শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড! কিন্তু কোন শিক্ষা?

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২২, ০১:৩০ এএম

‘শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। কোনো জাতিকে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে হলে, তাকে শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নত হতে হবে। সঠিক বা সত্যিকার শিক্ষা না-থাকলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ‘অশিক্ষিত’ হয়ে পড়লে জাতি কোনো দিনই মাথা সোজা করে দাঁড়াতে পারে না।’ এ ধরনের আপ্তবাক্য আমরা সব সময় শুনি। আমাদের সামাজিক মুরব্বি, আমাদের শিক্ষক এবং আমাদের গুরুজনরা এ কথা হরহামেশা বলে শিক্ষার গুরুত্ব আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। আমাদের প্রজন্মের অনেকেই এসব শুনে শুনেই বড় হয়েছি।

কিন্তু শিক্ষা বলতে আমরা আদতে কী বুঝি? কোন ধরনের শিক্ষাকে আমরা শিক্ষা বলব? শুধুই বিদ্যালয়কেন্দ্রিক রুটিনমাফিক পাঠদানকেই কি আমরা শিক্ষা বলব? নাকি, সত্যিকার জীবনমুখী শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের মতো মানুষ হওয়াকে শিক্ষা বলব? আবার কোনটা সঠিক শিক্ষা বা কোনটা সঠিক শিক্ষা নয়, সেটার মানদন্ড কে নির্ধারণ করবে? এসব প্রশ্নও শিক্ষা আর জাতির মেরুদন্ড সম্পর্কিত কেন্দ্রীয় আলাপমালায় উঁকিঝুঁকি মারে। তাই, এসব প্রশ্নের সঙ্গে আরামদায়ক বোঝাপড়া না-সেরে মেরুদন্ড বানানোর চিন্তা এবং চেষ্টা মেরুদন্ড এবং শিক্ষা দুটোর জন্যই কষ্টদায়ক হতে পারে। তাই, শিক্ষার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও বিধেয় ঠিক করা জরুরি। পাশাপাশি, শিক্ষাপদ্ধতি এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিরও একটা সঠিক মূল্যায়ন জরুরি।

মাঝেমধ্যেই আমি স্যাটায়ার করে বলি, ‘বাংলাদেশে এখন শিক্ষার্থী খুব একটা চোখে পড়ে না, শিক্ষার্থী নামের যারা বিদ্যালয় বা বিদ্যার আলয়ে আছে তারা কোনো না কোনো বর্গের পরীক্ষার্থী।’ সবাই পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত। কে কতটুকু শিখছে বা কে কতটুকু শিক্ষাগ্রহণ করেছে, তার চেয়ে সবাই বেশি ব্যতিব্যস্ত পরীক্ষা নিয়ে এবং পরীক্ষায় কে কতটা ‘জিপিএ’ পেল তা নিয়ে! পরীক্ষার্থীরা ব্যস্ত! শিক্ষকরা ব্যস্ত! পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকরাও ব্যস্ত। সবাই ছোটাছুটি করছে। পুরো জাতি যেন কিছু জিপিএর পেছনে ছুটছে।

ফলে, শিক্ষা বলতে আমরা যা বুঝি, তা আসলে রুটিনমাফিক ফি-বছর পরীক্ষা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে উঠেছে। তাই, এই পরীক্ষার্থীরা কোন পুঁজি নিয়ে জাতির মেরুদন্ড হয়ে উঠবে, এবং জাতির মেরুদন্ড বিকাশে শক্ত অবদান রাখবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয়ের অবকাশ আছে। কেননা, যে শিক্ষা শিক্ষার্থীদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে বিস্তারিত করে না, সমাজ-দেশ-রাষ্ট্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদান করে না, ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি নিয়ে একটা সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্ব তৈরি করে না, এবং একটা সত্যিকার দেশপ্রেমিক প্রজন্ম হিসেবে গড়ে তুলে না, তাকে কি আমরা শিক্ষা বলতে পারি? আর যে শিক্ষাকে সত্যিকার শিক্ষা বলতে পারি কি না, তা নিয়ে বিস্তর সংশয় আছে সে শিক্ষা দিয়ে একটি জাতির মেরুদন্ড কতটা শক্তভাবে, পোক্তভাবে, টেকসই ও মজবুতভাবে তৈরি করা যাবে, তা সত্যিকার অর্থেই ভাবনার বিষয়।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নানান ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। পরীক্ষার সময় নকল বন্ধ করা, কোচিং সেন্টার বন্ধ করা, বাজারে পাওয়া গাইড বইয়ের দৌরাত্ম্য থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে আনা এবং শিক্ষার্থীরা যাতে কিছু নির্বাচিত প্রশ্ননির্ভর পরীক্ষা না-দিয়ে গোটা বইটা মনোযোগ দিয়ে পড়ে, এবং যথাযথ পাঠোদ্ধার করতে পারে, তার জন্য নানান চেষ্টা করা হয়েছে।

পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য বিশেষ করে পাঠদান পদ্ধতি ও শিক্ষার্থীদের জ্ঞান মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনের জন্য সৃজনশীল প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা গ্রহণের একটি ব্যবস্থা শুরু করা হলো। এ পদ্ধতির মধ্যে একটা অভিনবত্ব এবং নতুনত্বের ছাপ ছিল। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, শিক্ষা নিয়ে সরকারি পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় পলিসির অংশ হিসেবে করা সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পেছনে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নই প্রধান লক্ষ্য।

শিক্ষানীতি প্রণয়ন-সংশ্লিষ্ট লোকজন প্রচুর সময়, মেধা, সাধনা ও গবেষণার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। বিশেষ করে, সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান ও মূল্যায়নের প্রক্রিয়া সর্বত্রই প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু সৃজনশীলতা একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়া! শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মাধ্যমে কাউকে সৃজনশীল করা যায় কি না তা নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন আছে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, গাইড ব্যবসায়ী, কোচিং সেন্টার ব্যবসায়ী এবং শিক্ষা ব্যবসায়ীরা সৃজনশীল প্রশ্নপত্রকেও অত্যন্ত সৃজনশীলতা দিয়ে একটা প্যাটার্ন তৈরি করে নতুনভাবে তাদের ব্যবসা খুলে বসে। ফলে, সৃজনশীল প্রশ্নপত্রের পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে সৃজনশীল করার সব আয়োজন কিছু ব্যবসায়ীদের বেনিয়া বৃত্তির কারণে গড়পড়তা ও বাজারি আকার ধারণ করতে শুরু করে।

এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার যে আসল লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য একজন শিক্ষার্থীকে সৃজনশীল, মননশীল এবং অনুভূতিশীল করে গড়ে তোলা সেটা আমাদের বিদ্যমান শিক্ষা কাঠামোয় খুব একটা ফলপ্রসূ হচ্ছে এটা দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যাবে না। এখানে আরও একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি, আমাদের অভিভাবকদের মধ্যে ছেলেমেয়েদের ভালো জিপিএ নিয়ে ভালো ফল করানোর যে প্রবণতা এবং দৌড়ঝাঁপ সেটাও শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার্থী বানানোর পেছনে অন্যতম একটা কারণ।

আর অভিভাবকের এসব অস্থিরতা এবং প্রতিযোগিতার মানসিকতাকে পুঁজি করে শিক্ষা ব্যবসায়ীরা নিজেদের রমরমা ব্যবসা খুলে বসেছেন। ফলে, শিক্ষার্থীদের বিদ্যার্থী এবং সত্যিকার শিক্ষার্থী বানানোর অন্তহীন রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা উদ্দিষ্ট ফল আনতে অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কিন্তু আশার কথা হলো সরকার এতেই হতোদ্যম হয়ে বসে নাই। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের ৬২টি স্কুলে নতুন শিক্ষাকার্যক্রমের পাইলটিং শুরু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ শ্রেণিতে এ পাইলটিং শুরু হয়েছে, যা ধীরে ধীরে আরও সম্প্রসারিত হবে। এসব পাইলটিংয়ের অভিজ্ঞতা থেকে নানান পরিমার্জন, পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মধ্য দিয়ে একটা নতুন ধরনের শিক্ষাপদ্ধতির এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষা মূল্যায়ন পদ্ধতির সম্ভাবনা এরই মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে।

পরিশেষে বলব, সত্যিকার শিক্ষা নিঃসন্দেহে একজন মানুষকে সত্যিকার মানুষ হিসেবে তৈরি করে। দেশ-বিদেশের নানান জ্ঞানভান্ডার থেকে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত জ্ঞান আহরণের পাশাপাশি একজন শিক্ষার্থীকে সত্যিকার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে শিক্ষা। শুধু পুথিগত শিক্ষার মাধ্যমে স্বার্থপর, ভোগবাদী, লুটেরা এবং সার্টিফিকেট-সর্বস্ব গ্র্যাজুয়েট উৎপাদন করাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হতে পারে না।

যদি কোনো জাতির সত্যিকার শক্ত, মজবুত ও টেকসই মেরুদন্ড তৈরি করতে হয়, তাহলে প্রয়োজন গণমুখী শিক্ষা, জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা, এবং সত্যিকার মানুষ গড়ার শিক্ষা। রাষ্ট্র, সমাজ ও সমাজের মানুষের প্রতি যদি একজন শিক্ষার্থীর দৃঢ় কমিটমেন্ট না-থাকে বা যে শিক্ষা সে কমিটমেন্ট তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, সে শিক্ষা কোনো দিন কোনো জাতির মেরুদন্ড হতে পারে না।

লেখক নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত