ল্যান্টটি ২০০০ সাল থেকেই বন্ধ রয়েছে এবং এর কোনো সুস্পষ্ট উপযোগিতা নেই। তার ভাষায় এটি রাশিয়ার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল হতে পারে। মানুষ চেরনোবিলের কথা জানে, সেখানে অনেকে ঘুরতে যান। এখন তারা এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে ট্রফির মতো উপস্থাপন করবে যে তারা এটি দখল করেছে। এনজিও ইকোঅ্যাকশনের এনার্জি নীতি বিশেষজ্ঞ ওকসানা আনানিভার মতে, রাশিয়ার চেরনোবিল দখল একটি ‘প্রভাবিত করার কার্ড’ হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো, এটি সমস্ত ইউরোপকে প্রভাবিত করার একটি চমৎকার কার্ড। কারণ সবাই জানে, সেখানে কিছু ঘটলে এটি শুধুমাত্র ইউক্রেন নয়, অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পারমাণবিক কেন্দ্রটি দখল করে রাশিয়ানরা সেখান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে। তা ছাড়া এটি আরেক দিক থেকেও নিরাপদ কারণ ইউক্রেন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পাল্টা হামলা চালাতে পারবে না। চেরনোবিল মূলত হুমকি দেওয়া এবং প্রভাবিত করার একটি উপায়। এ ছাড়া এটি দখলে নেওয়ার কোনো কারণ নেই।’
আতঙ্কের কারণ
চেরনোবিল বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণ ঘটা চার নম্বর চুল্লিটি এখন ইস্পাত ও কংক্রিটের একটি কাঠামোর নিচে রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘নিউ সেফ কনফাইনমেন্ট’। এটি চুল্লির অবশিষ্টাংশগুলোকে ঢেকে রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। বলা হয়, এটি টর্নেডো সহ্য করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী। প্রায় ২০০ টন তেজস্ক্রিয় জ্বালানি চুল্লিটির ধ্বংসাবশেষের ভেতরে এখনো রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হামলার কয়েক ঘণ্টা পর ইউক্রেনের পারমাণবিক সংস্থা জানায়, তারা বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারপাশে বিকিরণের মাত্রা বাড়তে দেখেন। এর কারণ হিসেবে বলা হয়, ওই এলাকায় রাশিয়ার ভারী সামরিক সরঞ্জাম চলাচলের কারণে তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। ইউক্রেনের পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানায়, রাশিয়ার সেনারা চেরনোবিলের বিস্ফোরণ অঞ্চল দখলের কারণে পরিত্যক্ত অঞ্চলে পারমাণবিক বিকিরণ ঠেকানোর স্থাপনার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং বিকিরণের মাত্রা বাড়ার বিষয়টি তারা ২৪ ফেব্রুয়ারিই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) জানায়। রাশিয়ার এ পদক্ষেপ ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনের সরাসরি লঙ্ঘন উল্লেখ করে মন্ত্রণালয় আরও জানায়, পুরো বিশ্ব এখনো বেদনার সঙ্গে সবচেয়ে বড় পরিবেশগত এ বিপর্যয়কে স্মরণ করে। ইউক্রেন গত কয়েক দশক ধরে বিশ্বকে এখানকার পারমাণবিক বিপদ থেকে রক্ষা করে আসছে। দুর্ভাগ্যবশত আজ সারা পৃথিবী পারমাণবিক বিপদের একটি নতুন ভয়ংকর হুমকির মুখে পড়েছে। টাইমসের একটি প্রতিবেদনে অবশ্য বলা হয়, সেনারা তেজস্ক্রিয় কণা থেকে খুব বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবেন না, যদি তারা উচ্চ বিকিরণের মাত্রার এলাকায় খুব বেশি সময় ব্যয় না করেন। তবে ইউক্রেনের একজন কর্মকর্তা সতর্ক করে জানান, পারমাণবিক বর্জ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থার ক্ষতি হলে ইউক্রেন, বেলারুশ এবং ইউরোপের কিছু অংশ জুড়ে তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা ছড়িয়ে পড়তে পারে। ‘নিউ সেফ কনফাইনমেন্ট’ পারমাণবিক তেজস্ক্রিয় পদার্থকে সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করতে পারলেও শক্তিশালী বোমা থেকে এটি সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ।
