দুই তারকার মুক্তিযুদ্ধের সিনেমার অভিজ্ঞতা

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২২, ১১:১৩ পিএম

কবরী আপার অনেক সহায়তা পেয়েছি

জ্যোতিকা জ্যোতি

আমি ভীষণ ভাগ্যবান যে ক্যারিয়ারের এতটুকু পথচলায় অনেক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পে অভিনয় করেছি। নাটকের সংখ্যা তো গোনা গাঁথা নেই। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও করেছি একাধিক। আর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা মুক্তি পেয়েছে পাঁচটি। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সিনেমা করি তানভীর মোকাম্মেলের ‘রাবেয়া’। এরপর একে একে ‘জীবন ঢুলি’, ‘অনিল বাগচির একদিন’, ‘মায়া দ্য লস্ট মাদার’ ও ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’ মুক্তি পেয়েছে। এখন কাজ চলছে ‘অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’ নামে একটি ছবির। এতগুলো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি করেছি সেটাই শুধু সৌভাগ্যের বিষয় নয়, যে পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছি তারা প্রত্যেকে প্রখ্যাত। তাদের টিমের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাই অন্যরকম। মুক্তিযুদ্ধ তো দেখিনি। কিন্তু এই সব ছবির সেটে গিয়ে সেই আগুনঝরা দিনগুলোর আমেজ অনুভব করেছি।

প্রতিটি ছবিতে আমি ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছি। ফলে এক একটি মুক্তিযুদ্ধের ছবি করতে গিয়ে আমাকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলাদা আলাদা আঙ্গিক থেকে গবেষণা করতে হয়েছে। চরিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে যে পড়াশোনা করেছি তাতে কোনো কোনো সময় গা শিউরে উঠত। ভাবতে পারতাম না আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সে সময়ের মানুষের বিশেষ করে সংখ্যালঘু মানুষরা কী নির্মম যন্ত্রণা সহ্য করেছে দেশ স্বাধীন করতে। এত কিছুর পরও যখন দেখি এখনো দেশে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী কিছু লোক নানা কথা বলে, নানা লেখা লেখে, তখন আর সহ্য করতে পারি না। মুক্তিযুদ্ধের ছবিতে প্রতিবার অভিনয় করতে গিয়ে মনের ভেতর শুধু একটা প্রশ্ন উদয় হয়। এখনো যদি এমন ঘটনা ঘটে তবে আমি কী করতাম? নিজেই উত্তর খুঁজে পাই, অবশ্যই আমি যুদ্ধে যেতাম। আমাকে কেউ আটকে রাখতে পারত না।

সবাই জানেন কিংবদন্তি চিত্রতারকা কবরী আপার ‘আয়না’ ছবি দিয়ে আমি শোবিজে কাজ শুরু করেছি। তাই ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে আমার ওপর তার অভিভাবকের মতো ছায়া ছিল। যখন রাবেয়া আর জীবন ঢুলি ছবি দুটি করি, তখন আমি কবরী আপার স্মরণাপন্ন হই। কারণ, তিনি নিজেই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আমাকে তার সেই দিনগুলোর অবর্ণনীয় কষ্টের অভিজ্ঞতাগুলো বলতেন। একজন সুপারস্টার নায়িকা যুদ্ধের কারণে স্মরণার্থী শিবিরে গিয়ে থেকেছেন। এ ছাড়া অনেক সময় এমনো হয়েছে, সেটে একটি দৃশ্য করছি কিন্তু সেটি কীভাবে করলে আরও বাস্তবসম্মত হবে তা নিয়ে সবাই কনফিউজড। তখন আমার মাকে ফোন করে জেনে নিয়েছি, তখনকার দিনগুলো কেমন ছিল।

শেষ দৃশ্যে অভিনয় করে মনে হয়েছে আমিও যুদ্ধ করেছি

আশনা হাবিব ভাবনা

নুরুল আলম আতিকের প্রতি কৃতজ্ঞতা, তিনি তার ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’ ছবিতে আমাকে পদ্ম চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ করে দিয়েছেন। কারণ, আমি ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ভীষণভাবে বিশ^াসী। আমি মনে করি, আমাদের সবচেয়ে গৌরবের ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধ। এমন অধ্যায় এ জাতির জীবনে আসবে বলেও মনে করি না। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য যে সে সময় আমার জন্ম হয়নি। ফলে মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষার স্কুল আমার পরিবার, আমার বাবা-মা।

‘লাল মোরগের ঝুঁটি’তে অনেকগুলো চরিত্র। প্রতিটি চরিত্র চলচ্চিত্রটির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রত্যেক চরিত্রের আলাদা গল্প আছে। তাতে গুণী শিল্পীরা অভিনয় করেছেন। তবে নির্মাতা অনেকবার বলেছেন, এই ছবির একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা চরিত্রটি হলো পদ্ম। আমি সেই চরিত্রে অভিনয় করেছি। মেয়েটি সাঁওতালি, হাড়িয়া বিক্রি করে। কিন্তু দেশের প্রতি এই অশিক্ষিত প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েটির যে অগাধ টান, সেটি ফুটে ওঠে তার কর্মকা-, স্পেশালি শেষ দৃশ্যে রুখে দাঁড়ানোর মাধ্যমে। পুরো ছবিতে তেমন কোনো যুদ্ধ-বিধ্বংসী বিষয় নেই। মানসিক টানাপড়েন আর অন্যায়-অবিচার দেখে দেখে যখন দর্শকের মনে পাকিস্তানিদের ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণার জন্ম দেয়, ঠিক তখনই পদ্ম সব দেশপ্রেমিক বাঙালির প্রতিনিধি হয়ে প্রতিশোধ নেয়।

গতকালও ছবিটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখেছি। এর আগে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ৮৫০ জন দর্শকের সঙ্গে দেখেছি। সিনেমা হলে তো অনেকবার গিয়েছি। সব শ্রেণির দর্শক সিনেমার শেষ দৃশ্য দেখার পর যেভাবে হাততালি দিয়ে ওঠে, সেটি আমার পরম প্রাপ্তি। এই দৃশ্যটিতে আমি পাকিস্তানি অফিসারের গলায় দা দিয়ে কোপ মারি! মুক্তিযুদ্ধ করতে পারিনি, কিন্তু দৃশ্যটি করার পর মনে হয়েছে আমিও যুদ্ধ করেছি। ছবিটির জন্য অনেক ধরনের প্রস্তুতি নিতে হয়েছি। শ্যুটিংয়ের আগে অনেক দিন অন্য শ্যুটিং করিনি। সিনেমার সেটে গিয়ে থেকেছি। সাঁওতালি ভাষা প্র্যাকটিস করেছি। এছাড়া নানা পড়াশোনা, বিশেষ করে পরিচালকের সঙ্গে অনেকবার মিটিং তো ছিলই। সব মিলিয়ে পদ্ম চরিত্রটি যে দর্শকের কাছে জীবন্ত মনে হয়েছে সেটিও আমার জন্য সফলতা। মুক্তিযুদ্ধের গল্পে আমি আরও কাজ করতে চাই।

কথা বলেছেন মাসিদ রণ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত