ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ রক্ষায় মরিয়া ইউক্রেনীয়রা। নিয়মিত যোদ্ধাদের পাশাপাশি সাধারণ জনগণও অস্ত্র হাতে কিয়েভের রাস্তায় নেমেছে রুশ সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য। কিয়েভে এখনো পূর্ণমাত্রায় প্রবেশ করতে পারেনি রুশ যোদ্ধারা। গোটা শহরের চারপাশে পরিখা খনন করে রুশ যোদ্ধাদের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইউক্রেনের তুলনায় রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর সমরাস্ত্র অনেক উন্নত হলেও, কিয়েভ দখলে কেন রুশদের বেগ পেতে হচ্ছে, এ নিয়ে রয়েছে একাধিক বিশ্লেষণ।
কিয়েভের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে থাকা দুই ইউক্রেনীয় জেনারেল সম্প্রতি বিবিসির সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সেখানে তারা কিয়েভকে কেন এত সহজে রুশ সেনারা পরাস্ত করতে পারবে না, সে বিষয়ে বক্তব্য তুলে ধরেন। ইউক্রেনের অন্য শহরগুলোতে রুশ আর্টিলারি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করলেও, কিয়েভে এখনো সেই অর্থে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। হাতেগোনা কয়েকটি বেসামরিক ভবনে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে, যাতে দুজন নিহত হয়েছেন। ওই দুই জেনারেল বলেছেন, তারা রুশ সেনাদের প্রবেশ ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হলেও, রুশ মিসাইলের কাছে তারা অসহায়।
কিয়েভ ভৌগোলিক দিক দিয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত শহর। শহরটির ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী ও খালগুলো বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে ইউক্রেনীয় যোদ্ধাদের। নিপার নদী কিয়েভকে দুইভাবে বিভক্ত করেছে। নদীর কারণে শহরটির ভেতরে রয়েছে অনেকগুলো সেতু। ওই সেতুগুলোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ইউক্রেনীয়দের হাতে। ঐতিহাসিকভাবেই এ শহরে বিশালাকার কোনো সৈন্য সমাবেশ করা যায় না। জেনারেল ক্রিশ্চেঙ্কোর মতে, কিয়েভ একটি শিল্প এলাকা। এখানে আবাসিক ভবনের তুলনায় কারখানার সংখ্যা বেশি। ফলে ওই কারখানাগুলো বেশ শক্তপোক্তভাবেই নির্মিত। এমন ভবনগুলো রুশ ট্যাংকের জন্য প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে।
অপর জেনারেল কানিয়াজেভের মতে, রুশ সেনারা শহরের পূর্ব এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে আক্রমণ করতে পারে। আর এ আক্রমণের অগ্রভাগে থাকতে পারে ৪০ মাইল দীর্ঘ রুশ বহর। রুশ সেনারা কিয়েভের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল আক্রমণ করতে পদাতিক বাহিনী ব্যবহার করবে। সে ক্ষেত্রে তাদের ইরপিন নদী অতিক্রম করে কিয়েভে প্রবেশ করতে হবে। আর সেখানেই ইউক্রেনের সেনাবাহিনী তাদের সুদক্ষ যোদ্ধাদের মোতায়েন করে রেখেছে। কয়েক হাজার নাগরিকও অস্ত্র হাতে প্রস্তুত রয়েছে সেখানে।
সংকট আরও একদিকে রয়েছে রুশ সেনাদের জন্য। কিয়েভের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল মূলত জলাভূমিবেষ্টিত। কানিয়াজেভ মনে করেন, ওই ফ্রন্টে ইউক্রেনীয় যোদ্ধারা না থাকলে রুশ সেনারা শুধু একটি পন্টুন বসিয়ে সহজেই কিয়েভে প্রবেশ করতে পারবে। কিন্তু যেহেতু সেখানে যোদ্ধারা মোতায়েন আছেন, ফলে রুশ পদাতিক বাহিনীকে কিয়েভে প্রবেশ করতে হলে ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে। তবে সমরবিদরা মনে করেন, কিয়েভের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ইউক্রেনীয়দের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিতে রাশিয়া যদি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। নিজেদের শহর হওয়ায় বাড়তি সুবিধা পাবে ইউক্রেনীয়রা। সে ক্ষেত্রে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। উভয়পক্ষেরই ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধি পাবে। অবশ্য বন্দরনগরী মারিওপোলের অভিজ্ঞতাকে যদি আমলে নেওয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে শহরটিতে ব্যাপকমাত্রায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে কার্যত ইউক্রেনীয় সেনাদের নাভিশ্বাস উঠিয়ে দিয়েছে রুশ সেনারা। অনেক জায়গায় ইউক্রেনীয় সেনাদের আত্মসমর্পণ করতেও দেখা গেছে। কিয়েভেও যদি প্রতিরোধ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে ব্যাপক চাপে পড়বেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
