পুঁজিবাজারে আতঙ্ক দুই বছরে সর্বোচ্চ পতন

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২২, ১১:৩৫ পিএম

ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেই পোর্টফোলিও খালি করে সাইড লাইনে ফিরে গেছেন। এরপর থেকেই বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজের ঋণাত্মক ইকুইটি, জ্বালানি তেলের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা ছাড়ানো হয়, যার প্রভাব পড়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীনির্ভর পুঁজিবাজারে। তবে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর দরপতন ত্বরান্বিত হয়। আর ইউক্রেন যুদ্ধের ১২তম দিনে এসে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি করতে থাকলে ভয়াবহ পতন দেখা দেয় পুঁজিবাজারে।

গতকাল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন হওয়া ৯৬ শতাংশ শেয়ারের দরপতনে প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স কমেছে ১৮২ পয়েন্ট, যা গত প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে ২০২০ সালের ১৬ মার্চ ডিএসইর প্রধান সূচকটি ১৯৬ পয়েন্ট হারিয়েছিল। এরপর শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের নেতৃত্বে নতুন কমিশন গঠনের পর বাজারে উন্নতি দেখা দিলেও ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল ব্যাপক পতনে ১৮১ পয়েন্ট হারায় সূচকটি। এরপর গতকালের পতন শিবলী রুবাইয়াত কমিশনের আমলে সর্বোচ্চ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর দিন গত ২৪ ফেব্রুয়ারিতেও সূচকটি ১০০ পয়েন্টের বেশি হারিয়েছিল। 

পুঁজিবাজারের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারির শুরুতে সূচক ৭ হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করলে বড় বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে সাইড লাইনে ফিরে যেতে শুরু করেন। এতে করে ক্রেতা সংকট তৈরি হলে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি নিয়মিত পতন দেখা যায়। ধারাবাহিকভাবে লেনদেন কমে একপর্যায়ে তা ৬০০ কোটি টাকার ঘরে নেমে আসে। জ্বালানি তেলের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধি ও জাহাজ ভাড়াসহ পুরো বিশে^ কাঁচামালের দাম বাড়তে থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়। বড়দের পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও পোর্টফোলিও খালি করে সাইড লাইনে ফিরে যেতে শুরু করেন। গতকাল লেনদেন শুরুর সময়ে বিশ^বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ১৩০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে আতঙ্কিত সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নিজেদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করলে বড় পতনের ধারা দেখা দেয়।

বিনিয়োগকারীদের শঙ্কা, জ্বালানি তেলের দর বাড়লে জাহাজ ভাড়াসহ সব পণ্যের দাম বাড়বে, যা কোম্পানির উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনায় আমদানি ব্যয় বাড়ায় পণ্যবাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ, তাই এখানে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। তবে শুধু যুদ্ধ নয়, গতকালের এ দরপতনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও বড় বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তা, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অতিমাত্রায় দরপতনের ভীতি এবং কৌশলী বিনিয়োগকারীদের দরপতন উসকে দেওয়াকে বড় কারণ বলে করেন পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট এবং বিশ্লেষকরা। গতকালের শেয়ার কেনাবেচায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশেই ছিল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অবদান।

ইউক্রেন যুদ্ধ ছাড়াও নেগেটিভ ইকুইটি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক সময়ের সার্কুলারও বাজারে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে বলে মনে করছেন ডিএসইর ব্রোকারেজ হাউজগুলোর সংগঠন ডিবিএর সভাপতি রিচার্ড ডি রোজারিও। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাজার এখন ১১ মূল্য-আয় অনুপাতে (পিই রেশিও) রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যারা লোকসানে শেয়ার বিক্রি করছেন, তাদেরকে আবার কয়েক দিন পর উচ্চমূল্যে শেয়ার কিনতে হবে। তিনি জানান, এ মুহূর্তে বাজারকে সাপোর্ট দিতে বিশেষ তহবিল প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য আগের ৯০০ কোটি টাকার তহবিল রয়েছে, সেটা দেওয়া হলে বাজার উপকৃত হবে।

মহামারীর ধাক্কা সামলে বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করায় বেড়ে গেছে জ্বালানি তেলের চাহিদা। এর মধ্যে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে যুদ্ধ বাধিয়ে দিলে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। রাশিয়ার আগ্রাসনের জবাবে মস্কোর তেল-গ্যাসের ওপর যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ আরোপের সম্ভাবনার খবরে গতকাল তেলের দাম উঠে যায় ১৩০ ডলারে, যা ২০০৮ সালের পর সর্বোচ্চ। স্বাভাবিকভাবেই তেলের বাজারের ধাক্কা লাগে বিশ্ব পুঁজিবাজারে।

এদিকে দরপতন শুধু ঢাকার পুঁজিবাজারে নয়, জাপানের টোকিও থেকে শুরু করে চীন, হংকং, সিঙ্গাপুর, ভারত, লন্ডন হয়ে বিশ্বের সব শেয়ারবাজারেও বড় দরপতন হয়েছে। চীনের সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের সাংহাই কম্পোজিট ইনডেক্স ৩.১১ শতাংশ পতন হয়েছে। হংকংয়ের হ্যাংস্যাং সূচকের পতন হয়েছে ৩.৮৭ শতাংশ। জাপানের নিক্কি সূচকের ২.৯৪ শতাংশ, ভারতের মুম্বাই শেয়ারবাজারের সেনসেক্স সূচকের পতন হয়েছে ২.৭৪ শতাংশ। তেলের দাম নিয়ে ওই আতঙ্কই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে সূচক পতনের বড় কারণ বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ১৮২ দশমিক ১২ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ কমে ৬৪৫৬ পয়েন্টে নেমেছে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ২৪ ফেব্র“য়ারি থেকে শুরু হওয়া ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পর গতকাল পর্যন্ত ডিএসইএক্স সূচকের পতন হয়েছে ৪৯২ পয়েন্ট বা ৭ শতাংশ। অবশ্য চলতি দরপতন শুরু হয়েছিল ইউক্রেন যুদ্ধেরও আগে থেকে, গত ১৪ ফেব্র“য়ারি। সেদিন থেকে ডিএসইএক্সের পতন হয়েছে ৬৩৩ পয়েন্ট বা ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

মার্চেন্ট ব্যাংক আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, অর্থনীতিতে ইউক্রেন যুদ্ধের সরাসরি বড় প্রভাব না থাকলেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবসহ নানা কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দরপতনের ভীতি সঞ্চার রয়েছে। বিশে^র বড় বড় পুঁজিবাজারের দরপতন দেখে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মনোস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হচ্ছে। এ কারণে হয়তো শেয়ার বিক্রি করে নিজের পুঁজিকে কিছুটা রক্ষার চেষ্টা করছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত