রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর সংকটে পড়েন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। ন্যাটো সদস্য হলেও রাশিয়ার বিপক্ষে যাওয়া কঠিন এরদোয়ানের জন্য। কারণ তুরস্ক রাশিয়ার পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে ইউক্রেনের সঙ্গেও রয়েছে বাণিজ্য ও সামরিক সম্পর্ক। মধ্যস্থতা করে দুই পক্ষকে কি থামাতে পারবেন এরদোয়ান? লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া
এরদোয়ানের চ্যালেঞ্জ
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর জটিল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে তুরস্ক। যুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত দেশগুলোর সঙ্গে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে জড়িয়ে যায় দেশটি। যুদ্ধ শুরুর একপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করারও অনুরোধ পায় তুরস্ক। খোদ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুদ্ধ চলাকালেই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের উদ্দেশে বলেন, ‘বিভিন্ন সময় ইউক্রেনকে নানা ধরনের সহায়তা করেছেন এরদোয়ান। তিনি যে যুদ্ধ চান না, তা তিনি বেশ কয়েকটি পদক্ষেপের মাধ্যমে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনকে বুঝিয়েছেন। এ সুযোগ বিশ্বের অনেক নেতারই নেই। আমি মনে করি, এরদোয়ানই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন।’
তুরস্ক পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে প্রথম এই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। ইউক্রেনে আগ্রাসনের পেছনে এই জোটকে দায়ী করেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। ন্যাটো স্বীকার না করলেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে এই জোট দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। পূর্ব ইউরোপে জোটটির সম্প্রসারণ কর্মকাণ্ড অন্তত তা-ই বলে। যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো এই তিন শক্তিই তুরস্ককে নিজের দলে রাখতে চায়।
সম্পর্কে জটিলতা
সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য হলেও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নীতিতে সায় নেই তুরস্কের। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কও খুব একটা ভালো নয়। রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ়। অন্যদিকে ইউক্রেনের সঙ্গে দেশটির সামরিক অংশীদারত্ব রয়েছে। তুরস্ক তার দেশের দক্ষিণে সিরিয়ায় এক দশকের বেশি সময় ধরে তীব্র সংঘর্ষে লিপ্ত। দেশের উত্তরে আরেকটি যুদ্ধ কোনোভাবেই চায় না আঙ্কারা। বিশেষ করে ইউরোপ ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ এড়িয়ে চলার পক্ষপাতী তুরস্ক। দেশটির অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নেজাত এসলেন বলেন, ‘এই যুদ্ধ আসলে পরাশক্তিদের মধ্যে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা। এটি অনেক বিপজ্জনক। বৈশ্বিক এই প্রতিযোগিতা আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় রূপ নিতে পারে, যা আরও যুদ্ধ ডেকে আনতে পারে। তুরস্ককে এ বিষয়ে অনেক সতর্ক থাকা প্রয়োজন।’
চলতি বছরের শুরুর দিকে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার উত্তেজনা বেড়ে গেলে নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তুরস্ক। জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও পর্যটন সম্পর্ক থাকা রাশিয়াকে খেপাতে চায় না দেশটি। সংকট নিরসনে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দেওয়ার পাশাপাশি রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা বিশ্বের জারি করা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে তুরস্ক। অবশ্য একই সঙ্গে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বের পক্ষেও কথা বলে দেশটি। রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরুর পর ইউক্রেনের অনুরোধে রুশ কয়েকটি যুদ্ধজাহাজকে বসফোরাস প্রণালি ব্যবহার করতে দেয়নি আঙ্কারা। কৃষ্ণ সাগর ও ভূমধ্যসাগরের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে এই প্রণালি। সিরিয়ায় রাশিয়া ও তুরস্ক প্রতিপক্ষ হলেও রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। এই দুই রাষ্ট্রনায়ক বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের আধিপত্য বা কর্র্তৃত্বের বিরোধী। গত কয়েক বছরে তুরস্কের বেশ কয়েকজন সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীকে কারারুদ্ধ করায় ও ন্যাটোর বিরোধিতা সত্ত্বেও সম্প্রতি রুশ এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র কেনায় পশ্চিমাদের তোপের মুখে পড়েন এরদোয়ান। ওই দুই ঘটনা পশ্চিমের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটায়। ইউক্রেনে আগ্রাসন বন্ধে ন্যাটোর গড়িমসি তুরস্কের রাশিয়াপন্থি শিবিরকে শক্তিশালী করে। তুরস্কের সামরিক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নেজাত এসলেনের মতে, ‘তুরস্কের বুদ্ধিজীবীরা পুতিনপন্থি ও ন্যাটোপন্থি এই দুই শিবিরে বিভক্ত। এই যুদ্ধে ন্যাটোর দুর্বলতাও আমরা দেখছি। ইউক্রেনীয়রা মারা যাচ্ছে আর ন্যাটো কিছুই করছে না।’
রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ের সঙ্গে তুরস্কের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বেশ দৃঢ়। রাশিয়া থেকে চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে তুরস্ক। এ ছাড়া প্রতি বছর তুরস্কে চাহিদার ৭০ শতাংশ গম রপ্তানি করে রাশিয়া। আর চাহিদার ১৫ শতাংশ খাদ্যশস্য ইউক্রেন থেকে নেয় তুরস্ক। পাশাপাশি প্রতি বছর তুরস্কে গ্রীষ্মে ছুটি কাটাতে যান ৫০ লাখ রুশ ও ইউক্রেনীয় পর্যটক। রাশিয়া এখন তুরস্কের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। তুরস্কের অর্থনীতি রাশিয়ার আমদানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ২০১৯ সালে দেশ দুটির দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল প্রায় ১৬.৪ বিলিয়ন ডলার। রাশিয়া থেকে তুরস্ক সবচেয়ে বেশি যে পণ্য আমদানি করে, তা হলো পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম। এ ছাড়া রাশিয়া থেকে কৃষ্ণ সাগর হয়ে পাইপলাইনে করে তুরস্কে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। ২০২০ সালে তুরস্ক রুশ এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র কিনলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় পড়ে। তুরস্কের দক্ষিণে আয়ক্কু অঞ্চলে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে রাশিয়া। এদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য ও কৌশলগত অংশীদার। এই দুদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২০১৯ সালে ছিল প্রায় ২.১৫ বিলিয়ন ডলার। তুরস্ক ইউক্রেনের প্রধান রপ্তানিকারক দেশ। ২০১৯ সালে তুরস্কে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম। এরদোয়ান জানেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব পড়বে ব্যাপক। ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইউক্রেনের সঙ্গে সম্পর্কও। এ কারণে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে যুদ্ধ বন্ধে তৎপর তুরস্ক।
দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনে ড্রোন বিক্রি করে আসছে তুরস্ক। তার এই কর্মকাণ্ডে নাখোশ রাশিয়া। এমনকি ইউক্রেনে রাশিয়া সামরিক অভিযান চালানোর পর কিয়েভে ড্রোন পাঠায় তুরস্ক। দেশে দেশে অত্যাধুনিক ড্রোন রপ্তানি তুর্কিদের কাছে গর্বের বিষয়। তুরস্কের যে কোম্পানি ড্রোন তৈরি করে, তার মালিক এরদোয়ানের জামাতা সেলচুক বায়রাকথার। ড্রোনের মাধ্যমে নিজেদের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পছন্দ করে তুরস্ক।
ইউরোপ ও এশিয়া এই দুই মহাদেশের প্রবেশপথ হলো ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা তুরস্কের রয়েছে এমনটাও একসময় ভাবা হয়েছিল। তবে ধীরে ধীরে ধর্মীয় রক্ষণশীল রাষ্ট্রে তুরস্ক পরিণত হলে ওই ভাবনা বাদ পড়ে যায়। তুরস্কের কর্র্তৃত্ববাদী নেতারা দেশটির ইসলামীকরণে পক্ষপাতী বেশি। রাশিয়া তুরস্কের বন্ধু হলেও এই দুই দেশ সেই রুশ-অটোমান যুদ্ধ থেকে পরস্পরের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলে উদ্বেগ প্রকাশ করে তুরস্ক। এমনকি দেশটির প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান সে সময় বলেছিলেন, রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল বেআইনি কাজ। এটিকে কখনো স্বীকৃতি দেবে না তুরস্ক।
এমন আরও বেশ কয়েকটি ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে রাশিয়া ও তুরস্কের রেষারেষি রয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে রাশিয়ার বদান্যতার ওপর নির্ভর করতে হয় আঙ্কারাকে। রাশিয়া ও তুরস্কের সম্পর্কে সবচেয়ে সমস্যাপূর্ণ বিষয় হলো সিরিয়া। গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া। রাশিয়ার হস্তক্ষেপের কারণে এখন পর্যন্ত সিরিয়ার ক্ষমতায় রয়েছেন আসাদ। অন্যদিকে আসাদের বিরোধী পক্ষকে সমর্থন করছে তুরস্ক। তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বে কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে বেশ সক্রিয় কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে)। সেই সোভিয়েত আমল থেকে এই পার্টির সঙ্গে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতায় অসন্তুষ্ট তুরস্ক। এ ছাড়া পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে আধিপত্য বজায় রাখতে সিরিয়ায় এই দেশ দুটি দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছে। তুরস্কের সীমান্তে সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ইদলিবে আসাদের পক্ষে রাশিয়া ও বিরোধী সংগঠনের পক্ষে তুরস্ক লড়াই করতে করতে ক্লান্ত। ইসলামি জঙ্গি সংগঠন আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইসহ আরও বেশ কয়েকটি লক্ষ্য অর্জনে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলাকালেই ২০১৫ সালে গঠন করা হয় সামরিক জোট সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)। এই জোটের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন রয়েছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের শাসনের বিরুদ্ধে পশ্চিমা জোটের অংশ তুরস্ক হলেও সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসকে বরাবরই কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) অংশ মনে করে আসছে তুরস্ক।
কৃষ্ণ সাগরের গুরুত্ব
তুরস্কের ভৌগোলিক অবস্থান দেশটির প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের জন্য আরেক চ্যালেঞ্জ। তুরস্কের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দুটি জলপথ বসফোরাস ও দারদানেলিস প্রণালি। মারমারা সাগরের মধ্য দিয়ে আজিয়ান ও কৃষ্ণ সাগরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে এই দুই প্রণালি (তুর্কি প্রণালি নামেও পরিচিত)। একমাত্র এই জলপথ দিয়ে কৃষ্ণ সাগরে অবস্থিত বন্দরগুলো থেকে জাহাজ ভূমধ্যসাগর ও তারও বাইরে যেতে পারে। রাশিয়া, আজারবাইজান ও কাজাখস্তান থেকে প্রতিদিন ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল, বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় তিন ভাগ পণ্য এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যায়।
এ ছাড়া কৃষ্ণ সাগর উপকূল থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে লোহা, স্টিল ও কৃষিজাত পণ্যবাহী জাহাজ ইউরোপের বিভিন্ন শহরসহ বিশ্বের অন্যান্য শহরে যাতায়াত করে। ১৯৩৬ সালের মন্ট্রিয়া কনভেনশন অনুযায়ী বসফোরাস ও দারদানেলিজ প্রণালি পরিচালনার দায়িত্ব পায় তুরস্ক। যুদ্ধের সময়ে বসফোরাস ও দারদানেলিজ প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ নিয়ন্ত্রণের অধিকার এই কনভেনশন তুরস্ককে দিয়েছে। এখন পর্যন্ত মন্ট্রিয়া কনভেনশন দক্ষতার সঙ্গে তদারকি করে আসছে তুরস্ক। এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই কোনো ধরনের যুদ্ধে কৃষ্ণ সাগরকে বাইরে রাখতে চায় তুরস্ক। যুদ্ধ শুরুর পর মন্ট্রিয়া কনভেনশনের যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগ করতে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের প্রতি আহ্বান জানান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। ওই আইনে কৃষ্ণ সাগরে যুদ্ধজাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর তিন দিন পর ২৭ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে রুশ আগ্রাসনকে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করে রাশিয়ার জাহাজ যাতে বসফোরাস ও দারদানেলিস প্রণালি ব্যবহার করতে না পারে, সেই অঙ্গীকার করেন এরদোয়ান। ইউক্রেন পরিস্থিতি যুদ্ধে রূপ নেয় বলে রুশ আগ্রাসন শুরুর কয়েক দিন পর তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার অর্থ হলো মন্ট্রিয়া কনভেনশন অনুযায়ী বসফোরাস ও দারদানেলিজ প্রণালি হয়ে কৃষ্ণ সাগরে যেতে পারবে না রুশ যুদ্ধজাহাজ। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাভুসোগলু বলেছিলেন, ‘শুরুতে এটি রাশিয়ার হামলা ছিল। এখন এটি যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। স্বচ্ছ ভাবে মন্ট্রিয়ার কনভেনশনের সব বিধান বাস্তবায়ন করবে আঙ্কারা।’ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের প্রতি জেলেনস্কির আহ্বান কৌশলগতের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক ছিল। কারণ দেরিতে হলেও রাশিয়ার আগ্রাসনকে যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন এরদোয়ান।
যুদ্ধে মধ্যস্থতা
২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ইউক্রেনে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন। তার এই পদক্ষেপকে অগ্রহণযোগ্য ও আঞ্চলিক শান্তির ওপর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে তুরস্ক। পাশাপাশি পুতিনের পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলের স্বাধীনতার স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করে আঙ্কারা। যুদ্ধের একপর্যায়ে ইউক্রেনের অনুরোধে বসফোরাস প্রণালিতে রুশ যুদ্ধজাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ করে তুরস্ক। তবে দেশটির পক্ষ থেকে এও বলা হয়, মন্ট্রিয়া কনভেনশনের শর্ত অনুযায়ী, কৃষ্ণ সাগর উপকূলীয় দেশসমূহের যুদ্ধজাহাজগুলোকে তাদের দেশের ঘাঁটিতে ফেরা বন্ধ করতে পারে না তুরস্ক। রাশিয়া ওই উপকূলীয় দেশগুলোর একটি। এ বিষয়ে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাভুসোগলু বলেন, ‘যেসব যুদ্ধজাহাজ তাদের ঘাঁটিতে ফেরার ঘোষণা দিয়েছে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হতে পারে না।’ যুদ্ধ শুরুর পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান জানান, ইউক্রেন বা রাশিয়া কারও সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চান না তিনি।
রাশিয়া ও ইউক্রেনকে শান্তি আলোচনায় বসাতে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দেয় তুরস্ক। কারণ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফল তার জন্য সুফল বয়ে আনবে না, বরং মধ্যস্থতা করলে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন এরদোয়ান। যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে পশ্চিমাদের সঙ্গে একাট্টা হয়নি তুরস্ক। তবে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাভুসোগলু জানান, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক সমাধান খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক একসঙ্গে কাজ করবে। এরদোয়ানের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত আলোচনায় বসতে রাজি হয় রাশিয়া ও ইউক্রেন।
১০ মার্চ তুরস্কের আন্তালিয়া শহরে শান্তি আলোচনায় বসেন ইউক্রেইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রো কুলেবা ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। প্রথম দফা আলোচনায় যুদ্ধ বন্ধে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এদিকে দুই পক্ষের আলোচনা চলাকালে ইউক্রেনে রুশ হামলা থেমে ছিল না। যুদ্ধ বন্ধে এরদোয়ানের উদ্যোগের ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে, এমনটা মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। রাশিয়ার হাতে যদি কিয়েভের পতন হয়, তাহলে এরদোয়ান কোন পক্ষে যাবেন, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
