স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করেছি এ কথাটি যখন ভাবি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে এ দেশের অগণিত মানুষের সাহসী প্রতিরোধের কথা যেমন মনে করি, তেমনি মনে পড়ে কত পরিবারে নেমে আসা ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর আর কত মানুষের আত্মদানের মাধ্যমে এসেছিল আমাদের মাতৃভূমির স্বাধীনতা। জাহানারা ইমামের এলিফ্যান্ট রোডের বাড়ি ১৯৭১ সালের মার্চ মাসেও ছিল জমজমাট। আর ডিসেম্বরে যখন দেশ স্বাধীন হয়েছিল তখন সেই বাড়ি হয়ে গিয়েছিল নীরব, বিষাদময়। ৯ মাসের নিষ্ঠুর সেই সময়ে জাহানারা ইমাম হারিয়েছিলেন তার বড় ছেলে আর স্বামীকে। নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের। যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন গ্রামের, শহরের নাম না জানা বহু মুক্তিযোদ্ধা আর সাধারণ মানুষ। ৯ মাসে আমরা স্বাধীন হয়েছি, কিন্তু অনেক চড়া মূল্য দিয়ে অর্জন করতে হয়েছিল সেই স্বাধীনতা।
স্বাধীনতাপ্রাপ্তির মাধ্যমে শোষণহীন অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং লক্ষ্য। এই মূল্যবোধ গুরুত্ব দেওয়া যেমন জরুরি, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই মানুষদের সম্পর্কে জানা যারা শোষণমুক্ত ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ অর্জনের আকাক্সক্ষা মনে ধারণ করে অংশগ্রহণ করেছিলেন স্বাধীনতা-সংগ্রামে। আজ স্বাধীনতার ৫১ বছর পরের সমাজে নাগরিকদের বিশেষ করে কমবয়সীদের চিন্তার ধরন আর ইতিহাস-জ্ঞান যখন লক্ষ করি, দেখতে পাই মুক্তিযুদ্ধের নানা দিক এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে বহু মানুষের জ্ঞান সীমিত। এই দিকগুলো সম্পর্কে বহু মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করার সচেতন চেষ্টাও চোখে পড়ে না। হুমায়ুন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘আগুনের পরশমণি’র শেষ কথাগুলো ছিল ‘জোনাকি দেখা যাচ্ছে না কারণ ভোর হচ্ছে। আকাশ ফর্সা হতে শুরু করছে। গাছে গাছে পাখপাখালি ডানা ঝাপটাচ্ছে। জোনাকিদের এখন আর প্রয়োজন নেই।’
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে যে অন্ধকার নেমে এসেছিল আমাদের দেশে, সেই ভয়াল আঁধারে জোনাকির মতো আলো দেখিয়েছিল আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, যখন সেই বিপদ এবং অন্ধকার আর ছিল না তখন এই সমাজে মুক্তিযোদ্ধারা কি যথাযথ গুরুত্ব পেয়েছিলেন? স্বাধীনতার পরপরই আমাদের কানে এসেছিল ‘সিক্সটিন্থ ডিভিশন’ শব্দটি। সুযোগসন্ধানী ধূর্ত মানুষরা মুক্তিযোদ্ধা সেজে সমাজে দাপট দেখাতে শুরু করেছিল। পুরনো কাঠামো আমূল বদলে ফেলার চেষ্টাও করা হয়নি। জনযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া নতুন দেশে পুরনো কাঠামোর নানা দিক টিকিয়ে রাখা হলে যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে যে নতুন সচেতনতা আর প্রত্যাশা অনেকের মধ্যে তৈরি হয় তাদের কাছে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী ব্যবস্থার চালচলন ধরে রাখার চেষ্টা হতাশা আর ক্ষোভ তৈরি করে। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া বহু মানুষ যদি সদ্যস্বাধীন সমাজে গুরুত্ব না পাওয়ার কারণে হতাশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে তাহলে ক্ষতি হয় সমাজের। কারণ, নতুন দেশ গড়ার কাজে সবচেয়ে আন্তরিকভাবে এই মানুষদেরই অংশগ্রহণ করার কথা।
ফরাসি ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার মানুষের মুক্তিসংগ্রামের পটভূমিতে নির্মিত ইতালির চলচ্চিত্রকার জিল্লো পন্টেকর্ভোর বিখ্যাত ছবি ‘দ্য ব্যাটল অব আলজিয়ার্স’-এর একটি দৃশ্যে দেখা যায় আলজেরিয়ার গেরিলা সংগঠন ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের একজন নেতা বেন মেহেদি সংগঠনের তরুণ কর্মী আলিকে বলছেন, ‘একটি বিপ্লব শুরু করা কঠিন, আরও কঠিন সেই বিপ্লব ধরে রাখা, এবং তার চেয়েও কঠিন হলো বিপ্লবে বিজয়ী হওয়া। তবে সবচেয়ে কঠিন কাজ শুরু হয় বিপ্লবে বিজয়ী হওয়ার পর।’ আমরা অনেকগুলো কঠিন কাজে সফল হয়েছি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার পর নতুন দেশ গড়ার সবচেয়ে কঠিন যে কাজটি শুরু হয়েছিল সে কাজে কি আমরা সম্পূর্ণ সফল হতে পেরেছিলাম? স্বাধীনতার পর গত বিভিন্ন দশকে দেশে আমরা দেখেছি বিভিন্ন সামাজিক আর রাজনৈতিক সমস্যা, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানি সামরিক শাসনে আমরা পীড়িত হয়েছিলাম। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্রের জন্য নাগরিকদের প্রাণ দিতে হয়েছে। সমাজে টিকে আছে ক্ষমতার কদর্য দাপট দেখানোর চর্চা, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা, আর রাজনৈতিক সুবিধা লাভের জন্য হাতিয়ার হিসেবে ধর্ম ব্যবহারের অশুভ প্রবণতা। ঔপনিবেশিকতাবিরোধী চিন্তাবিদ ফ্রান্তজ ফাঁনো মনে করতেন পুরনো কাঠামো টিকিয়ে রাখার আগ্রহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত মন যদি মানুষ অর্জন করতে পারে, তাহলে এমন নতুন মানুষদের উপস্থিতিতেই প্রকৃত-অর্থে উপনিবেশী শাসনের অবসান ঘটবে। নতুন মানুষ তৈরি না হলেও একটি দেশ রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে। কিন্তু অনেক মানুষের পুরনো মানসিকতা দূর না হওয়ার কারণে সেই স্বাধীন দেশেও টিকে থাকবে অতীতের উপনিবেশী আমলের বিভিন্ন অহিতকর দিক।
এই নতুন মানুষ তৈরির সুযোগ, কিছু মানুষের সুবিধা টিকিয়ে রাখা হয় এমন ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার সুুযোগ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে আমাদের দেশে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পুরনো বিভিন্ন সমস্যা আমাদের সমাজে এখনো টিকে থাকার বাস্তবতা নির্দেশ করে সেই সুযোগ আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। দরকার ছিল স্বাধীনতা অর্জনের পরই ক্ষমতার প্রতি আকর্ষণ নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মনে ধারণ করে দেশ নতুনভাবে গড়ে তোলার প্রতি যারা আগ্রহী এমন ব্যক্তিদের প্রাধান্য দিয়ে একটি একতাবদ্ধ শক্তি গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা। সমাজে এমন একটি শক্তির উপস্থিতি থাকার পরিবর্তে আমরা দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলসমূহ আর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। এই পরিস্থিতিতে লাভবান হয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চক্র। এমনও সময় এসেছে যখন মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন দেশে কোণঠাসা আর বিপদগ্রস্ত হয়েছে। যেমন সামরিক বাহিনীতে তেমনি প্রত্যন্ত গ্রামেও।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা দেশের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে প্রায়ই উল্লেখ করলেও, স্বাধীনতা অর্জনের অর্ধশতাব্দী পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিবিড়ভাবে চর্চার প্রতি এবং মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে জনগণের মধ্যে জ্ঞান তৈরির প্রতি গভীর আগ্রহ সমাজে চোখে পড়ছে না। গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক প্রসারের এ সময় এই মাধ্যমসমূহ ব্যবহার করে নবীন প্রজন্মের নাগরিকদের কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রকৃত রূপ আর মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সচেতন করে তোলা সম্ভব হয়েছে? একজন চলচ্চিত্র তারকা, নাটকের জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রী, কোনো নামি খেলোয়াড় এমন মানুষদের চেনেন এ সময়ের নাগরিকরা। কিন্তু দেশের বহু মানুষ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বহু ছাত্রছাত্রীও কি জানে অনেক মুক্তিযোদ্ধার নাম এবং বিভিন্ন যুদ্ধে তাদের অসীম সাহসী অবদানের কথা? ‘স্টপ জেনোসাইড,’ ‘১৯৭১,’ ‘লিবারেশন ফাইটার্স,’ ‘নাইন মান্থস টু ফ্রিডম,’ ‘মেজর খালেদ’স ওয়ার’ প্রভৃতি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সুনির্মিত তথ্যচিত্রগুলো কি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষদের নিয়মিত দেখানোর কথা চিন্তা করা হয়?
নতুন প্রজন্মের বহু মানুষ যদি না জানে কীভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গিয়েছিল রুমী, বদি, জুয়েল, আজাদ, আলতাফ মাহমুদকে এবং তারা আর কোনো দিন ফিরে আসেনি তাদের প্রিয়জনদের মধ্যে, যদি তারা না জানে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে যুদ্ধে প্রাণ হারানো ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর আর ক্যাপ্টেন সালাউদ্দীন মমতাজের নাম, যদি তারা না জানে কীভাবে পাকিস্তানি সেনারা নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছিল নিরীহ নিরস্ত্র অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব আর মধুর ক্যান্টিনের মালিক মধুসূদন দে-কে, কীভাবে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর এ দেশীয় দোসর আলবদর বাহিনীর কর্মীরা বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল বরেণ্য বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সারকে এবং আর কোনো দিন তাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি, তাহলে আমরা কি আশা করতে পারি বহু মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে যথাযথ ধারণা আর সেই চেতনা সমুন্নত রাখার গভীর ইচ্ছা আর কর্তব্যবোধ? বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসে জড়িয়ে আছে পরিচিত আর নাম-না-জানা অনেক মানুষের নাম। সেই মানুষদের অবদান আর আত্মবিসর্জন সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের নাগরিকদের সচেতন আর শ্রদ্ধাশীল করে তুলতে পারলেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমাজে শক্তিশালী হবে। এই দায়িত্ব পালনে আগামী দিনগুলোতে যেন আমরা ব্যর্থ না হই।
লেখক : অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
