দেশে রডের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার পেছনে কোনো সিন্ডিকেট কাজ করছে কি না খুঁজে দেখতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে অভিযান পরিচালনার সুপারিশ করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি। আগামী সাত দিনের মধ্যে এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে একটি প্রতিবেদন দেওয়ার জন্যও বলেছে কমিটি।
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদীয় এ কমিটির বৈঠকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনায় এ সুপারিশ করা হয়। বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, রডের দাম এ যাবৎকালের সব রেকর্ড ভেঙেছে। গত দুই সপ্তাহে প্রতি টন রডের দাম ৫-৬ হাজার টাকা বেড়েছে। খুচরা বাজারে এক টন রডের দাম ৯০ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। তাই এর কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি আ স ম ফিরোজ সাংবাদিকদের বলেন, ‘হঠাৎ করে রডের দাম বেড়ে গেল কেন?
এতে করে অবকাঠামো নির্মাণের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কমিটি ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরকে অভিযান পরিচালনা করার জন্য বলেছে। এখানে কোনো সিন্ডিকেট কাজ করছে কি না, সেটা খুঁজে দেখতে সুপারিশ করা হয়েছে।’
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বলছে, গত বছর নভেম্বরে রডের দাম প্রতি টন ৮১ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছিল, দেশের ইতিহাসে যা তখন রেকর্ড দাম ছিল। ৯ মাস আগে যেখানে রডের দাম প্রতি টন ৬২ হাজার টাকা ছিল, তা এখন ৯২ হাজার টাকা হয়েছে।
ইতিহাসের রেকর্ড দামে রড : দেশে প্রথমবারের মতো প্রতি টন রডের দাম ছাড়িয়েছে ৯০ হাজার টাকা। বর্তমানে বিএসআরএমের ৬০ গ্রেড এক টন রড বিক্রি হচ্ছে ৯০ হাজার ৫০০ থেকে ৯১ হাজার টাকায়; যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৮৮ হাজার টাকা। মাসখানেক আগে এ দাম ছিল ৭৫-৭৮ হাজার টাকা। বাজারে প্রতি টন একেএস রড ৮৮-৮৯ হাজার, কেএসআরএম ৮৭-৮৮ হাজার, জিপিএইচ ৮৭-৮৮ হাজার, বন্দর ৮৮ হাজার ৫০০ থেকে ৮৯ হাজার এবং কেএসএমএল প্রতি টন রড বিক্রি হচ্ছে ৮৭-৮৮ হাজার টাকায়। পাশাপাশি আনোয়ার, রহিমসহ কয়েকটি কোম্পানির রড পাওয়া যাচ্ছে ৮৬-৮৭ হাজার টাকায়।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে রড তৈরির কাঁচামালের দাম বাড়ার অজুহাতে দেশে বাড়ানো হচ্ছে রড, মোটা-পাতলা প্লেনশিট ও অ্যাঙ্গেলের দাম। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, রডের ক্রয়াদেশ থাকলেও সময়মতো সরবরাহ নেই। বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকটের কারণেই দেশেও নির্মাণসামগ্রীর দাম ঊর্ধ্বমুখী।
সিমেন্টের দামেও রেকর্ড : দেশে নির্মাণশিল্পের আরেক অন্যতম উপকরণ সিমেন্ট উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকার, লাইমস্টোন, সø্যাগ, ফ্লাই অ্যাশ ও জিপসাম আমদানিনির্ভর। এগুলোর মধ্যে ৬২ থেকে ৯০ শতাংশই ক্লিংকার। ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতি টন ক্লিংকারের দাম ৬০ ডলার থেকে বেড়ে ৭৫-৭৯ ডলারে উঠেছে। সিমেন্ট উৎপাদনের অন্যান্য কাঁচামালের দামও টনপ্রতি গড়ে ১০ থেকে ১২ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। এছাড়া কয়লা ও জ¦ালানি তেলের দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে কাঁচামাল আমদানিতে জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়াও সিমেন্টের দাম বাড়ার বড় কারণ।
বর্তমানে দেশের বাজারে সব কোম্পানিরই সিমেন্ট বস্তাপ্রতি ৩০-৬০ টাকা বেড়েছে। ৪০০-৪৫০ টাকার সিমেন্ট প্রতি বস্তা বিক্রি হচ্ছে ৪৬০-৫০০ টাকায়। রাজধানীর বিভিন্ন সিমেন্টের বাজারে শাহ স্পেশাল ৪২০ থেকে বেড়ে ৪৬০-৪৭০ টাকা, সুপারক্রিট ৪২০ থেকে বেড়ে ৪৭০-৪৭৫, স্ক্যান সিমেন্ট ৪৫০ থেকে বেড়ে ৪৮০-৪৮৫, বেঙ্গল সিমেন্ট ৪১০ থেকে বেড়ে ৪৬০-৪৭০ এবং মীর ৪০৫ থেকে বেড়ে ৪৫০-৪৫৫ টাকা বস্তা বিক্রি হচ্ছে। দোকানিদের আশঙ্কা, আগামী দিনে দাম আরও বেড়ে বস্তাপ্রতি ৫০০ টাকা ছাড়াতে পারে।
বৈঠকে সদস্যরা বলেন, সরকারের রাজস্ব আয়, কর্মসংস্থান, রড, সিমেন্ট, টাইলসসহ ২৬৯টি লিংকেজ কোম্পানি শিল্প প্রসারের মাধ্যমে নির্মাণ খাত জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কাজ করে। আর আড়াই কোটি মানুষের জীবন চলে।
