ইয়েমেনে অপহরণের ২৭ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো খোঁজ মেলেনি জাতিসংঘ কর্মকর্তা বাংলাদেশি নাগরিক লে. কর্নেল (অব.) এ কে এম সুফিউল আনামের। তিনি জীবিত না মৃত সে বিষয়েও কোনো তথ্য পাচ্ছেন না পরিবারের সদস্যরা। প্রায় এক মাস ধরে সুফিউলের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় তার স্ত্রী নাসরিন আনাম ও দুই সন্তানসহ ঘনিষ্ঠজনরা মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিন পার করছেন। অজানা আতঙ্কের মধ্যে সময় কাটছে তাদের। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে সুফিউল আনামকে উদ্ধারের আকুতি জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। তাদের শুধু একটাই চাওয়া সুফিউল যেন জীবিত অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরে আসতে পারেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুফিউল আনামের পরিবারের একাধিক সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানান, গত ১১ ফেব্রুয়ারি ইয়েমেনের আবিয়ান প্রদেশ থেকে সুফিউলসহ জাতিসংঘের পাঁচ কর্মী অপহৃত হন। তিনি ছাড়া অন্য সবাই ইয়েমেনেরই নাগরিক। অপহরণকারীদের প্রসঙ্গে কেউ বলছেন ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো তাদের অপহরণ করেছে। আবার কেউ বলছেন সেখানে সক্রিয় জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা ইন অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা (একিউএপি) এই অপহরণের সঙ্গে যুক্ত। যারা মুক্তিপণ হিসেবে ৫ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪৩ কোটি ১১ লাখ ১৫ হাজার ৯৫০ টাকা দাবি করেছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের জেলে আটক তাদের কিছু সদস্যকেও মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
স্বজন ও সহকর্মীরা বলেন, সাবেক সেনা কর্মকর্তা সুফিউল আনাম ১৭ বছর ধরে জাতিসংঘে কাজ করছেন। দেশের জন্য অনেক গৌরব বয়ে এনেছেন। আজ তার এই পরিণতিতে পরিবারের সদস্যরা মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছেন। নানা শঙ্কা নিয়ে দিন পার করছেন। অপহৃত সুফিউলের স্ত্রী নাসরিন আনাম রাজধানী ঢাকার বাসায় অবস্থান করছেন। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে পড়াশোনা শেষে কানাডায় চাকরি করছেন। যারা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মাধ্যমে বাবার সন্ধান করছেন। কিন্তু কোনো পক্ষ থেকেই সঠিক কোনো তথ্য পাচ্ছেন না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা অপহৃত সুফিউল আনামের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। অপহরণকারী গোষ্ঠীর সঙ্গেও স্থানীয়ভাবে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন জাতিসংঘ কর্মকর্তারা। তবে অপহৃত সুফিউলের সঙ্গে তারা সরাসরি যোগাযোগ করে উঠতে পারেননি। তিনি বেঁচে আছেন কিনা সে বিষয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনে যুদ্ধাবস্থা চলছে। সে সময় রাজধানী সানা আক্রমণ করে আবদ-রাব্বু মানসুর হাদির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে হুতি বিদ্রোহীরা। পরে ২০১৫ সালের মার্চে হাদি সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় আনতে দেশটিতে হস্তক্ষেপ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জোট। এরপর থেকে এ দুইপক্ষের মধ্যে লড়াই চলে আসছে।
কুমিল্লায় জন্ম নেওয়া সুফিউল আনাম ২৯ বছর সেনাবাহিনীতে চাকরির পর ২০০৫ সালে অবসরে যান। এরপর ১৭ বছর ধরে জাতিসংঘে নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করছেন। এ বছরই তার অবসরে যাওয়ার কথা ছিল।
সুফিউলের সহকর্মীরা বলছেন, ইয়েমেনে কার্যকর কোনো সরকার নেই। বিদ্রোহীরা সেখানে আছে। ২৯ বছর সেনাবাহিনী এবং ১৭ বছর জাতিসংঘে চাকরি করা সুফিউলের এমন বিপদের সময় বাংলাদেশ সরকার কিংবা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কূটনৈতিক চাপ তৈরি করা হলে তার মুক্তি ত্বরান্বতি হবে।
তারা আরও বলেন, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সুফিউলের খবর নিচ্ছি, খবর দিচ্ছি। কিন্তু এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। অবশ্য জাতিসংঘের পক্ষ থেকে দরকষাকষি চলছে স্থানীয় আদিবাসী নেতাদের সঙ্গে।
এক স্বজন জানান, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে দেখা করে সুফিউলকে উদ্ধারের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান তার পরিবারের সদস্যরা। তখন তিনি সুফিউলকে উদ্ধারের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বর্তমানে দেশের বাইরে থাকায় এ বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অপহৃত সুফিউল আনামের স্ত্রী নাসরিন আনাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ও আমার পরিবারের একটাই চাওয়া উনি (সুফিউল) যেন নিরাপদে, জীবিত অবস্থায় আমাদের মাঝে ফিরে আসে। আমরা তার ফিরে আসার অপেক্ষায় আছি।’
