জিকে শামীমকে সুবিধা দেওয়া প্রকৌশলীকে ‘প্রাইজ পোস্টিং’

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২২, ০৬:৫৮ এএম

কাজ না করা সত্ত্বেও বিতর্কিত ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া (জিকে) শামীমের প্রতিষ্ঠানকে সাড়ে ১০ কোটি টাকা বিল দেওয়া প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফজলুল হককে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ দেওয়া হয়েছে। ওই ঘটনায় বিভাগীয় মামলা চলমান থাকার পরও গত ৮ মার্চ তাকে রাজশাহী সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পাঠানো হয়েছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে বাস্তবায়নাধীন আগারগাঁও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের আর্থিক ওই কেলেঙ্কারির ঘটনায় দুই দফা তদন্তে প্রাথমিকভাবে দোষী হয়েছেন তিনি।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকৌশলী ফজলুল হককে আমরা কোনো দায়মুক্তি দেইনি। তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্ত শেষে আমাদের প্রাশাসনিক মন্ত্রণালয়ে অধিকতর তদন্ত (বিভাগীয় মামলা) চলমান রয়েছে। এই মুহূর্তে আমাদের গণপূর্তে কর্মকর্তার স্বল্পতা রয়েছে। তাই ফজলুকে রাজশাহী সার্কেলে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় মামলায় যদি তার দ- হয় তাহলে তাকে আবার ফিরিয়ে আনা হবে।’ তিনি বলেন, ‘ফজলুকে পদায়ন আমরা (গণপূর্ত অধিদপ্তর) করতে পারি না। আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে করা হয়েছে।’

যেভাবে গচ্ছা গেল ১০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা : গণপূর্তের প্রকৌশলীদের দাপ্তরিক চিঠি থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০১৮ সালের ৮ অক্টোবরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের কাজ শুরু হয়। ১৬৭ কোটি ৭৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৩৩ টাকা ব্যয়ে ১৫তলা ভবন নির্মাণের কাজ পায় জিকে শামীমের প্রতিষ্ঠান জিকে বিল্ডার্স। কাজটি শেষ করার কথা দুই বছরে। আংশিক হওয়ার পর জিকে শামীম গ্রেপ্তার হলে কাজ বন্ধ করে দেয় তার প্রতিষ্ঠান। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, ওই প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা কাজটি বাতিল করে কর্তৃপক্ষ। এরপরই কর্তৃপক্ষের নজরে আসে অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকা বিল দেওয়া হয়েছে বিতর্কিত ঠিকাদার শামীমকে।

প্রকৌশলীরা জানান, বিধিমতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, প্রকল্প পরিচালক, ঠিকাদারের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর উপস্থিতিতে কাজের যৌথ পরিমাপ করা হয়। সেই পরিমাপে শেষ হওয়া কাজের মূল্যমান দাঁড়ায় ১৯ কোটি ৫০ লাখ ৯ হাজার ৯৪৫ টাকা। কিন্তু বিল দেওয়া হয়েছে ২৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

দাপ্তরিক নথিপত্রে দেখা যায়, ২০১৫ সালের ১৪ অক্টোবর শেরেবাংলা নগর-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. ফজলুল হক। সেখানে তিনি ২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তার দায়িত্বপালনকালে জিকে শামীমের প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ ও পরপর দুটি বিল দেওয়া হয়।

ওই সময় গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী মো. শামীম আখতার দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, ‘কাজের অতিরিক্ত বিল দেওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি সরকারের এ বিপুল পরিমাণ অর্থ কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায়। যে প্রতিষ্ঠানকে বিল দেওয়া হয়েছে তাদের সঙ্গে চুক্তিও বাতিল করা হয়েছে। এখন এ টাকা আদায় করাও মুশকিল। এ টাকা কীভাবে দেওয়া হয়েছে, কারা দিয়েছে সব বিষয় মাথায় রেখে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ফজলুকে দায়মুক্তি দিতে মরিয়া কর্তৃপক্ষ : খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের আর্থিক অনিয়মের ঘটনাটি খোদ সংস্থার নিজস্ব তদন্তেই বেরিয়ে আসে। এ ঘটনা নিয়ে দেশ রূপান্তরে সংবাদ প্রকাশিত হলে তাৎক্ষণিক প্রকৌশলী ফজলুল হককে উন্নয়ন সার্কেল থেকে সরিয়ে প্রধান দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। ঘটনাটি সাময়িকভাবে ধামাচাপা দিতে শুরুতেই মরিয়া ছিল একটি প্রভাবশালী মহল। এর মধ্যে গত চার প্রধান প্রকৌশলীর কার্যকালীন গণপূর্তের সংস্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব পালন করছেন এমন এক ‘ম্যানেজ মাস্টার’খ্যাত প্রকৌশলীও রয়েছেন। প্রথমে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর অধিদপ্তরের তৎকালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন) ড. গিয়াস উদ্দিন হায়দারকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু তিনি এ তদন্ত করতে অপারগতা প্রকাশ করে লিখিত দেন। এর কারণ হিসেবে জানা যায়, প্রকৌশলী ফজলুল হককে দায়মুক্তি দেওয়ার বিষয়ে শীর্ষ পর্যায়ে ইঙ্গিত ছিল শুরুতেই। বিষয়টি বুঝতে পেরে প্রকৌশলী গিয়াস এ বিতর্ক থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর এ দায়িত্ব দেওয়া হয় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. খায়রুল আলমকে। শীর্ষ পর্যায়ের বিশ^স্ত এ প্রকৌশলী ঘটনাটি ভিন্নভাবে ‘ম্যানেজ’ করার জন্য হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে (সিজিএ) চিঠি দিয়ে মতামত চান। সেখান থেকে এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে আংশিক তথ্য নিয়ে তার ভিত্তিতে প্রকৌশলী ফজলুর পক্ষেই প্রতিবেদন দেন তিনি। সেই প্রতিবেদন ধরে ‘ছক’ অনুযায়ী জিকে শামীমের অন্য প্রকল্পের জামানতের টাকা থেকে এই সাড়ে ১০ কোটি টাকা সমন্বয় করার চেষ্টা শুরু হয়। এক কাজের টাকা অন্য কাজের সঙ্গে সমন্বয় করার বিষয়টি যেহেতু বিদ্যমান আইনে সুযোগ নেই, তাই করতে রাজি হচ্ছিলেন না শেরে বাংলানগরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মোয়াজ্জেম হোসেন। তখন শীর্ষ পর্যায় থেকে তাকে ডেকে এনে চাপ দিয়ে সেটা করানো হয়। এসব যখন ঘটছিল তখন ঘটনার দায়দায়িত্ব নিরূপণ করতে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তের জন্য অতিরিক্ত প্রকৌশলী (পরিকল্পনা ও বিশেষ প্রকল্প) মো. শফিকুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হলে ঘটনার মোড় ঘুরে যায়। তিনি তার তদন্তে অভিযুক্ত করেন প্রকৌশলী ফজলুল হককে। এরপর পূর্ত মন্ত্রণালয়ে বিভাগীয় মামলা হয় এ প্রকৌশলীর নামে। এ মামলা চলমান থাকা অবস্থায় গত ৯ ফেব্রুয়ারি গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) নন্দিতা রানী সাহা স্বাক্ষরিত চিঠি যায় পূর্ত মন্ত্রণালয়ে। এরপর নানা কৌশলের আশ্রয় নিয়ে ফজলুকে রাজশাহী সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদায়ন করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত