বাংলাদেশে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ওয়েব সিরিজ কিংবা নাটক-সিনেমায় সফট পর্নোগ্রাফির মতো যেসব কনটেন্ট রয়েছে সেগুলোতে অশ্লীলতার চেয়ে নারীর প্রতি নির্যাতন বা অপমানসূচক উপাদানই বেশি রয়েছে।
দেশীয়ে এসব অনলাইন ও মিডিয়াতে নারীর প্রতি অবমাননাকর, নারীর অশালীন দেহ প্রদর্শন, যৌন আবেদনময় ও পর্নোগ্রাফির কনটেন্ট বা আধেয় বাড়ছে, অন্যদিকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে কিছু মেয়ে বা নারী ছেলেদের বা পুরুষদের প্রলুব্ধ করে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে সচেষ্ট থাকে বলে একটি গবেষণায় উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির সহজ বিস্তার এবং নারীর প্রতি সহিংসতা’ শীর্ষক গবেষণায় এই ফলাফল তুলে ধরা হয়।
গবেষণাটি করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। সারা দেশের আটটি বিভাগের ১৬ টি জেলায় ৫১৮ জন বিভিন্ন স্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেছে এই গবেষণায়।
গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গবেষণায় পর্নোগ্রাফি ইস্যুটি নতুনভাবে ও ভিন্নভাবে উঠে এসেছে। যেমন বাংলা ভিডিওতে অশ্লীল গল্প বলা, যৌনপল্লি থেকে সরাসরি, অশ্লীল খবর ও গল্প, বাংলা ইমোতে ভিডিও সেক্স, ওয়েব সিরিজগুলোতে অশ্লীলতা, বাংলা যৌন কামনা উদ্রেককারী, বাংলা ইমো ভিডিও সেক্স প্রমোশন, রিয়াল অ্যান্ড ভার্চুয়াল সেক্স সার্ভিস গ্রুপস ইন ফেসবুক, ইমো সেক্স সার্ভিস কাস্টমার ফেসবুক অ্যান্ড অথিনটিকেশন।
‘অনলাইনে নারীর অবমাননাকর যে ইমেজ দেখানো হয়, তা সমাজে প্রচলিত ‘মন্দ মেয়ে’র ইমেজকে আরো শক্তিশালী করে। প্রচুর সংখ্যক কিশোর, যুবক ও পরিণত পুরুষ নারীর প্রতি অবমাননাকর কনটেন্ট নিয়মিত দেখে থাকেন বলে গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৮১ ভাগ উত্তরদাতা মনে করেন। তবে যেসব ফটোগ্রাফিক আধেয় দেশীয়ভাবে বা রূপে তৈরি হয়েছে, সমাজে সেগুলোর প্রভাব ও বিস্তার খুব বেশি। আর এখানে দেশীয় পর্নোগ্রাফি অশ্লীলতার চাইতেও বেশি ব্যবহৃত হয় নারীকে নিন্দা, নির্যাতন ও অপমান করার জন্য।’
গবেষণা প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, ‘মন্দ মেয়ে, মন্দ ছেলের চাইতে বেশি বিপজ্জনক। আর এটা মনে করেন শতকরা ৭৪ জন উত্তরদাতা। এর মধ্যে শতকরা ৩২ জন নারী ও ৪২ জন পুরুষ। এই মন্দ মেয়ে কারা, যারা নায়ক নায়িকার মতো যৌন আবেদনময়ী আচরণ অথবা পশ্চিমা সংস্কৃতির পোশাক পরে ও আচরণ অনুসরণ করে বা টিকটক, লাইকী ও ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে অনলাইনে ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করে। যে সমাজে মেয়েদের প্রতি সহিংস ও নির্যাতনমূলক আচরণ বেড়েছে বলে মনে করেন শতকরা ৮২ জন উত্তরদাতা। এর মধ্যে নারী শতকরা ৪০ জন ও পুরুষ শতকরা ৪২ জন।
মেয়েরা খোলামেলা পোশাক পরলে, অশালীন আচরণ করলে, খারাপ ভাষা ব্যবহার করলে, স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও মেলামেশা করলে, সেই মেয়েদের নানাভাবে হেয় ও তাদের প্রতি অপমানজনক আচরণ করা হয়, এমন ধারণা পোষণ করেন শতকরা ৮১ জন উত্তরদাতা। এর মধ্যে শতকরা ৩৯ জন নারী ও ৪২ জন পুরুষ।
মন্দ মেয়ের মতো আচরণ সমাজে অনাকাঙ্ক্ষিত কারণ সেটা অন্য ছেলেমেয়েদের নষ্ট করে ফেলবে বলে মনে করেন শতকরা ৭৯ জন উত্তরদাতা। এর মধ্যে নারী শতকরা ৩৬ জন এবং পুরুষ শতকরা ৪২ জন।
আর তাই অনলাইনে মন্দ মেয়ের মতো আচরণ যারা করে, তাদের সেটা থেকে বিরত রাখা জন্য তাকে হেয় করা, তাদের মন্দ বলা ও তাদের প্রতি অপমানজনক আচরণ করা সমাজের জন্য উপকারী বলে মনে করেন শতকরা ৪৪ জন উত্তরদাতা। এর মধ্যে নারী ১৮ ভাগ ও পুরুষ ২৫ ভাগ।
গবেষণায় দেখা যায়, সমাজে ‘ভালো’ ও ‘মন্দ’ মেয়ে আছে এটা বিশ্বাস করেন শতকরা ৭৯ জন উত্তরদাতা। শতকরা ৫২ জন মানুষ মনে করেন মেয়েদের মিডিয়ায় সিনেমায় কাজ করা, পুরুষের সঙ্গে রাতের শিফটে কাজ করা বা দূর-দূরান্তে একসঙ্গে ভ্রমণ বা কাজে যাওয়া ঠিক নয়। এর মধ্যে শতকরা ২১ জন নারী ও ৩১ জন পুরুষ।
যেসব মেয়ে আচরণ ও পোশাকে সামাজিক আচরণ মানে না, স্বাধীনভাবে চলতে চায় এবং আচরণে নারী-পুরুষ বিভেদ করে না বলে মনে হয়, তাদের প্রতি মানুষ কটূক্তি, সমালোচনা, তির্যক মন্তব্য ও অপমানজনক আচরণ করতেই পারে, এমনটা মনে করে শতকরা ৬৪ জন মানুষ। এর মধ্যে নারী শতকরা ২৯ জন ও পুরুষ শতকরা ৩৪ জন।
গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তরদাতারা মোবাইল ইন্টারনেট বেশি ব্যবহার করে। ছেলেদের চাইতে মেয়েরা কিছুটা বেশি ব্যবহার করে। স্মার্ট ফোনের ব্যবহারের হার অনেক বেশি। শতকরা ৫১ জন ছেলে ফেসবুক ব্যবহার করে, নারী ব্যবহার করে শতকরা ৩৯ জন। এর পরেই আছে ইমো, ছেলেরা শতকরা ২৯ ভাগ এবং মেয়েরা শতকরা ২০ ভাগ।
এ ছাড়া আছে টিকটক এবং লাইকী। টিকটক, লাইকী ও ইনস্টাগ্রামের মতো মাধ্যম মেয়েদের কাছে খুবই জনপ্রিয় এমনটা মনে করেন শতকরা ৮৩ জন উত্তরদাতা। এর মধ্যে পুরুষ শতকরা ৪৫ ভাগ এবং নারী শতকরা ৩৮ ভাগ।
অনলাইনে মন্দ কনটেন্ট যেমন অ্যাডাল্ট মুভি, ন্যুডিটি, পর্নোগ্রাফি শতকরা ৭৫ জন দেখে থাকে বলে উত্তরদাতারা মনে করে। এর মধ্যে শতকরা ৩৮ জন নারী ও ৩৭ ভাগ পুরুষ।
যেসব মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হয় বা যৌন হেনস্তার শিকার হয়, তাদের নিজেদেরও দোষ আছে, এটা ভাবে শতকরা ৫৩ শতাংশ উত্তরদাতা। শতকরা ৭৩ জন মনে করেন যে একটি মেয়ের জীবন তখনই সফল হয়, যখন একটি উপযুক্ত ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। শতকরা ৬৩ জন মনে করেন মেয়েদেরও বেশি স্বাধীনতা দিলে তারা পুরুষদের নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে এবং শতকরা ৫৮ জন মনে করেন মেয়েরা ছেলেদের নির্দোষ আচরণকেও নির্যাতন মনেকরে।
আর যখন মেয়েরা ‘মন্দ’ মেয়েদের মতো আচরণ করে অথবা অনলাইনে মন্দ মেয়ের মতো আচরণ করে, তখন তাকে সবচেয়ে বেশি শাসন করেন মা শতকরা ৮৯ ভাগ। বাবা শতকরা ৮৪ জন, ভাইবোন শতকরা ৮৪ জন, শিক্ষক শতকরা ৭২ জন, আত্মীয়স্বজন শতকরা ৬৯ জন এবং বন্ধু শতকরা ৪৬ জন।
অনুষ্ঠানটি মডারেট করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন, প্রফেসর ড. শাহনাজ হুদা, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পরিচালক আশফাক নিপুণ, সেইভ দ্যা চিলড্রেনের সেক্টর ডিরেক্টর, সিপি অ্যান্ড সিআরজি, রেহনুমা ই জান্নাত, সাইকোলজিক্যাল কাউন্সিলর এবং সিনিয়র সাংবাদিক নওরোজ ইমতিয়াজ।
