ফের অস্ত্রবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মারিওপোলে। প্রথম অস্ত্রবিরতির মতো পাঁচ ঘণ্টা নয়, এবার এগার ঘণ্টার জন্য শহর থেকে বের হওয়ার করিডর সৃষ্টি করেছে রাশিয়া। শহরের সিটি কাউন্সিলের উদ্ধৃতি দিয়ে গতকাল রবিবার এমন তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ানসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা। রবিবার সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খণ্ডকালীন এই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছে। পূর্ব ইউরোপের এই দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় এই বন্দরনগরী থেকে বেসামরিক মানুষকে সরিয়ে নিতেই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছে।
যুদ্ধবিরতির কারণে বেসামরিক মানুষ শহরটি থেকে বেরিয়ে যেতে পারবেন। স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা থেকে নির্দিষ্ট একটি রুটে শহর থেকে সাধারণ মানুষ বের হতে পারবেন। এর আগে শনিবারও প্রায় একই ধরনের একটি খণ্ডকালীন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কিছু সময় পরই নতুন করে বোমা হামলা শুরু হওয়ায় সেটি ব্যর্থ হয়। অবশ্য ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য একে অপরকে দোষারোপ করতে শুরু করে রাশিয়া ও ইউক্রেন।
ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়া প্রতিশ্রুতি মতো মানবিক করিডর তৈরি করেনি এবং মারিওপোলের বাসিন্দাদের শহর ছেড়ে যেতে বাধা দিয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ার দাবি, ইউক্রেনবাসী শর্ত পালন করেনি, তারা কোনোভাবেই শান্তি বজায় রাখতে আগ্রহী নয়। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি বাতিল হতেই ফের হামলা শুরু করে রাশিয়া। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, ইউক্রেনের মারিওপোল ও ভলনোভাখা শহর থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার সুযোগ দিতে যে সামরিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল তার অপব্যবহার করেছে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী। এ কারণে ওই যুদ্ধবিরতি স্থগিত করে আবার সামরিক অভিযান শুরু করা হয়েছে।
রুশ সেনাদের হামলার সময় দু’পক্ষের মধ্যে গোলাগুলিতে পড়ে যেন বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু না হয় সেজন্য রাশিয়া সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিল। মস্কো বলেছিল, যুদ্ধবিরতির এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বেসামরিক নাগরিকদের শহর দু’টি থেকে বের করে নিতে হবে যাতে পরবর্তী সময়ে অভিযান চালানোর সময় বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় নিতে না হয়।
এদিকে রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের সুমাই অঞ্চল ও মারিওপোল ‘মানবিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে’ বলে মন্তব্য করেছেন ভলোদিমির জেলেনস্কি সরকারের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। সুমাই অঞ্চলের উত্তরের আখতিরকা ও ত্রস্তিয়ানেতস শহরে এখন বিদ্যুৎ ও পানি নেই, বলেছেন ইউক্রেন সরকারের উপদেষ্টা ভাদিম দেনিসেনকো। রুশ হামলা অব্যাহত থাকলেও শনিবার রাত ‘তুলনামূলক শান্ত’ ছিল বলেও তিনি জানান।
দক্ষিণাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ : ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের অধিকাংশ কৌশলগত অবস্থানেরই দখল নিয়েছে রাশিয়ার সেনারা। গত শুক্রবার জাপোরিঝিয়া পরমাণু কেন্দ্র দখলের মধ্য দিয়ে দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রুশ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এছাড়া দক্ষিণের খেরসন শহর ছাড়াও বেশ কয়েকটি অঞ্চলের দখল নিয়েছে রুশ সেনারা। খেরসনের দখলের মধ্য দিয়ে ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে দেশটির বাকি অংশের যোগাযোগে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে হাইওয়েতে থাকা রুশ ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান।
ইউক্রেনের একটি সামরিক বিমান ঘাঁটিতে হামলার দাবি করেছে রাশিয়া। রবিবার রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তরফে এমন দাবি করা হয়। রাশিয়ার দাবি, দূরপাল্লার উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন নির্ভুল অস্ত্র দিয়ে চালানো এ হামলায় ইউক্রেনের স্টারোকোস্টিয়ানটিনিভ সামরিক বিমানঘাঁটি নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইগর কোনাশেনকভ বলেন, ‘৬ মার্চ সকালে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন নির্ভুল দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। স্টারোকোস্টিয়ানটিনিভের কাছে ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর ঘাঁটি নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রিত এস-৩০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও ধ্বংস করা হয়েছে। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় রাশিয়া ইউক্রেনের ১০টি বিমান ও হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার ‘ভয়াবহ আক্রমণ’ ব্যর্থ করার জন্য প্রেসিডেন্ট পুতিনের ওপর চাপ বাড়াতেই ছয় দফা পরিকল্পনা তৈরি করেছেন বরিস জনসন। এই ছয় দফা পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বিশ্ব নেতাদের ইউক্রেনের জন্য একটি ‘আন্তর্জাতিক মানবিক জোট’ গঠন করতে হবে, ‘নিজেদের আত্মরক্ষার জন্যই’ তাদের (দেশগুলোর) উচিত ইউক্রেনকে সমর্থন করা, রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে হবে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান কর্মকাণ্ডকে প্রতিরোধ করতে হবে, যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক সমাধানের পথ অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। এবং সেটি হতে হবে কেবল ইউক্রেনের বৈধ সরকারের পূর্ণ অংশগ্রহণের মাধ্যমেই, সামরিক জোট ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ‘নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা’ আরও জোরদার করার জন্য একটি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
এদিকে নিরাপত্তা এবং সহায়তা নিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলাপ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, চলমান সংকট নিয়ে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে গত শনিবার ৩০ মিনিট ফোনালাপ হয়েছে। যদিও এ সংক্রান্ত বিস্তারিত জানায় বাইডেন প্রশাসন। তবে জেলেনস্কি এক টুইট বার্তায় বলেন, প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে ইউক্রেনের নিরাপত্তা, আর্থিক সহায়তা এবং রাশিয়া ওপর নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
ইউক্রেনে যুদ্ধবিমান সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে পোল্যান্ডের সঙ্গে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের এক মুখপাত্র বলেন, ইউক্রেনের অনুরোধের বিষয়টি বিবেচনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ওয়ারসোর সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে। শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের দুই আইনপ্রণেতার সঙ্গে জুমে কথা হয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির। তিনি বলেন ‘পোল্যান্ড ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা মিগ ফাইটার জেট পাঠানোর জন্য প্রস্তুত। কিন্তু তারা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতির অপেক্ষায় আছে’।
