গুঁড়িয়ে দিয়ে তৈরি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের শতাধিক ঘর

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২২, ০৭:২০ এএম

নিম্নমানের উপকরণ ও নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর গাজীপুরে মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উপহার হিসেবে নির্মাণাধীন শতাধিক ঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভেঙে ফেলা ঘরগুলোতে সিমেন্ট, বালি, রড, ইট ও খোয়া থেকে শুরু করে দরজা-জানালায়ও অতি নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছিল বলে জানায় এলাকাবাসী। এমন পরিস্থিতিতে সরেজমিনে দেখে ঘরগুলো মানসম্মতভাবে নির্মাণ হচ্ছে না মনে করে তা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন গাজীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস.এম সাদিক তানভীর। এরই ধারাবাহিকতায় গত তিনদিন ধরে গাজীপুর সদর উপজেলার তিন ইউনিয়ন এবং সিটি করপোরেশনের দুটি ওয়ার্ডে নির্মাণাধীন ঘরগুলো ভাঙার কাজ চলছে।

এলাকাবাসী বলছে, সঠিক তদারকির অভাবে নিম্নমানের সামগ্রী ও নির্দিষ্ট পরিমাণের তুলনায় কম সামগ্রী দিয়ে ঘরগুলো তৈরির সুযোগ পায় দায়িত্বপ্রাপ্তরা। আর ইউএনও বলেছেন, ঘরগুলো নতুন করে মানসম্মত উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হবে। তবে ঘরগুলো ভাঙা হলেও অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার তথ্য মেলেনি।

জানা গেছে, মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে ২০২০ সালের ১২ অক্টোবর শুরু হয় গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য ঘর তৈরির আশ্রয়ণ প্রকল্প। দ্রুততার সঙ্গে শেষ করার জন্য এ ঘরগুলো তৈরিতে কোনো ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এ কাজ সম্পন্নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দেখভালে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। খাসজমিতে তৈরি করা ঘরগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার কথা রয়েছে। ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত এ বাড়িগুলো দৃষ্টিনন্দন রঙিন টিনের দুই কামরার সেমিপাকা হওয়ার কথা। ঘরের আয়তন হবে দৈর্ঘ্যে ১৯ ফুট ৬ ইঞ্চি আর প্রস্থে ২২ ফুট ৬ ইঞ্চি। রান্নাঘর ও শৌচাগার থাকবে। প্রতি ১০ ঘরের জন্য একটি নলকূপ থাকার কথা। সব মিলিয়ে বাড়িপ্রতি ব্যয় বরাদ্দ রয়েছে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫০০ টাকা করে। ইটের সংখ্যা, সিমেন্ট ও বালুর পরিমাণও বলে দেওয়া হয় নকশা মোতাবেক। নির্দেশিকা অনুসারে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি অনুসরণ করার কথা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর সঙ্গে কোনো মিল দেখা যাচ্ছে না। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য একটি কমিটি থাকলেও সেই কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কোনো সমন্বয় করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

গাজীপুর সদরের ইউএনও জানান, তার উপজেলায় ১৬০টি ঘর নির্মাণের কাজ চলছে। নতুন করে আরও ৩০০টি ঘর নির্মাণের বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এর জন্য জমি খোঁজা হচ্ছে। শিগগিরই এসব ঘর নির্মাণের কাজও শুরু করা হবে।

১৬০টি ঘরের মধ্যে সদর উপজেলার বাড়িয়া, পিরুজালী ও ভাওয়াল মির্জাপুর ইউনিয়ন এবং সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের তিনটি জায়গায় নির্মাণাধীন শতাধিক ঘর নিম্নমানের উপকরণ ও সঠিক মালামাল দিয়ে তৈরি না হওয়ায় ইউএনও’র নির্দেশে ভেঙে ফেলা হয়েছে।

নিম্নমানের ঘর তৈরির দৃশ্য দেখে এলাকাবাসী ক্ষোভে ফেটে পড়ে। পিরুজালী এলাকার বাসিন্দা শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘সবার চোখের সামনে অনিয়মে ভরপুর ঘরগুলো তৈরি করা হলেও এ কাজগুলো দেখার কেউ নেই। ২৫ থেকে ৫০ ভাগ কাজ হয়ে যাওয়ার পর স্থানীয়দের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইউএনও ঘরগুলো ভেঙে দেন।’

নির্মাণাধীন ঘরগুলোর মধ্যে সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়নের কেশরিতা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উত্তরপাশে ৬টি, খুন্দিয়া এলাকায় ৯টি, ভাওয়াল মির্জাপুর নয়াপাড়া খালপাড় এলাকায় ১৫টি, পিরুজালী পাতিলবান্দা এলাকায় ৬০টি, মহানগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাশিমপুর গোবিন্দপুর এলাকায় ১৭টি, একই ওয়ার্ডের হাতিমারা কলেজের পাশে ৮টি এবং ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের হাতিয়াবো এলাকায় ১৪টি রয়েছে। এর প্রায় সবগুলো ঘর গত তিনদিনে ভেঙে ফেলা হয়। এর মধ্যে কিছু ঘরের নির্মাণকাজ প্রায় পুরোপুরি শেষ হয়েছিল, আবার কোনো কোনোটির ২৫ থেকে ৫০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছিল।

সরেজমিনে ওইসব এলাকায় গিয়ে শাবল ও হাতুড়ি দিয়ে ঘরগুলো ভেঙে ফেলতে দেখা যায় নির্মাণ শ্রমিকদের। ভেঙে ফেলা ঘরের মধ্যে যে বিম ঢালাই দেওয়া হয়েছিল তাতে একটি করে রড ব্যবহার করা হয়। আবার কোনোটিতে বিমের মধ্যে কোনো রডই দেওয়া হয়নি। ঢালাই দেওয়া বিমগুলোতে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গেই বালির মতো ভেঙে পড়ছে। নির্মাণাধীন দেয়ালগুলো বাঁশ দিয়ে ধাক্কা দিতেই ভেঙে পড়ছে মাটিতে। ঘরগুলোর কলামের মধ্যে ব্যবহার করা হয় নামমাত্র দুটি করে সরু রড। এছাড়া তৈরি করার পরপরই ঘরগুলোর মেঝেতে ফাটল ধরে। সামান্য আঘাতেই গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে পাকা মেঝেতে। ঠুনকো পাতলা প্লেনশিট  দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ঘরগুলোর দরজা-জানালা।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, নামমাত্র মাটি খুঁড়ে তৈরি করা হচ্ছিল ভূমিহীনদের জন্য বরাদ্দ ঘরগুলো। নির্মাণকাজ চলার সময় আশপাশের কোনো লোককে এর ধারেকাছে ভিড়তে দিত না নির্মাণকারীরা। কংক্রিটের মিশ্রণে দেওয়া হতো নামমাত্র সিমেন্ট। ঢালাইকাজে ব্যবহার করা হয় নিম্নমানের খোয়া ও বালু। ঘরের বিমে যেখানে চারটি করে রড দেওয়ার কথা সেখানে দেওয়া হয় একটি করে, আবার কোনোটিতে রড দেওয়াই হতো না। আবার যেসব পিলার (খুঁটি) তৈরি হয় তাতে দেওয়া হয় মাত্র দুটি করে চিকন রড। এলাকার কেউ নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের প্রতিবাদ করতে গেলে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে তাদের মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হতো।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস.এম সাদিক তানভীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় বিমে চারটি রড দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরে আমি চলে আসার পর জানতে পারি ওই রড উঠিয়ে সেখানে একটি করে রড দিয়ে ঢালাই দেওয়া হয়েছে। এরপর নানা প্রকার অভিযোগ পেয়ে সরেজমিনে দেখে ঘরগুলো মানসম্মতভাবে নির্মাণ হচ্ছে না মনে করে তা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়।’

এলাকাবাসী জানায়, ঘর তৈরির সময় সরকারি কোনো কর্মকর্তা বা দায়িত্বশীল কাউকে দেখা যায়নি। ঘরগুলো স্থানীয় লোক দিয়েও করা হয়নি। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ইউএনওকে প্রধান করে একটি কমিটি রয়েছে। যার সদস্য হলেন- উপজেলা প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও), সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। কিন্তু প্রকল্পের কাজ চলার সময় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কারও তদারকি না থাকায় নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছিল ঘরগুলো। যা নির্মাণ হতে না হতেই ভেঙে পড়তে বসেছিল।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নির্মাণকাজে যুক্ত শ্রমিক আলী হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের যে মালামাল দিয়ে কাজ করতে বলা হয় আমরা তা দিয়েই কাজ করি। ভালোমন্দ তাদের ব্যাপার। আমরা নিজেরাও জানি কাজটি খুব খারাপ হচ্ছে, তারপরও আমাদের কিছুই করার নেই। আমরা রোজ হিসেবে টাকা পাই, আর কাজ করি।’

এ প্রসঙ্গে মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুল হক মুসল্লি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর তৈরি হয়ে গেলে আমাদের কাছ থেকে গৃহহীনদের নাম নেওয়া হয়। এছাড়া এ প্রকল্পের কোনো কাজে আমাদের ডাকা হয় না এবং জানানোও হয় না। সমস্ত কাজই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা করে থাকেন।’ আশ্রয়ণ

আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাজে অনিয়মের অভিযোগের ব্যাপারে বক্তব্য জানতে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে একাধিক বার গিয়ে এবং তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করে ও বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত