প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা নারী প্রধানমন্ত্রী। বিশ্ব নারী দিবসে তার একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম খালিজ টাইমস। সেখানে দেশের উন্নয়ন, করোনা পরিস্থিতি ও বাংলাদেশ নিয়ে নিজের ভাবনা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কথা বলেছেন দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়েও। আমিরাতে খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি সফল করতে নিরবচ্ছিন্ন খাদ্যপণ্য ও কৃষিশ্রমিক সরবরাহের আশ্বাসও দিয়েছেন।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সংবাদমাধ্যমটির জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অশ্বিন কুমার। তার প্রথম প্রশ্ন ছিল ভিশন ২০২১ নিয়ে। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার ক্ষেত্রে কোন পদক্ষেপ বড় ভূমিকা রেখেছে?
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের এ অর্জনের মূলে রয়েছে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভীত। জাতির পিতার স্বপ্ন অনুযায়ী আমরা আধুনিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছি। দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থানের জন্য বড় বিনিয়োগ করেছি। ভিশন ২০২১, ভিশন ২০৪১, ডেল্টা পরিকল্পনা, ‘মুজিব জলবায়ু উন্নয়ন পরিকল্পনা’ নিয়ে আমরা কার্যকরী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করেছি।
করোনা মহামারী-পরবর্তী বিশ্বে উন্নয়নের বাংলাদেশের পরিকল্পনা কী এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সামনের দিনগুলোতে আমাদের মূল লক্ষ্য থাকবে মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা। এজেন্ডা : ২০৩০-এ আমাদের মূল লক্ষ্য টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে করা। নতুন স্বাভাবিকের সঙ্গে সবাইকে মানিয়ে নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমরা ২০৩০ লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব।’
এলডিসি থেকে উত্তরণে বাণিজ্য ছাড়ে প্রভাব সামলানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিকল্পনা কী এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের জন্য এ উত্তরণ সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। প্রথমত এ উত্তরণ নিশ্চিতভাবেই বিশ্বমঞ্চে আমাদের ভাবমূর্তি পাল্টে দেবে।’ তিনি বলেন, ‘পদ্মা সেতু, রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা বন্দর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি, হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩, মেট্রো রেলের মতো মেগাপ্রজেক্ট খুব শিগগিরই শেষ হবে। এতে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা আরও বৃদ্ধি পাবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগের আরও সুযোগ পাবেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা সত্যি বাংলাদেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আমাদের জন্য আইএসএম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববাজারে এটি আমাদের সহায়তা করে। এছাড়া ডিউটি ফ্রি ও কোটা ফ্রি সুবিধাও পাচ্ছি না।’ তবে এ বাস্তবতা মোকাবিলা করতে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রস্তুত বলে জানান তিনি।
২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের তালিকায় উত্তরণ করার মূল কৌশল জানতে চাওয়া হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ লক্ষ্যমাত্রায় আমরা ২০৩১-এর মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের তালিকায় যুক্ত হতে চাই। আমাদের অর্থনীতিতে কৃষি খাতকে কীভাবে আরও উৎপাদনশীল করা যায় সেটার গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
খালিজ টাইমসের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হয়, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত দুই দেশই সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে। দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কেমন হবে? জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত যে বছর প্রতিষ্ঠা হয়, সেই ১৯৭১ সালেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। তাই দুই দেশের মধ্যে এক আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের সূচনা হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে। ১৯৭৪ সালে তার ঐতিহাসিক আমিরাত সফরে এর শুরু।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে ১৫০ কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়। বাংলাদেশে আমিরাতের বিনিয়োগ আড়াইশো কোটি ডলারেরও বেশি। সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে তাই দুই দেশের সম্পর্ক আরও উঁচুতে নিতে চাই আমরা। আমিরাত ২০৭১ লক্ষ্যমাত্রার ব্যাপারে আমরা জানি। এটি অর্জনে বাংলাদেশ সাগ্রহে আমিরাতের সঙ্গে কাজ করতে চায়। দুই দেশই যেন সর্বোচ্চ দ্বিপক্ষীয় সুবিধা পায় সেটি আমরা দেখব।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মানবসম্পদ উন্নয়ন, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, উৎপাদন ও সেবা খাতে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন। বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আমিরাতের ব্যবসায়ীরা স্বাগত। আমরাও আমিরাতের খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পে সহায়তা করতে প্রস্তুত। এজন্য আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে খাদ্যপণ্য ও কৃষিশ্রমিক সরবরাহ করতে প্রস্তুত আছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমিরাতের চাকরির বাজারে আমাদের অনেক কিছু দেওয়ার আছে। আমরা তাদের কাছ থেকে কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহায়তা চাই। আমরা তথ্য, প্রযুক্তি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা খাতে আমিরাতের সঙ্গে কাজ করতে উদগ্রীব।’
প্রবাসী কর্মীদের দক্ষতা নিয়ে বাংলাদেশের পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, আমরা কারিগরিভাবে দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরিতে গুরুত্ব দিচ্ছি। ছয়টি সমুদ্র প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট ও ৫৫টি বাণিজ্য সংগঠনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে তিন লাখেরও বেশি শ্রমিককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাতে কাজ করা নারীদের ছয় মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডও নতুন আটটি বাণিজ্য শিক্ষা কারিকুলামে যুক্ত করেছে। সরকার দুই লাখ মানুষকে ড্রাইভিং শেখাচ্ছে।’
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা নারীর ক্ষমতায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের লক্ষ্য এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও কথা বলেন।
