কুড়িগ্রামে মধ্যরাতে সাংবাদিক হেনস্তা

ডিসির পর আরডিসিকেও ক্ষমা করলেন রাষ্ট্রপতি

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২২, ০৬:৩৯ এএম

কুড়িগ্রামের সাবেক আরডিসি (রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর) নাজিম উদ্দিনকেও ক্ষমা করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। মধ্যরাতে সাংবাদিক হেনস্তার দায়ে অসদাচরণের অভিযোগে তাকে দুই বছরের জন্য নিম্নধাপে নামিয়ে দেওয়া হয়। আপিল করলে রাষ্ট্রপতি নাজিম উদ্দিনের নিম্নপদে নামিয়ে দেওয়ার গুরুদ- বাতিল করেন। গত সোমবার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

একই ঘটনায় অভিযুক্ত কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীনকেও গত ২৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেন।

অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামকে ২০২০ সালের ১৩ মার্চ গভীর রাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে মাদক রাখার অভিযোগে এক বছরের কারাদ- ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা ওই অভিযান পরিচালনা করেন। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের আরডিসি সিনিয়র সহকারী কমিশনার নাজিম উদ্দিন এবং সহকারী কমিশনার এস এম রাহাতুল ইসলামও  সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কুড়িগ্রামের ওই সময়কার ডিসি সুলতানা পারভীনের নির্দেশেই আরিফুল ইসলামকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয় বলে আরিফুলের পরিবারের অভিযোগ।

বিসিএস ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তা সুলতানা পারভীন সরকারি একটি পুকুর সরকারি অর্থে সংস্কার করে তার নিজের নামে ‘সুলতানা সরোবর’ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যা নিয়ে ‘কাবিখার টাকায় পুকুর সংস্কার করে ডিসির নামে নামকরণ’ শিরোনামে বাংলা ট্রিবিউনে প্রতিবেদন করেছিলেন নিউজ পোর্টালটির কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম। এ ছাড়াও জেলায় তার নানা অনিয়ম নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন আরিফুল। এসব কারণে ডিসি তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে সাজা দিয়ে তাকে জেলে পাঠিয়েছেনÑদেশ রূপান্তরের কাছে এমনটাই অভিযোগ করেছিলেন আরিফুল ইসলাম।

মধ্যরাতে সাংবাদিককে নিজ বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়ার ঘটনা দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। বিষয়টি উচ্চ আদালতে গড়ায়। এখনো এ সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। বিষয়টির তদন্তই শুরু করেনি স্থানীয় পুলিশ। 

সাংবাদিক হেনস্তার ঘটনায় কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীন, আরডিসি নাজিম উদ্দিন, সহকারী কমিশনার এস এম রাহাতুল ইসলাম ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমাকে প্রত্যাহার করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। নাজিম উদ্দিন অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণীর প্রেক্ষিতে ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশ নেন। তার জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় পুরো বিষয়টি তদন্ত করার জন্য তিন সদস্যের বোর্ড গঠন করা হয়। অসদাচরণের সব অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় বোর্ড তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের গুরুদ- দেয়। এই অবস্থায় নাজিম উদ্দিনকে দ্বিতীয় কারণ দর্শানো নোটিস দেওয়া হয়। ফের অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা অনুযায়ী তাকে দুই বছরের জন্য নিম্নপদে নামিয়ে দেওয়ার গুরুদ- দেওয়া হয়। এই দ-ের সঙ্গে পাবলিক সার্ভিস কমিশনও একমত পোষণ করে। তিনি ছিলেন ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা। তাকে দুই বছরের জন্য সপ্তম গ্রেডে এবং সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে সহকারী সচিব পদে নামিয়ে দেওয়ার প্রজ্ঞাপন জারি হয় গত বছরের ২৪ নভেম্বর। নাজিম উদ্দিন তার গুরুদ- মওকুফ করতে গত ১৫ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন জানান। তিনি সদয় হয়ে ষষ্ঠ গ্রেড হতে সপ্তম গ্রেডে এবং সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে সহকারী সচিব পদে নামিয়ে দেওয়ার শাস্তি বাতিল করেন।

ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মধ্যরাতে সাংবাদিক আটকের সময় সেখানে উপস্থিত না থাকার দাবি করেছেন আরডিসি নাজিম উদ্দিন। তিনি কেবল কাস্টডি ওয়ারেন্টের সাজাপ্রাপ্ত আসামি সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে জেলখানায় গ্রহণের পদ্ধতিগত আনুষ্ঠানিকতা করার দাবি করেছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কারণ দর্শানো নোটিসের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। গত বছরের ৩ জুন তিনি কারণ দর্শানোর নোটিসের জবাব দেন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকার দাবি করলেও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমার কারণ দর্শানো নোটিসের জবাবে নাজিম উদ্দিনের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতির তথ্য-প্রমাণ বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশ হয়েছে।

মধ্যরাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে কুড়িগ্রামে সাংবাদিক আটকের ঘটনায় তৎকালীন ডিসি সুলতানা পারভীনকে দুই বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) স্থগিত করে লঘুদ- দেওয়া হয়েছিল, যা ক্ষমা করেছেন রাষ্ট্রপতি। ডিসি সুলতানা পারভীনের আগে এডিসি রাহাতুল ইসলামের তিনটি ইনক্রিমেন্ট কর্তন করা হয়েছে। আর রিন্টু বিকাশ চাকমাকেও শাস্তির আওতায় আনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

কারণ দর্শানো নেটিসের জবাবে সুলতানা পারভীন জানিয়েছিলেন, তিনি মধ্যরাতে সাংবাদিক আটক ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় ঘুমিয়ে ছিলেন। মোবাইল ফোনে আসা ‘মিসড’ কল নম্বরে পরের দিন সকালে ফোন ব্যাক করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিবের কাছ থেকে প্রথম ঘটনা শুনেছেন।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বিভাগীয় মামলায় সুলতানা পারভীনের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার অভিযোগ আনা হয়। এর জবাবে তিনি বলেছেন, পত্রিকাগুলো কিসের ভিত্তিতে এ অভিযোগ করেছে তা তার বোধগম্য নয়। তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য কোনো মৌখিক বা লিখিত নির্দেশনা দেননি। এ বিষয়ে তিনি অবগতও ছিলেন না।

কুড়িগ্রামে সাংবাদিক হেনস্তার মতো ঘটনার বিভাগীয় বিচার দ্রুত শেষ করা হয়েছে। সাধারণত এ ধরনের চাঞ্চল্যকর ঘটনার বিভাগীয় বিচারে আরও সময় লাগে। এ ঘটনার বিচারে অপেক্ষাকৃত কম সময় লাগলেও বিচারের শাস্তি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন হেনস্তার শিকার সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম। তিনি গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির মার্জনা করার কথা শুনে খুব হতাশ লাগছে। ডিসির পর আরডিসিকেও মার্জনা করলেন তিনি। কাউকে ক্ষমা তিনি করতেই পারেন। কিন্তু এ ক্ষমা এ দেশে সাংবাদিকতাকে আরও কঠিন করে তুলবে। একদিকে অপরাধী হয়েও তারা ছাড়া পাচ্ছেন, অন্যদিকে তাদের বিরুদ্ধে যে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে তার তদন্ত করছে না পুলিশ। এতে নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি কেবল কর্মকর্তাদের নয়, আমারও। আমি ন্যায় বিচার পাইনি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত