বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘ গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে কাজ করছে। ১৭টি অভীষ্ট সংবলিত এই অভিযাত্রার মূল দর্শন হলো ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’, মানে কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না। এই বাক্যাংশের সঙ্গে ২০২২-এর নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি টুডে ফর এ সাসটেইনেবল টুমরো’ তথা ‘টেকসই আগামীর মূল শর্ত লিঙ্গীয় সমতা’ একইসূত্রে গাঁথা। সমাজ-রাষ্ট্রে যে অসমতা বিদ্যমান আছে, তা দূর করার মধ্যেই রয়েছে টেকসই উন্নয়নের মূল মন্ত্র। পৃথিবীর জনগোষ্ঠীর ৫০ ভাগ নারী আর পৃথিবীর মোট সম্পদের মাত্র ৬ শতাংশেরও কম অংশের মালিকানা নারীর। অঞ্চলভেদে কিছুটা হেরফের থাকলেও নারীরা সারা বিশ্বেই মজুরিবৈষম্যের শিকার। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের এই চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও। বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র রাষ্ট্রের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হলেন নারী।
এসডিজির ভিত্তি দর্শন ‘কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না’ এর অর্থ হলো বৈষম্য দূরীকরণ। বৈষম্য দূরীকরণের কথা আমরা ষাট ও সত্তরের দশকে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে উচ্চারিত হতে শুনেছি। শুনেছি ও স্লোগানে উচ্চকিত করেছি মার্কসের আদর্শে বিশ্বাসী বামপন্থিরাও। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ঘোষণা করেছিলেন যে, পৃথিবীর মানুষ আজ দুই ভাগে বিভক্ত শোষক আর শোষিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মূল লক্ষ্যও ছিল শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা প্রতিফলিত হয়েছিল স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় এবং পরবর্তী সময়ে প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধানে।
আমরা এবারের নারী দিবস উদযাপন করছি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর বা সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে। এর মধ্যে যদি আমরা কিছুটা সালতামামি করতে চাই তাহলে আমরা দেখতে পাব অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। দারিদ্র্যের হার কমেছে। কৃষি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা দৃপ্ত পদচারণার স্বাক্ষর রাখছেন। বাংলাদেশের সরকারি দল, বিরোধী দল দুটোরই প্রধান নারী। আমাদের সরকারপ্রধান, সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা, শিক্ষামন্ত্রী ও স্পিকার নারী। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অনেক নারী। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য ও বিচারক হিসেবে নারীরা সাফল্যের দৃষ্টান্ত রেখে চলেছেন। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে দায়িত্ব পালন, বিমান চালনা, ট্রেন চালনা প্রভৃতি অপ্রচলিত পেশায়ও নারীদের পদচারণা আজ সাধারণ চিত্র হয়ে উঠেছে। কৃষিক্ষেত্র ছাড়াও শ্রমিক হিসেবে পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে আজ নারীরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় অংশগ্রহণ করছেন। এমনকি অনেক নারী এখন অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বিদেশেও কাজ করছেন ও দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। কিন্তু আমরা জানি কৃষিশ্রমিক থেকে শুরু করে নির্মাণ শ্রমিক, পোশাক কারখানা থেকে শুরু করে অন্যান্য কারখানায় কর্মরত নারীরা মজুরিবৈষম্যের শিকার। আমাদের অনেক নারী উদ্যোক্তা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন, যা বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে আসার জন্য অন্য নারীদের উৎসাহিত করছে। পাশাপাশি পর্বতারোহণ, শান্তিরক্ষা, খেলাধুলা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নারীরা আজ দেশে-বিদেশে কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখে দেশের জন্য বয়ে আনছেন অভূতপূর্ব সম্মান। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের এসব উজ্জ্বল অর্জন মোটেই সহজসাধ্য বিষয় ছিল না কিংবা এখনো সহজ নয়। এজন্য তাদের পারিবারিক, সামাজিক বিভিন্ন প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়েছে ও হয়।
পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের নারী নির্যাতন, যৌতুক, অ্যাসিড নিক্ষেপ, ফতোয়া বন্ধে দেশে প্রয়োজনীয় আইন প্রণীত হয়েছে, প্রণীত হয়েছে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি, প্রবর্তিত হয়েছে জেন্ডার বাজেটিং। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের সাফল্য আজ আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। এই অবস্থার পরেও আমরা প্রতিদিন সংবাদপত্রে ধর্ষণ ও উত্ত্যক্তকরণসহ বিভিন্ন নারী নির্যাতনের সংবাদ দেখি, যা ঘটছে পরিবার, রাস্তাঘাট, যানবাহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতসহ সর্বত্র। কোনো স্থানই নারীর জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। আইন প্রণীত হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত আমরা বাল্যবিয়ের প্রকোপ লক্ষ করছি। এসব নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জ্বলন্ত উদাহরণ।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যে আমাদের সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি এই ঘটনাগুলোকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করে না। মানবাধিকার সম্পর্কে আমাদের দেশের নাগরিক সমাজের যাদের উচ্চকিত কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায়, তারা এই ঘটনাগুলোকে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হিসেবে দেখেন এবং সেই অবক্ষয় প্রতিহত করতে নানা ব্যবস্থাপত্র দেন। কিন্তু এগুলোকে তারা মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেন না। পাশাপাশি তারা রাষ্ট্র কর্তৃক বাক্স্বাধীনতা রহিত হওয়ার ঘটনাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে ঠিকই দেখতে পান। কিন্তু ধর্মভিত্তিক বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইনের মাধ্যমে উত্তরাধিকারে সমান অধিকার দেওয়া থেকে নারীকে বঞ্চিত করে রাষ্ট্র যে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে নাগরিক সমাজ সেটা কখনোই দেখতে পায় না। রাজনৈতিক দলগুলো তো নয়ই।
আমাদের দেশে ধর্মকে ব্যবহার করে সংবিধানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে নারীর প্রতি প্রতিনিয়ত ঘৃণ্য বক্তব্য রাখা হয়, নারীর অবাধ চলাচল রহিত করা হয় এবং তার ওপর নিয়মিত সহিংস আক্রমণ চালানো হয়। ধর্মের নামে সংবিধান লঙ্ঘন করে উত্তরাধিকারসহ পারিবারিক সম্পদ ও সম্পত্তিতে নারীকে সমান অধিকার দেওয়া হয় না। রাষ্ট্র, আইন মন্ত্রণালয় ও বিচারব্যবস্থা এ বিষয়ে চোখ বন্ধ করেই রাখেন। এর ফলে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মূল পাটাতন গড়ে উঠতে পারে না। এই বঞ্চনার কুফল নারীর ওপর বিভিন্নভাবে পড়ে। জামানত দেওয়ার সক্ষমতা না থাকায় ব্যবসায়ী নারীরা ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণসুবিধা পান না, যে কারণে তাদের আগাগোড়া ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাই থেকে যেতে হয়। নিজের নামে জমি না থাকায় আমাদের দেশের নারীরা সব ধরনের কৃষিকাজ করলেও সরকারি সহায়তা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন।
উত্তরাধিকারসহ পারিবারিক সম্পদ ও সম্পত্তিতে সমান অধিকার না থাকায় শিশু বয়স থেকেই পরিবারে মেয়েশিশুকে লালন-পালন করা হয় মূলত একটা উপযুক্ত পাত্র দেখে বিয়ে দিয়ে অন্য বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। পরিবারের এই মানসিকতা যেমন বাল্যবিয়ে বৃদ্ধি করে, তেমনি জীবনভর নারীদের পরজীবী হিসেবে গণ্য হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করে দেয়। পরিবারে তারা হুকুমের দাসীতে পরিণত হন। এই আচরণ প্রত্যেক নারীর মধ্যে একটা উদ্বাস্তু মানসিকতার জন্ম দেয়। এর থেকে বের হয়ে আসতে তাদের ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি প্রচেষ্টা চালাতে হয়।
পাশাপাশি পরিবারের দ্বিতীয় শ্রেণির সদস্য হিসেবে গণ্য হওয়া নারীদের প্রতি নানা ধরনের বৈষম্য-নির্যাতন হতে দেখে পরিবারে বসরবাসরত অন্য সব সদস্যের মধ্যেও পুরুষ আধিপত্য ও অগণতান্ত্রিক মনমানসিকতার চর্চা পুনরুৎপাদিত হয়, যে ধরনের আচরণ সমাজ-রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্তরায় হিসেবে ভূমিকা রাখে। কারণ পরবর্তী জীবনে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে তারা পরিবার থেকে শেখা এই আচরণ ও মানসিকতা নিয়েই যোগ দেয় ও অগণতান্ত্রিক আচার আচরণ অব্যাহত রাখে। এই অগণতান্ত্রিক আচরণই পরে রাজনীতি ও নির্বাচনেও প্রতিফলিত হয়।
আমাদের সমাজ এখনো পরিবারের সব সদস্যের সেবাকাজের দায়িত্ব নারীর ওপরই চাপিয়ে দেয়। সবার সেবাযত্ন সন্তান জন্মদান ও লালন-পালন, পরিবারের অসুস্থ সদস্যদের দেখভাল, রান্নাবান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা প্রভৃতি কাজের ভার সামলিয়ে তাদের পক্ষে নিজের বিকাশের লক্ষ্যে কোনো কিছু করা সম্ভব হয় না। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই সমুদয় কাজই আনপেইড তথা মজুরিবিহীন। সারা বিশ্বেই এখন এই শ্রমের মূল্য জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে অগ্রগতি সামান্যই।
এই সামগ্রিক অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে স্থায়িত্বশীল করতে হলে উত্তরাধিকারসহ পারিবারিক সম্পদ ও সম্পত্তিতে সমান অধিকার নিশ্চিত করে সার্বজনীন পারিবারিক আইন প্রণয়ন করা জরুরি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখনো পর্যন্ত উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকারের বিরুদ্ধে ধর্মকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তার এক বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন যে, ‘বাস্তবে ধর্মীয় বিধি না মানলেও নারীদের সঙ্গে সম্পত্তি ভাগের সময় সবাই ধর্মীয় নিয়মের কথা বলেন’। আমরা দেখেছি, উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকারের প্রশ্নে ধর্মের দোহাই দেওয়া হলেও দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থে মা, স্ত্রী, বোন, কন্যার নামে সম্পত্তি কেনার বেলায় ধর্ম ব্যবসায়ীদের মধ্যে কোনো উদ্বেগ দেখা যায় না। এমনকি বিভিন্ন জায়গায় ব্যক্তি উদ্যোগে যেসব মাদ্রাসা-মসজিদ গড়ে ওঠে তার একটা বড় অংশের পেছনেই অসৎ উপায়ে অর্জিত অর্থ বিনিয়োগ করা হয়। এ ক্ষেত্রেও আমরা ধর্ম ব্যবসায়ীদের কোনো কথা বলতে শুনি না। কালো টাকা এখানে ধর্মের নাম করে সাদা হয়ে যায়!
রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণে তাদের ভূমিকা স্পষ্ট করতে হবে, যদি তারা সত্যিকারভাবেই গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী হয়। আর এই বৈষম্য দূর করার প্রধান খুঁটি অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, যা পারিবারিক, সামাজিক ও আইনগত বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমেই করা সম্ভব। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘নারী, ব্যবসা ও আইন’ শীর্ষক বিশ্বব্যাংকের এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নারীরা অর্থনৈতিক অধিকারে অনেক পিছিয়ে আছে। বিশ্বের ১৯০টি দেশের মধ্যে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ৪৯.৪ এবং দেশগুলোর মধ্যে অবস্থান ১৭৩তম। এই অবস্থার কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে আইনি বাধা ও সহায়ক আইন না থাকাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২২-এ আমরা আশা করি এসব বাধা উপেক্ষা করে উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের পক্ষে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এটা করা সম্ভব হলে নারীর সমান নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মানসিক ও বাস্তব বাধা দূর হবে এবং নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য নিরসনের পথ প্রশস্ত হবে। আর বৈষম্য নিরসন হলেই কেবল উন্নয়নকে স্থায়িত্বশীল করা সম্ভব হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের ‘বৈষম্যহীনতা’র মূল চেতনা বাস্তব রূপ লাভ করবে।
লেখক মুক্তিযোদ্ধা ও নারীনেত্রী নির্বাহী পরিচালক বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ
